অলিতে গলিতে ছোট্ট টং দোকানগুলো সেই কর্মব্যস্ত মানুষগুলোর যেন ক্ষণিকের বিরতির জায়গা। তার একটিতে বসেই ব্যস্ত দুপুরে চায়ের কাপ হাতে একটু স্বস্তি খুঁজছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী আরিফ হাসান। কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ টেকেনি। চায়ের কাপে চুমুক দেয়ার আগেই তাকে উঠে দাঁড়াতে হয়, কারণ মশার অসহনীয় আক্রমণ। কেবল আরিফ নন, আশপাশে থাকা প্রায় সবারই যেন একই অবস্থায়। কেউ দাঁড়িয়ে চা পান করছেন, কেউ হাত-পা নেড়ে মশা তাড়ানোর চেষ্টা করছেন।

রাজধানী ঢাকার ফুটপাত থেকে অফিস, বাসা—সব জায়গাতেই এখন মশার অস্বাভাবিক দাপট। শুধু রাজধানীই নয়, দেশের অন্যান্য এলাকায়ও মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ মানুষ। এ সমস্যা এখন আর কেবল বিরক্তির পর্যায়ে নেই; এটি ধীরে ধীরে জনস্বাস্থ্যের বড় হুমকিতে পরিণত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মৌসুমি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মশার ধরনও বদলাচ্ছে, আর সেটিই পরিস্থিতিকে করে তুলছে আরো জটিল। শীতকালে সাধারণত কিউলেক্স মশার আধিক্য দেখা যায়। এরা মূলত রাতে উৎপাত বাড়ায় এবং বিরক্তির প্রধান কারণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারিজুড়ে কিউলেক্স মশার দাপট থাকলেও সম্প্রতি ঈদের ছুটিতে ভারি বর্ষণের পর চোখ রাঙাচ্ছে এডিস মশাও। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ডেঙ্গু আক্রান্তের হার বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন কীটতত্ত্ববিদরা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে হওয়া ভারি বর্ষণের পর নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে।’ তার মতে, বৃষ্টির পানি বিভিন্ন জায়গায় জমে থাকায় এডিস মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে। এসব স্থির পানিতে মশা ডিম পাড়ে এবং সেখান থেকেই দ্রুত ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটে।

তিনি আরো জানান, এ পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই মূলত চলতি বছরের ডেঙ্গু মৌসুমে প্রবেশ করছে দেশ। যদি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়া হয়, তাহলে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যেই ঢাকাসহ সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।

মশার ঘনত্ব নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের গবেষকরা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সঙ্গে যৌথভাবে গত ফেব্রুয়ারিতে পাঁচটি এলাকায় পর্যবেক্ষণ চালান। তাদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারিতে মশার সংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এদের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশই কিউলেক্স প্রজাতির মশা ছিল।

গবেষকরা তখন আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, চলতি মার্চে মশার সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। ভারি বর্ষণের কারণে যদিও কিউলেক্স মশার পরিমাণ কিছুটা কমে এসেছে বলে জানান গবেষণা দলের প্রধান অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার।

এদিকে মশা নিয়ন্ত্রণে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগের অভাবে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি—এ শীতকালজুড়ে রাজধানীতে মশার প্রকোপ ছিল অস্বাভাবিকভাবে বেশি। বিশেষ করে কিউলেক্স মশা শীতকালেই বেশি সক্রিয় থাকে। এ বছর শীতের সঙ্গে ঘন কুয়াশা এ মশার বংশবৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে বলে জানিয়েছেন কীটতত্ত্ববিদরা। ফলে নগরজুড়ে মশার দাপট ভয়াবহ আকার ধারণ করে, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে আরো দুর্বিষহ করে তুলেছে।

অন্যদিকে বৃষ্টি ও গরমের মৌসুমে সাধারণত এডিস মশার প্রজনন বেড়ে যায়। গত ২০ মার্চ সারা দেশে ভারি বর্ষণের পর এডিস মশার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যা ডেঙ্গুর জীবাণু ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়িয়েছে। তবে এ পরিস্থিতির মধ্যেও মশা নিয়ন্ত্রণে সরকারি দপ্তরগুলোর তৎপরতা আশানুরূপ নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়োপযোগী ও কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সামনে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে পারে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

নগর পরিকল্পনাবিদ ফজলে রেজা সুমন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকাতেও মশার উৎপাত এখন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এয়ারপোর্ট এলাকা, বসুন্ধরা ও বনানীর মতো এলাকায়ও মশার কারণে স্বাভাবিকভাবে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে। শুধু রাজধানী নয়, দেশের সর্বত্রই মানুষ মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ।’ কিন্তু এ পরিস্থিতির মোকাবেলায় সিটি করপোরেশনগুলোর কার্যকর ও দৃশ্যমান উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

মশা নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এখন সময়ের দাবি উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ড্রোনসহ উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে কার্যকরভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশ এখনো মূলত ফগার মেশিননির্ভর পদ্ধতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। বিশেষ করে যেসব স্থানে মানুষের প্রবেশ কঠিন বা ঝুঁকিপূর্ণ, সেসব সংকীর্ণ ও দুর্গম এলাকায় ড্রোনের মাধ্যমে ওষুধ ছিটানোর মতো প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। সিটি করপোরেশনগুলোকে তাই প্রযুক্তিনির্ভর ও পরিকল্পিত পদ্ধতিতে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সমন্বয় করে মশা নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে আসা উচিত, এর কোনো বিকল্প নেই।’

এছাড়া নগর পরিকল্পনাবিদ ফজলে রেজা সুমন আরো উল্লেখ করেন, মশক নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন ওয়ার্ড কাউন্সিলররা। কিন্তু বর্তমানে সিটি করপোরেশনগুলোয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর না থাকায় মাঠপর্যায়ে কার্যকর সমন্বয় ও তদারকির ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তার মতে, এ প্রশাসনিক শূন্যতাও মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে আরো চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মশার এ বিস্তারের পেছনে মূল কারণ শুধু ওষুধের অভাব নয়, বরং নগর ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ত্রুটি। এর মধ্যে রয়েছে অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, খাল ও জলাশয়ের পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া, যেখানে-সেখানে পানি জমে থাকা। এসব কারণে মশার প্রজননস্থল তৈরি হচ্ছে অবাধে। অথচ এসব জায়গায় নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা নেই।

মশা বৃদ্ধির সঙ্গে বর্জ্য ও জলাশয় ব্যবস্থাপনা সরাসরি জড়িত হলেও নীতিনির্ধারকরা কেবল ওষুধ ছিটানোর ওপর গুরুত্বারোপ করছেন বলে অভিযোগ নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খানের। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমরা বারবার বলে আসছি মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ঠিক করতে হবে। পাশাপাশি নগরীর যে খাল ও জলাশয়গুলো আছে, সেগুলোর প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি। ঢাকার খালগুলো যেমন প্রবাহহীন হয়ে পড়েছে, ঢাকার বাইরে যেখানেই যান সেখানেও খালে কোনো প্রবাহ নেই। একই অবস্থা বর্জ্য ব্যবস্থাপনারও। মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য অবশ্যই ওষুধ ছিটাতে হবে। কিন্তু শুধু ওষুধনির্ভরতায় কখনই মশা নিয়ন্ত্রণে আসবে না। এ কথাগুলো বারবার বলে আসছি, আমাদের কথা কেউ কানেই তুলছে না।’