দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পাঁচ মাস পার হলেও নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থী এবং দলগুলোর আইনি বাধ্যবাধকতা অনুসরণ করে নির্বাচনী আয়-ব্যয়ের বিবরণী প্রকাশ করেনি নির্বাচন কমিশন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থী ও দলের ব্যয়ের বিবরণী জমা প্রদান না করাসহ এ সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশে ব্যর্থতায় হতাশা প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। বুধবার (২৯ মে) গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি এ বক্তব্য তুলে ধরে।

জার্মানভিত্তিক সংস্থাটির মতে, গোপনীয়তার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন (ইসি) নির্বাচনী আইন অমান্য করেছে। অন্যদিকে যেসব প্রার্থী ও দল যথাসময়ে তথ্য জমা দেয়নি, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা কমিশন গ্রহণ করেছে-এমন তথ্য নেই, যা একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিকট প্রত্যাশিত নয়। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ট্র্যাকিংয়ের চুড়ান্ত প্রতিবেদন ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে অবিলম্বে নির্বাচনী ব্যয়সংক্রান্ত সব তথ্য উন্মুক্ত করতে নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ (৪৪ গ) ধারার নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্বাচনের ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয় বিবরণীর সত্যায়িত নথি নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা বাধ্যতামূলক। দাখিলে ব্যর্থ প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অর্থদণ্ড ও কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। একই আদেশের (৪৪ গগ) ধারা অনুযায়ী, নির্বাচনের ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচন সংশ্লিষ্ট ব্যয় বিবরণী নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে হয় এবং দাখিলে ব্যর্থ দলগুলোর বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানাসহ নিবন্ধন বাতিলের বিধান রয়েছে। এছাড়া আদেশের (৪৪ ঘ) অনুসারে প্রার্থী ও দলের ব্যয় বিবরণীর নথি জনগণের কাছে উন্মুক্ত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসার এবং নির্বাচন কমিশনের।

গত ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে, সে হিসেবে প্রার্থীদের ব্যয় বিবরণী নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়ার শেষ সময় ছিল ৭ ফেব্রুয়ারি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য ৭ এপ্রিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে অধিকাংশ প্রার্থী এবং রাজনৈতিক দল ব্যয় বিবরণীর সত্যায়িত নথি সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসে জমা প্রদান করেনি। নির্বাচন কমিশনও তথ্য জমা দিতে ব্যর্থ প্রার্থী ও দলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি। নির্বাচনী ব্যয়সংক্রান্ত নথি সংগ্রহ ও প্রকাশে নির্বাচন কমিশনের নিস্ক্রিয় ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘নির্বাচনী ব্যয়সংক্রান্ত আইনি বাধ্যবাধকতাকে প্রার্থী-দল এমনকি নির্বাচন কমিশনও রীতিমতো উপেক্ষা করেছে। নির্ধারিত সময়ে ব্যয় বিবরণী জমা দিতে প্রার্থী এবং দলগুলো অনীহা দেখিয়েছে, আবার সময়সীমা পার হলেও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আইনানুগ কোনো প্রকার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। নির্বাচনী আইন মেনে চলতে ব্যর্থ প্রার্থী ও দলগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। ফলে একদিকে যেমন কমিশনের নির্বাচনী আইনকে উপেক্ষা করার দৃষ্টান্ত হতাশাজনক, অন্যদিকে এ নিস্ক্রিয়তার মাধ্যমে কমিশন বাস্তবে প্রার্থী ও দলগুলোকে আইনের লঙ্ঘনে আরো বেশি উৎসাহিত করেছে, যা নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের জন্য বিব্রতকর।’

টিআইবি উল্লেখ করে, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুসারে প্রার্থী কর্তৃক জমাকৃত ব্যয়ের বিবরণী এবং দলিল রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় বা অন্য কোনো স্থানে রাখা, একশ টাকা ফি প্রদানসাপেক্ষে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা এবং যেকোনো ব্যক্তিকে দরখাস্তে আবেদন এবং নির্ধারিত ফি প্রদান সাপেক্ষে সরবরাহের নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু টিআইবি পরিচালিত গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় পর্যায়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় এ নির্দেশনা মান্য করেনি। নির্ধারিত ফি গ্রহণে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নির্দিষ্ট নেই এবং কোথায় টাকা জমা দিতে হবে সে নির্দেশনা স্পষ্ট করা হয়নি- অযুহাতে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় ব্যয় বিবরণীর নথি প্রদানে অপারগতা প্রকাশ করে। টিআইবির পক্ষ থেকে তথ্য চেয়ে কমিশনে আবেদন করলেও কমিশন তথ্য প্রদান করেনি। এছাড়া ব্যয় বিবরণীর নথি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়নি।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এটি গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ দ্বারা নির্ধারিত আইনগত বাধ্যবাধকতার এমন লঙ্ঘন, যা নাগরিকদের প্রয়োজনীয় তথ্য থেকে বঞ্চিত করছে, জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতের পথ বন্ধ করছে, যা গণতন্ত্র ও সুশাসন নিশ্চিতে প্রতিবন্ধকতা গভীর ও ব্যাপকতর করছে। কমিশন নির্বাচনের ব্যয় সংক্রান্ত তথ্য প্রদানে গোপনীয়তা রক্ষা করছে এবং উত্তম চর্চার উল্টো পথে চলছে। প্রার্থী এবং দলগুলোর ওপর গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিতে অবিলম্বে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থী এবং দলগুলোর নির্বাচনী ব্যয়সংক্রান্ত সব তথ্য সংগ্রহ নিশ্চিত করে ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রকাশ করতে নির্বাচন কমিশনকে আহ্বান জানাই। যেসব প্রার্থী এবং রাজনৈতিক দল নির্বাচনী ব্যয় বিবরণী নির্ধারিত সময়ে প্রদানে ব্যর্থ হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করে সঠিক দৃষ্টান্ত স্থাপনের দায়িত্ব সম্পর্কে আমরা আরেকবার নির্বাচন কমিশনকে মনে করিয়ে দিতে চাই।’