ইউরোপের দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা প্রায়ই পূর্ব ও পশ্চিমের বিভাজনের ভেতর আটকে থাকে। সাধারণত মনে করা হয়, দুর্নীতি মূলত পূর্ব ইউরোপের ভঙ্গুর গণতন্ত্র কিংবা উন্নয়নশীল দেশগুলোর সমস্যা। বিপরীতে পশ্চিম ইউরোপে তুলনামূলক স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্র চালু রয়েছে। কিন্তু একাধিক গবেষণা, জনমত জরিপ ও হাই প্রোফাইল মামলা দেখাচ্ছে, দৃশ্যমান ঘুষের বদলে লবিং, রাজনৈতিক অর্থায়ন ও নীতিনির্ধারণে প্রভাব খাটানোর মতো সূক্ষ্ম ও কাঠামোগত দুর্নীতি পশ্চিম ইউরোপেও গভীরভাবে উপস্থিত। খবর ইউরো নিউজ।
গভর্নমেন্ট ট্রান্সপারেন্সি ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও সেন্ট্রাল ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মিহাই ফাজেকাস বলেন, ‘দুর্নীতি শুধু পূর্ব ইউরোপ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর সমস্যা, একাডেমিক ও গবেষণাভিত্তিক আলোচনায় এ ধারণা অনেক আগেই বাতিল হয়েছে।’
সাম্প্রতিক মাসগুলোয় যখন ইউরোপীয় অংশীদারদের কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও সামরিক সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা করছে ইউক্রেন, তখনই ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একাধিক সদস্যদেশে রাজনৈতিক আলোচনায় ঘুরেফিরে দুর্নীতির আশঙ্কার কথা উঠছে। ইউক্রেনে তহবিল অব্যাহত রাখার বিরোধিতা করতে গিয়ে দুর্নীতির প্রসঙ্গ টানেন হাঙ্গেরির পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেতের সিজিয়ার্তো। আগেও তিনি অভিযোগ করেছিলেন, কিয়েভে একটি ‘যুদ্ধ মাফিয়া’ কাজ করছে, যারা পশ্চিমা সহায়তার অর্থ সরিয়ে নিচ্ছে।
ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশে নিয়মিতভাবে উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির ঘটনা সামনে আসছে। কিন্তু সেগুলোকে গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে নয়, বরং সাধারণ বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা হয়।
জনমতও পূর্ব-পশ্চিম বিভাজনের ধারণা নিয়ে অনেক বেশি সন্দিহান। মিহাই ফাজেকাস বলেন, ‘জরিপে দেখা যায়, ফ্রান্স বা যুক্তরাজ্যের মতো দেশেও মানুষ মনে করে দুর্নীতি সমানভাবেই প্রচলিত। ডেনমার্ক ও সুইডেনে এ ধারণা তুলনামূলক কম। কিন্তু ইইউর অনেক প্রধান ও উন্নত অর্থনীতির সদস্যরাষ্ট্রেই জনসংখ্যার বড় অংশের কাছে দুর্নীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়।’
ইউরোপীয় কমিশনের করা ২০২৪ সালের ইউরোব্যারোমিটার জরিপে দেখা যায়, ৬১ শতাংশ ইউরোপীয় নাগরিক দুর্নীতিকে অগ্রহণযোগ্য মনে করেন। ৬৮ শতাংশের বিশ্বাস, তাদের দেশে দুর্নীতি ব্যাপকভাবে বিদ্যমান। প্রায় ২৭ শতাংশ বলেছেন, দৈনন্দিন জীবনে তারা ব্যক্তিগতভাবে দুর্নীতির প্রভাব অনুভব করেন।
সাধারণ দৈনন্দিন সেবার জন্য ঘুসের মতো ঘটনা সহজেই চোখে পড়ে এবং ব্যাপকভাবে নিন্দিত হয়। অন্যদিকে জটিল প্রভাব খাটানোর কৌশলগুলো চিহ্নিত ও যাচাই করা অনেক কঠিন। অথচ এসব ক্ষেত্রে আর্থিক স্বার্থের পরিমাণ অনেক বেশি হতে পারে।
মিহাই ফাজেকাস ব্যাখ্যা করেন, ‘পূর্ব ইউরোপের দুর্নীতিতে কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চেক অ্যান্ড ব্যালান্সের দুর্বলতা।’
কমিউনিজম-পরবর্তী অনেক দেশে অত্যন্ত কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা থেকে বিকেন্দ্রীকৃত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় রূপান্তরের ফলে তদারকি ব্যবস্থাগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্কগুলো তখনো প্রভাবশালী থেকে যায়। মিহাই ফাজেকাসের মতে, পশ্চিম ইউরোপেও অনুরূপ নেটওয়ার্ক রয়েছে। তবে সেগুলো সাধারণত আইনি, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক অর্থায়নের মতো আরো প্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে কাজ করে।
গবেষণা সংস্থা করপোরেট ইউরোপ অবজারভেটরি জানিয়েছে, অন্তত ৬২টি করপোরেশন ও বাণিজ্য সংগঠন প্রতি বছর ইইউতে লবিংয়ের পেছনে মোট প্রায় ৩৪ কোটি ৩০ লাখ ইউরো ব্যয় করে। এ অংক ২০২০ সালের পর থেকে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়েছে। সংস্থাটি বলছে, প্রকৃত ব্যয় এর চেয়েও বেশি হতে পারে। কারণ হিসাবটিতে শুধু সেসব প্রতিষ্ঠানের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যারা বছরে ১০ লাখ ইউরোর বেশি ব্যয়ের কথা ঘোষণা করেছে।
ইউরোপজুড়ে সাম্প্রতিক তদন্ত ও আদালতের মামলাগুলোও দেখিয়েছে প্রেক্ষাপটভেদে দুর্নীতির অভিযোগ কীভাবে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। ইইউর সাবেক পররাষ্ট্রনীতি প্রধান ফেদেরিকা মোঘেরিনি সম্প্রতি গ্রেফতার হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, ইইউ-অর্থায়িত একটি কূটনৈতিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে দুর্নীতি ও সরকারি ক্রয় জালিয়াতির সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন।
মিহাই ফাজেকাস বলেন, ‘যেখানেই যান না কেন, শীর্ষ রাজনীতিক ও আমলারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা বলবেন। কিন্তু যেহেতু দুর্নীতি স্বভাবতই গোপন একটি আচরণ, তাই কে শুধু কথা বলছে আর কে সত্যিই পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা সবসময় স্পষ্ট নয়। এখানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কথার বাইরে গিয়ে বাস্তব পদক্ষেপ নেয়া।’









