যুক্তরাষ্ট্রের করপোরেট খাতে একের পর এক ছাঁটাইয়ের খবরে কর্মীদের মধ্যে চাকরি হারানোর শঙ্কা বাড়ছে। সামগ্রিকভাবে মার্কিন শ্রমবাজার একধরনের অচল অবস্থায় রয়েছে, অর্থনীতিবিদরা যাকে ‘না নিয়োগ, না ছাঁটাই’ পরিস্থিতি হিসেবে বর্ণনা করছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন কর্মী নেয়া বন্ধ রাখলেও বড় ধরনের ছাঁটাই এড়িয়ে চলছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বড় কোম্পানিগুলোর ঘোষিত ছাঁটাই সেই ভঙ্গুর ভারসাম্যের অনিশ্চয়তাকে আরো স্পষ্ট করে তুলেছে। খবর এপি।
সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র ৫০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান যোগ হয়েছে। সংশোধিত হিসাবে নভেম্বরে যুক্ত হয়েছিল ৫৬ হাজার চাকরি। কর্মসংস্থান সৃষ্টির এ ধীরগতিকে অর্থনীতিবিদরা উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন। বাড়তি ব্যবসায়িক ব্যয়, স্থায়ী মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ভোক্তা আস্থা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ কার্যক্রম সীমিত করে ফেলেছে।
ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অ্যামাজন সম্প্রতি করপোরেট বিভাগে প্রায় ১৬ হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে। এর মাত্র তিন মাস আগেই প্রতিষ্ঠানটি ১৪ হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছিল। অ্যামাজনের ভাষ্য, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে এবং কার্যক্রম সহজ করতে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি এআই খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করছে। অ্যামাজনের প্রধান নির্বাহী অ্যান্ডি জ্যাসি আগেই জানিয়েছিলেন, জেনারেটিভ এআই ভবিষ্যতে করপোরেট কর্মীর সংখ্যা কমিয়ে দেবে।
পার্সেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ইউপিএস চলতি বছরে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা করেছে। স্বেচ্ছা অবসর ও স্বাভাবিক অবসরের মাধ্যমে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে। অ্যামাজনের সঙ্গে ব্যবসা কমানো এবং পুনর্গঠনের অংশ হিসেবেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালে ইউপিএস মোট ৪৮ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের কথা জানিয়েছিল।
খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান টাইসন ফুডস নেব্রাস্কা একটি কারখানা বন্ধ করে ৩ হাজার ২০০ কর্মীকে ছাঁটাই করেছে, যা ওই ছোট শহরের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এইচপি, ভেরাইজন ও ইন্টেলসহ আরো বেশ কয়েকটি প্রযুক্তি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই খরচ কমানো এবং এআই ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর কথা বলছে।
এ পরিস্থিতির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে বলে জানান বিশ্লেষকরা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরোপিত নতুন শুল্কের ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ও পরিচালন খরচ বেড়েছে। একই সঙ্গে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষ ব্যয় কমাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কোম্পানিগুলোর বিক্রি ও আয়ে। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, মার্কিন অর্থনীতি নিয়ে ভোক্তাদের আস্থা ২০১৪ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এ বাস্তবতায় অনেক প্রতিষ্ঠান খরচ কমাতে কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানোও কর্মী সংখ্যা কমার একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বহু কোম্পানি প্রযুক্তিনির্ভর পুনর্গঠনের পথে হাঁটছে, যেখানে আগের মতো এত কর্মীর প্রয়োজন পড়ছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও বড় কোম্পানিগুলো কর্মী সংখ্যা কমাচ্ছে। নেসলে বিশ্বব্যাপী ১৬ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা করেছে। ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান নভো নরডিস্কও পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে নয় হাজার কর্মী ছাঁটাই করছে।
বেসরকারি খাতের পাশাপাশি সরকারি খাতেও চাপ বেড়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যয় সংকোচন নীতির ফলে গত বছর হাজার হাজার ফেডারেল সরকারি কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। এতে নতুন চাকরি খোঁজার প্রতিযোগিতা আরো তীব্র হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনো মন্দায় না পড়লেও ক্রমবর্ধমান ছাঁটাই শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। নিয়োগ কমে যাওয়া ও প্রযুক্তিনির্ভর পুনর্গঠনের ফলে অনেক কর্মীর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।










