বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে টেকসই করতে চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ক্লাস্টারভিত্তিক অর্থনৈতিক সংযোগ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সেভেন সিস্টার্স, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্য, পরিবহন ও লজিস্টিকস সংযোগ সম্প্রসারণ করা গেলে চট্টগ্রাম আঞ্চলিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বন্দর অবকাঠামোর পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি।
চট্টগ্রামের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার মিলনায়তনে গতকাল ‘চট্টগ্রাম: ইকোনমিক গেটওয়ে অ্যান্ড লাইফলাইন অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এ কথা বলেন। কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন (সিজেএ), বাংলাদেশ চ্যাপ্টার এ অনুষ্ঠানের আয়োজক।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক। তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর, মাতারবাড়ী ও বে টার্মিনালকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগানো গেলে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সেভেন সিস্টার্স, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের কিছু অংশকে চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে সেবা দেয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে এসব দেশের পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় কমবে।’
দেশের মোট পণ্য পরিবহনের প্রায় ৯৩ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দর ও সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয় উল্লেখ করে চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি বলেন, ‘মাতারবাড়ী থেকে পণ্য পরিবহনে সড়কের পরিবর্তে নৌপথ ব্যবহার করা গেলে পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।’ অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ ওবায়দুল করিম বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশগুলোর পারস্পরিক অর্থনৈতিক বিকাশ ছাড়া কোনো দেশের উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও আসিয়ানের দেশগুলোর অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে পারস্পরিক সংযোগের ভূমিকা রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় এ ধরনের ক্লাস্টারভিত্তিক উন্নয়ন কার্যকর করতে সার্ককে পুনরায় সক্রিয় করার উদ্যোগ নিতে হবে।’ পাশাপাশি চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সমন্বয়ে সিটি গভর্নমেন্ট প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেন তিনি।
জ্বালানি নিরাপত্তাকে শিল্পায়নের অন্যতম শর্ত উল্লেখ করেন সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের অধ্যাপক শরীফ আশরাফুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘দেশে বছরে প্রায় ৭৫ লাখ টন এলএনজি আমদানি হলেও চাহিদা পূরণে আরো ৭০ লাখ টন প্রয়োজন। এজন্য দুটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ, কৌশলগত মজুদ, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও দেশীয় কয়লার ব্যবহার নিয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’ এলপিজির আমদানি ও পরিবহন সক্ষমতা বাড়িয়ে ভোক্তা পর্যায়ে দাম কমানোর সুযোগও রয়েছে বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক শরীফ।
দৈনিক আজাদী সম্পাদক এমএ মালেক বলেন, ‘চট্টগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যক্রম পরিচালনায় ঢাকাকেন্দ্রিকতা রয়েছে।’ বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে চট্টগ্রামকে গড়ে তুলতে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘সৌরবিদ্যুৎ খাতে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ১০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ পেলেও চট্টগ্রাম পেয়েছে ৫ কোটি টাকা।’ উন্নয়ন বরাদ্দে এ বৈষম্যের কারণ জানতে চান। নগরের বিভিন্ন সেবা ও অবকাঠামোর দায়িত্ব একাধিক প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকায় সমন্বিত উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে উল্লেখ করে সিটি গভর্নমেন্ট প্রতিষ্ঠারও দাবি জানান তিনি।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ঢাকা ব্যুরো প্রধান জুলহাস আলমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।










