দেশের স্নায়ুরোগ চিকিৎসার অন্যতম বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে স্ট্রোক, মস্তিষ্কে আঘাত, মেরুদণ্ডের জটিলতা, পারকিনসন্স, ডিমেনশিয়া, মৃগীসহ নানা জটিল স্নায়ুরোগে আক্রান্ত হাজারো মানুষ এখানে চিকিৎসা নিতে আসে। ক্রমবর্ধমান রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। শয্যা সংকটে অনেক রোগীকে ভর্তির জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়াতে নির্মাণ করা হয় নতুন ৫০০ শয্যার ভবন। চলতি বছরের আগস্টে ভবনটি উদ্বোধন করা হলেও প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে এখনো পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা চালু করা সম্ভব হয়নি।
সরজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের নতুন ভবনের প্রথম দুইতলায় বহির্বিভাগের কার্যক্রম চালু রয়েছে। সেখানে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের দীর্ঘ সারি। কথা বলে জানা যায়, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চিকিৎসার জন্য এসেছে তারা। রোগীর সঙ্গে আসা স্বজনদের অনেককে হাসপাতালের মেঝে ও সিঁড়িতে অবস্থান করতে দেখা যায়। তবে ১৫ তলা ভবনটির প্রথম দুইতলা ছাড়া বাকি অংশ প্রায় ফাঁকা পড়ে রয়েছে। এসব অংশে সাধারণ মানুষের প্রবেশ বন্ধ রাখা হয়েছে। ভবনের কিছু অংশে এখনো নির্মাণকাজ চলছে।
প্রায় ৫০৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে প্রায় এক বছর আগে। চলতি বছর ভবনটি হস্তান্তর ও উদ্বোধন করা হলেও প্রয়োজনীয় জনবল ও বাজেটের অভাবে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করা যায়নি। আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অবকাঠামো প্রস্তুত থাকার পরও ভবনটির অধিকাংশ ওয়ার্ড, অপারেশন থিয়েটার ও বিশেষায়িত চিকিৎসা ইউনিট অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে। হাসপাতালসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দিয়ে নতুন ভবনটি পুরোপুরি চালু করা গেলে বিদ্যমান হাসপাতালের ওপর রোগীর চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব হতো।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জটিল স্নায়ুরোগের এমন অনেক চিকিৎসা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে দেয়া হয়, যা দেশের অন্যান্য সরকারি হাসপাতালে সীমিত বা সহজলভ্য নয়। ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা রোগীদের এ হাসপাতালের ওপর নির্ভর করতে হয়। বেসরকারি হাসপাতালে একই ধরনের বিশেষায়িত চিকিৎসা নিতে গেলে ব্যয় হয় অনেক বেশি, যা বহন করার সামর্থ্য অনেক রোগীর নেই। এ কারণে সীমিত শয্যা ও জনবল নিয়েই হাসপাতালটিকে বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপ সামাল দিতে হচ্ছে। নতুন ৫০০ শয্যার ভবনটি চালু হলে রোগী ভর্তির সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি তুলনামূলক কম খরচে বিশেষায়িত চিকিৎসার সুযোগও সম্প্রসারিত হতো। কিন্তু জনবল ও বাজেট সংকটে সে সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে রোগীরা।
হাসপাতালে কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রতিনিয়ত অনেক রোগী ভর্তি হতে আসে। তাদের আমাদের ফেরত পাঠাতে হয়। নতুন ভবনটি চালু হলেও জনবলের অভাবে রোগী ভর্তি করা যাচ্ছে না। দ্রুত জনবল নিয়োগ দেয়া জরুরি। কারণ এখানে যে ধরনের রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হয়, বেসরকারি কোনো হাসপাতালে সেই একই চিকিৎসা পেতে অনেক টাকা খরচ হয়। অনেক রোগীরই আর্থিকভাবে সে সক্ষমতা থাকে না। এখানে ভর্তি হতে মাসের পর মাস অপেক্ষাও করতে হয়। সেক্ষেত্রে অনেক রোগীর জটিলতাও বাড়ে।’
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জনবলসংক্রান্ত পরিসংখ্যানেও ঘাটতির চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটিতে চিকিৎসকদের জন্য অনুমোদিত মোট পদ রয়েছে ৬৪৯টি। বিপরীতে কর্মরত ২৮৮ জন। শূন্য রয়েছে ৩৬১টি পদ। অর্থাৎ অনুমোদিত পদের অর্ধেকেরও বেশি শূন্য। অন্যদিকে নার্সিং বিভাগে অনুমোদিত ৮৬৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত ৬৭৮ জন। শূন্য রয়েছে ১৮৬টি পদ। সব মিলিয়ে চিকিৎসক ও নার্সের ৫৪৭টি পদ শূন্য রয়েছে। বিদ্যমান ৫০০ শয্যার হাসপাতাল পরিচালনাতেই যেখানে জনবলের ঘাটতি রয়েছে, সেখানে নতুন ৫০০ শয্যার ভবন চালু করতে প্রয়োজন অতিরিক্ত চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট ও অন্যান্য কর্মচারী।
হাসপাতালের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের রোগীসংক্রান্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছে ৮ লাখ ১৩ হাজার ৯৮ জন। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৮ হাজার ৭৮৯ জন এবং জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছে ৩১ হাজার ২৯৩ জন। এ সময়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে ৪ হাজার ৪৭৬ জন। মাসভিত্তিক হিসাবে ২০২৬ সালের জুনে বহির্বিভাগে সর্বোচ্চ ৮৩ হাজার ২৫১ জন চিকিৎসা নিয়েছে। অন্যদিকে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে এ সংখ্যা ছিল ৭৬ হাজার ৮৭৯।
২০১২ সালে ৩০০ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল। পরে আরো ২০০ শয্যা যুক্ত করে সক্ষমতা বাড়ানো হয়। গত এক দশকে স্নায়ুরোগীর সংখ্যা ও চিকিৎসাসেবার চাহিদা বাড়তে থাকায় হাসপাতালটির সক্ষমতা আরো সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হয়। এর অংশ হিসেবে নির্মাণ করা হয় নতুন ৫০০ শয্যার ভবন। এটি চালু হলে হাসপাতালের মোট শয্যা সংখ্যা এক হাজারে উন্নীত হওয়ার কথা। হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মীরা জানান, নতুন ভবন চালুর জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মচারী নিয়োগের বিষয়টি একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তবে এখনো প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ না হওয়ায় ভবনটির পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি।
হাসপাতালটির আবাসিক সার্জন সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. বশীর আহম্মেদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নতুন ভবনের কার্যক্রম পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হয়নি প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে। এরই মধ্যে ভবনটিতে কিছু অস্ত্রোপচার, অস্ত্রোপচার-পরবর্তী রোগীর সেবা ও বহির্বিভাগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যক্রম চালাতে আরো প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার জনবল প্রয়োজন। এ জনবল নিয়োগের বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালকসহ সংশ্লিষ্টরা কাজ করছেন। আগামী মাসের মধ্যে নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন হতে পারে বলে আশা করছি আমরা।’
রোগীদের কাছে এ হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার গ্রহণযোগ্যতা ও আস্থার জায়গা তৈরি হয়েছে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘অনেক রোগী জটিল অবস্থায়ও অন্য হাসপাতালে না গিয়ে এখানে চিকিৎসা নিতে অপেক্ষা করেন। তবে একটি হাসপাতালের পক্ষে দেশের বিপুলসংখ্যক স্নায়ুরোগীর চাপ সামাল দেয়া সম্ভব নয়। এ চাপ কমাতে জেলা পর্যায়েও বিশেষায়িত স্নায়ুরোগ চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তোলা প্রয়োজন।’










