রাজধানীতে নারীদের জন্য আলাদা পাবলিক টয়লেটের ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। অল্প কিছু স্থানে থাকলেও সেগুলোর পরিচ্ছন্নতায় রয়েছে ঘাটতি। নেই পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা। নারী-পুরুষ টয়লেট একসঙ্গে থাকায় অনেক নারীই সেগুলো ব্যবহার করতে অস্বস্তি বোধ করেন। আবার বেশির ভাগ পাবলিক টয়লেটে মাসিক স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনারও সুযোগ নেই। এসব টয়লেট ব্যবহারে অনীহার কারণে বেশির ভাগ নারীই বাইরে বের হওয়ার পর দীর্ঘ সময় পানি পান করা থেকে বিরত থাকেন। এতে তারা নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন।

সরজমিনে দেখা যায়, যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভারের পাশে কাপ্তানবাজার এলাকার পাবলিক টয়লেটে আশপাশের ব্যবসায়ী, লেগুনা ও মিনি ট্রাকের চালকদের আনাগোনা বেশি। সেখানে পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা থাকলেও বেশ অপরিষ্কার ও দুর্গন্ধযুক্ত। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও সেখানে নারীদের আনাগোনা তেমন চোখে পড়েনি।

গৃহিণী নিগার সুলতানা বলেন, ‘আসলে আমাদের এখানে পাবলিক টয়লেটের অবস্থা খুবই বাজে। নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত থাকায় ব্যবহার করা যায় না। বিশেষ করে বাচ্চারা সঙ্গে থাকলে তা আরো কষ্টদায়ক হয়ে দাঁড়ায়।’

মিরপুর স্টেডিয়াম ও মিরপুর-১২ নম্বর এলাকার পাবলিক টয়লেটে সরজমিনে ঘুরে দেখা যায়, সেখানে নারীদের তেমন আনাগোনা নেই। পুরুষরা সেগুলো ব্যবহার করছেন। নারীরা জানান, প্রথমত, অনেক পুরুষের আনাগোনা থাকায় তারা একান্ত বাধ্য না হলে সেখানে যেতে চান না। এছাড়া অপরিচ্ছন্নতা, সাবান ও টয়লেট টিস্যু পেপার না থাকায় তারা সেগুলো ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না।

পাশাপাশি অবকাঠামোগত সমস্যার কথাও জানান অনেকে। তাদের মতে, পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা না থাকা, ভাঙা কমোড, নোংরা পাত্র, ফ্ল্যাশ কাজ না করা—এসব বেশ পরিচিত সমস্যা নগরের বেশির ভাগ পাবলিক টয়লেটে।

বেসরকারি চাকরিজীবী লামিয়া খানম (ছন্দনাম) জানান, নিজের ব্যক্তিগত কাজে তাকে প্রায় সময় পুরান ঢাকার নিম্ন আদালতে যেতে হয়। সেখানে নারীদের টয়লেট বেশ নোংরা এবং অবকাঠামোগত দিক থেকে বেশ দুর্বল। অনেক মানুষের আনাগোনা থাকায় টয়লেট পরিষ্কার থাকে না। ভেতরের পাত্র নোংরা। বাধ্য হয়েই ওইসব টয়লেট ব্যবহার করা লাগে। কারণ আশপাশে আর কোথাও পাবলিক টয়লেটের ব্যবস্থা নেই।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নির্বাহী কর্মকর্তা খয়বর রহমান আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘যেসব পাবলিক টয়লেট রয়েছে, সেগুলো পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রয়োজনে ঢাকা শহরে আরো টয়লেট গড়ে তুলব। আমরা চেষ্টা করছি আরো নারীবান্ধব পাবলিক টয়লেট গড়ে তোলার, যেন সবাই স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবহার করতে পারে।’

5in

রাজধানী ঢাকার মতো জনবহুল শহরে পাবলিক টয়লেট রয়েছে ১৯৪টি। এর মধ্যে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে আছে ১২০টি আর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) ৭৮টি। নারীবান্ধব পাবলিক টয়লেটের স্বল্পতা প্রসঙ্গে ডিএনসিসির নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, ‘নারীবান্ধব পাবলিক টয়লেটের সংকট আছে বটে কিন্তু ঢাকা শহরে তেমন জায়গা নেই যেখানে আরো অনেকগুলো গড়ে তোলা যাবে। তবে নারীদের জন্যও আলাদা কিছু পাবলিক টয়লেট রয়েছে যেগুলো খুব ভালো চলছে বলে জানি।’

আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়াটারএইড বাংলাদেশ এবং বিভিন্ন সংস্থার তথ্যমতে, প্রায় দুই কোটি মানুষের এ শহরে সচল ও ব্যবহারযোগ্য আধুনিক পাবলিক টয়লেটের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় ১০ ভাগের এক ভাগ।

ওয়াটারএইড, সিটি করপোরেশন ও ওয়াসার উদ্যোগে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য শহরে ২৯টি পাবলিক টয়লেট স্থাপন করা হয়। সেগুলো নারী-শিশুসহ প্রতিবন্ধীদেরও ব্যবহারের উপযোগী। নিরাপদ পানি, স্যানিটারি ন্যাপকিনের ব্যবস্থাসহ পরিচ্ছন্নতাও বজায় রাখা হয়েছে। কিন্তু এখনো ঘনবসতিপূর্ণ এ শহরে পাবলিক টয়লেটের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় খুবই কম বলে মনে করেন ব্যবহারকারীরা।

নারীরা জানান, অস্বাস্থ্যকর পাবলিক টয়লেট ব্যবহার এড়াতে তারা বাইরে বের হওয়ার পর দীর্ঘ সময় পানি পান করেন না। ওয়াটারএইড বাংলাদেশের গত বছরের এক গবেষণায়ও বিষয়টি উঠে এসেছে। এ গবেষণার তথ্যমতে, ৬৯ শতাংশ নারী বাইরে পানি পান করা থেকে বিরত থাকেন। গবেষণায় অংশ নেয়া নারীদের ৩৫ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা বাড়ির বাইরে গেলে পাবলিক টয়লেট ব্যবহার এড়িয়ে চলেন। এ নারীদের মধ্যে ৭৪ শতাংশের বক্তব্য, বাইরে পরিষ্কার ও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট পর্যাপ্ত না থাকায় তারা পানি পান কমিয়ে দেন। পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করেন মাত্র ২৯ শতাংশ নারী।

গবেষণায় আরো জানা যায়, ৪৮ দশমিক ১ শতাংশ নারীর ক্লান্তি ও দুর্বলতা এবং ৪১ দশমিক ১ শতাংশের প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া এবং ৩০ দশমিক ৮ শতাংশের কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দেখা দিয়েছে।

এছাড়া ৩৩ দশমিক ৮ শতাংশ নারীর মাইগ্রেনের সমস্যা, ২২ দশমিক ৩ শতাংশ পেশি ও জয়েন্টে ব্যথা এবং ২২ শতাংশ নারী বারবার মূত্রথলীর সংক্রমণে (ইউটিআই) আক্রান্ত হয়ে থাকেন।

দীর্ঘ সময় পানি না খাওয়ার ফলে ইউরিন ইনফেকশনে আক্রান্ত তরুণী মিতা নাজ (ছন্দনাম) বলেন, ‘কাজের সূত্রে আমাকে অনেক সময় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বাইরে থাকা লাগে। আমি নিজেও অনেক হাইজিন মেইনটেইন করি, তাই পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করি না। বাইরে বের হলে পানিও খাই না, যাতে পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করা না লাগে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এছাড়া আশপাশে যে পাবলিক টয়লেট খুব একটা পাওয়া যায় এমনও না। আর যেসব টয়লেট আছে সেগুলোও ব্যবহারযোগ্য নয়। দীর্ঘ সময় টয়লেটে না যাওয়ার কারণে আমার ইউরিন ইকফেকশনের সমস্যা দেখা দিচ্ছে।’

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘একটি দেশের সৌন্দর্যের পরিচয় পাওয়া যায় তাদের পাবলিক টয়লেটের পরিস্থিতি দেখে। আমাদের এখানে পাবলিক টয়লেটের অবস্থা খুবই নোংরা। নারী-পুরুষ পাশাপাশি টয়লেট থাকায় নারীরা সেখানে যেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। এমনকি তাদের মাসিক-সংক্রান্ত কোনো ব্যবস্থাও হাতে গোনা কয়েকটি পাবলিক টয়লেটে রয়েছে । অন্যদিকে, দীর্ঘসময় পানি না খাওয়ার ফলে এবং মল-মূত্র ত্যাগ না করার কারণে তারা ইউটিআই থেকে মারাত্মক কিডনি রোগে ভোগেন। কিডনি রোগ আক্রান্ত পুরুষের তুলনায় নারী বেশি।’

তিনি আরো বলেন, ‘নারীরা সুস্থ না থাকলে শিশুরাও ভালো থাকবে না। শিশুরা ভালোভাবে বেড়ে না উঠলে সুন্দর জাতি গড়ে উঠবে না। তাই সুন্দর জাতির পরিচয় রক্ষার্থে পরিচ্ছন্ন পাবলিক টয়লেট অতি জরুরি। ’