ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর আজ। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। যথাযোগ্য মর্যাদা ও উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবসটি উদযাপিত হবে। দিবসটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

গতকাল দেয়া এক বাণীতে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর আমাদের জাতীয় জীবনে এক অবিস্মরণীয় দিন, দেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। তাঁবেদারি অপশাসন, দুর্নীতি, নৈরাজ্য ও আধিপত্যবাদী ষড়যন্ত্রের সেই কঠিন সময়ে ঐক্যবদ্ধ সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে দেশ তার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ফিরে পায়। সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয়। স্বাধীনতার ঘোষক, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন। জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থনে তার ওপর রাষ্ট্র পরিচালনা ও জাতীয় সংকট উত্তরণের গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয়। জাতির এ ক্রান্তিকালে তার ভূমিকা ছিল ত্রাতার।’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাণীতে বলেন, ‘যারা বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করে রাখতে চেয়েছিল, জনগণের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার হরণ করে দেশে একদলীয় স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করতে চেয়েছিল এবং দেশের শৌর্য, বীর্য, সাহস ও সম্মানের প্রতীক সেনাবাহিনীর গৌরব ভূলুণ্ঠিত করতে চেয়েছিল, ৭ নভেম্বর দেশপ্রেমিক সিপাহি-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবের মাধ্যমে তাদের পরাজয় ঘটেছিল।’

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আজ সকালে শেরেবাংলা নগরে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ও ফাতেহা পাঠ অনুষ্ঠিত হবে। এতে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং দলের জাতীয় নেতৃবৃন্দসহ সব পর্যায়ের নেতাকর্মীরা শহীদ জিয়ার সমাধিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করবেন।

গত ৫০ বছরের অধিকাংশ সময় দিবসটি সরকারিভাবে পালিত হয়েছে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে। ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত দিবসটি ছিল সরকারি ছুটির দিন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তা বাতিল করা হয়। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে আবারো এই দিনে সরকারি ছুটি বহাল করা হয়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশজুড়ে জরুরি আইন জারি এবং ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৬ সালের সরকারি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, ওই বছর দিনটিতে সরকারি ছুটি বহাল ছিল। পরের বছর ২০০৮ সালে তা ছিল না। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দিবসটি আবার বাতিল করা হয়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এলডিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এ দিবসটিকে জাতীয়ভাবে পালনের আহ্বান জানিয়ে আসছে। চলতি বছর সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পর ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ উপলক্ষে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে।

দিবসটি উদযাপনে সাত দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। গতকাল রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচি ঘোষণা করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানান, দিবসটি উপলক্ষে শনিবার (আজ) রাজধানীতে কেন্দ্রীয় শোভাযাত্রা বের করা হবে। নয়াপল্টন থেকে শুরু হয়ে বাংলামোটর ও ফার্মগেট হয়ে মানিক মিয়া এভিনিউতে গিয়ে শেষ হবে এ শোভাযাত্রা। এ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই দিন সারা দেশের জেলা ও মহানগর পর্যায়ে বিএনপির উদ্যোগে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা হবে।

ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস-২০২৬’ যথাযোগ্য মর্যাদা ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে দিবসটি উদযাপনে সরকার দেশব্যাপী ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা (পরিচালক) ফয়সল হাসান স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, গত ২৮ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চ পর্যায়ের পর্যালোচনা সভায় এ কর্মসূচিগুলো সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয়।

এদিন দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি পালিত হচ্ছে এবং দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি ভবন এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোয় যথাযথ মর্যাদায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে।

এছাড়া গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং সব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার যৌথ উদ্যোগে দেশের প্রধান প্রধান সড়ক ও সড়ক দ্বীপগুলো জাতীয় পতাকা দ্বারা সুসজ্জিত করা হবে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জাতির শান্তি, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি কামনা করে সুবিধাজনক সময়ে দেশের সব মসজিদে মিলাদ-মাহফিল ও বিশেষ মোনাজাত এবং মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা ও অন্য উপাসনালয়গুলোয় বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে। দেশের সব হাসপাতাল, কারাগার, এতিমখানা, শিশু কেন্দ্র, শিশু পরিবার, শিশু সদন, কিশোর সংশোধনী কেন্দ্র, শান্তি নিবাস ও ভবঘুরে প্রতিষ্ঠানে সুবিধাজনক সময়ে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হবে।

এতে বলা হয়, সব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার ব্যবস্থাপনায় দেশের সব শিশু পার্ক শিশুদের জন্য দিনব্যাপী বিনা টিকিটে উন্মুক্ত থাকবে। নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ আলোচনা ও রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থাপনায় জাতীয় দৈনিক সংবাদপত্রগুলোয় বিশেষ নিবন্ধ, সাহিত্য-সাময়িকী ও ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ টেলিভিশন, বেসরকারি টিভি চ্যানেল ও রেডিওতে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার এবং সিনেমা হল ও ভ্যানযোগে প্রামাণ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শনী করা হবে।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে দেশাত্মবোধক গানের আসর, সব জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে আলোচনা সভা এবং জেলা সদর ও উপজেলা পর্যায়ে প্রদর্শনী ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করা হবে।

সশস্ত্র বাহিনী কর্তৃক জাতীয় পতাকা উত্তোলন, মিলাদ মাহফিল, প্রীতিভোজ ও বিশেষ দরবার অনুষ্ঠিত হবে এবং বাংলাদেশ ক্যাডেট কোরের তত্ত্বাবধানে ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে বর্ণাঢ্য ডিসপ্লে প্রদর্শিত হবে।

এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ পুলিশ, বিজিবি, আনসার ও ভিডিপি, বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর, কোস্টগার্ড, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, কারা অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর, এনটিএমসি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সদর দপ্তরগুলোয় মিলাদ মাহফিল, প্রীতিভোজ ও বিশেষ দরবারের আয়োজন করা হবে।