যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্বে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণের তীব্রতা পুনরায় বেড়েছে। এতে জ্বালানি পণ্যের বৈশ্বিক ব্যবহারে যে প্রবৃদ্ধি আশা করা হয়েছিল, তা শ্লথ হয়ে পড়েছে। করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের এ আশঙ্কা অব্যাহত থাকলে জ্বালানি পণ্যের বৈশ্বিক ব্যবহার বেড়ে মহামারীর আগের পর্যায়ে পৌঁছতে কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। খবর রয়টার্স।

মহামারীর শুরুর দিকে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশে লকডাউন আরোপ করা হয়েছিল। ওই সময় বিশ্বজুড়ে ৪০০ কোটির বেশি মানুষ ঘরবন্দি হয়ে পড়ে। জরুরি প্রয়োজন ব্যতীত আকাশপথসহ সব ধরনের পরিবহন চলাচলে বিধিনিষেধ আনা হয়। এতে এ সময়ে জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক চাহিদা দৈনিক গড়ে তিন কোটি ব্যারেল কমে গিয়েছিল, যা পণ্যটির মোট বৈশ্বিক সরবরাহের ৩০ শতাংশ। এ পরিস্থিতিতে আগে থেকে ধুঁকতে থাকা জ্বালানি তেলের বাজার বড় ধরনের ধাক্কা খায়।

তবে নভেল করোনাভাইরাস পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে অনেক দেশ আরোপিত বিধিনিষেধ শিথিল করে আনে। বিভিন্ন শিল্প ও আর্ধিক খাত ধীরে ধীরে স্বাভাবিকে ফিরতে শুরু করে। দেশে দেশে জ্বালানির চাহিদা বাড়তে শুরু তরে। এছাড়া ওপেকের রেকর্ড উত্তোলন হ্রাস চুক্তির শতভাগ বাস্তবায়নে বাজার থেকে জ্বালানি তেলের উদ্বৃত্ত সরবরাহ অনেকটা কমে আসে। সব মিলিয়ে জ্বালানির বাজার চাঙ্গা হতে শুরু করে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এসে বিভিন্ন দেশে ফের মহামারী পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও ব্রাজিলের মতো শীর্ষ জ্বালানি ভোক্তা দেশগুলোতে নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব আবার বেড়েছে। ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি চাহিদার যে প্রবৃদ্ধি দেখা দিয়েছিল তা পুনরায় থমকে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি গ্যাসবুড্ডির তথ্য অনুযায়ী, ১১ জুলাই শেষ হওয়া সপ্তাহে দেশটির খুচরা পর্যায়ে গ্যাসোলিনের চাহিদা আগের সপ্তাহের তুলনায় ৫ শতাংশ কামেছে। কভিড-১৯ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় সম্প্রতি দেশটির কয়েকটি অঙ্গরাজ্যকে আবার লকডাউন ও বিভিন্ন বিধিনিষেধের আওতাভুক্ত করা হয়েছে, যা পণ্যটির চাহিদা কমাতে প্রভাব ফেলেছে। এর আগের সপ্তাহেও দেশটিতে পণ্যটির চাহিদা কমতির দিকে ছিল। গত মার্চে লকডাউন আরোপের পর এটাই প্রথম পরপর দুই সপ্তাহ দেশটির গ্যাসোলিন ব্যবহারে মন্দার রেকর্ড।

নিউইয়র্কের অ্যাগেইন ক্যাপিটালের অংশীদার জন কিল্ডফ বলেন, আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম এ দুই সপ্তাহ পণ্যটির সর্বোচ্চ চাহিদার সময় হবে। কিন্তু তা হলো না। জ্বালানি চাহিদা প্রবৃদ্ধি পুনরায় নিম্নমুখী হতে শুরু করেছে। মূলত দেশটির ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাস ও ফ্লোরিডায় কভিড-১৯ প্রাদুর্ভাব বাড়ায় লকডাউন জারি করা হয়েছে। যানবাহন চলাচল সীমিত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মোট গ্যাসোলিন ব্যবহারে এক-চতুর্থাংশের বেশি ভোক্তা এ রাজ্য তিনটি।

যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মহামারী প্রাদুর্ভাবের আগে দেশটিতে গ্যাসোলিলের চাহিদা ছিল দৈনিক গড়ে ৯০ লাখ ব্যারেল, যা বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের ৯ শতাংশ।

ডাচ টেকনোলজি কোম্পানি টমটমের মতে, ভাইরাসের প্রকোপ বাড়ায় লস অ্যাঞ্জেলেস, ফিনিক্স, মিয়ামিসহ যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি প্রধান শহরে জুলাইয়ে যানবাহন চলাচল ব্যাপক হারে কমেছে। এছাড়া টেক্সাসে জুনে যানবাহন চালাচল কিছুটা বাড়লেও সম্প্রতি তা এপ্রিলের লকডাউন আরোপের পরের পর্যায়ে নেমেছে।

ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (ইআইএ) তথ্য অনুযায়ী, মহামারীর পর গ্যাসোলিনের বৈশ্বিক চাহিদা কমে তলানিতে ঠেকেছিল। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসায় গত মে মাসের তুলনায় জুনে জ্বালানি পণ্যটির বৈশ্বিক চাহিদা দৈনিক গড়ে ৩০ লাখ ব্যারেল বেড়ে যায়, যা পণ্যটির মাসভিত্তিক চাহিদা প্রবৃদ্ধিতে এ-যাবত্কালের মধ্যে সর্বোচ্চ। সাম্প্রতিক সময়ে আবার পণ্যটির চাহিদা কমতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া, স্পেন, যুক্তরাজ্যসহ জ্বালানির শীর্ষ ভোক্তা দেশগুলেতে দ্বিতীয় পর্যায়ে ভাইরাস আক্রমণ এর প্রধান কারণ।

অর্গানাইজেশন অব পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ জানিয়েছে, দ্বিতীয় ধাপে ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব অব্যাহত থাকলে চলতি বছর শেষে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের চাহিদা আগের বছরের তুলনায় দৈনিক গড়ে ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল কমে আসতে পারে, বর্তমান প্রক্কলন অনুযায়ী যা দৈনিক গড়ে ৯০ লাখ ব্যারেল।