বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে রাশিয়ার অবস্থান দিন দিন পোক্ত হচ্ছে। জ্বালানি তেল, কয়লা ও প্রাকৃতিক গ্যাস খাতে দেশটি আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে। নতুন নতুন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি প্রকল্পের অব্যাহত বিকাশ বৈশ্বিক বাজারে দেশটিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে। এ ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সাল নাগাদ বৈশ্বিক এলএনজি বাজারের ১৫ শতাংশ দখলের প্রত্যাশা করছে দেশটি। রাশিয়ার জ্বালানিমন্ত্রী আলেকজান্ডার নোভাক সম্প্রতি স্থানীয় ম্যাগাজিন এনার্জি পলিসিতে এ-বিষয়ক একটি নিবন্ধ লিখেছেন। খবর অয়েলপ্রাইসডটকম।

নিবন্ধে নোভাক লিখেছেন, শাখালিন-২ প্রকল্পের মাধ্যমে ২০০৯ সালে রাশিয়া প্রথম এলএনজি রফতানিকারক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এরপর থেকে দেশটি এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি রফতানি সাড়ে চার গুণ বাড়িয়েছে। এক্ষেত্রে তিনি দেশটির বিভিন্ন প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির সফলতার পাশাপাশি পাওয়ার অব সাইবেরিয়া ও টার্কস্ট্রিম প্রকল্পের অবদানের কথা তুলে ধরেন।

চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে রাশিয়ার পূর্বাঞ্চলকে যুক্ত করেছে ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া’ পাইপলাইন। জ্বালানির শীর্ষ বাজারগুলোর মধ্যে চীন অন্যতম। এলএনজি আমদানিতে বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ দেশ এটি। ফলে জ্বালানি পণ্যটির শীর্ষ রফতানিকরাদের জন্য বরাবরাই আগ্রহের জায়গা বেইজিং। অন্যদিকে এলএনজি ও জ্বালানি তেলের বাজারে রাশিয়ার আধিপত্য দিন দিন বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে চীনের বাজারে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের উদ্দেশ্যে ২০১৪ সালে ৩০ বছরের জন্য এ পাইপলাইন নিয়ে চুক্তি হয় রাশিয়া ও চীনের মধ্যে।

দুই দেশের মধ্যে গ্যাস সরবরাহে ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করে নির্মাণ করা হয়েছে পাওয়ার অব সাইবেরিয়া। রাশিয়ার পাইন বন, সাবজিরো সাইবেরিয়া নদী, জলাভূমি এবং পাথর-বালুর উঁচু-নিচু চার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে চীনের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে পাইপলাইনটি। চীনে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রকল্পটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি গ্যাজপ্রম।

অন্যদিকে ২০১৬ সালে তুরস্কের সঙ্গে টার্কস্ট্রিম পাইপলাইন চুক্তি হয় রাশিয়ার। এটার দায়িত্বেও রাখা হয় গ্যাজপ্রমকে। ২০১৭ সালে প্রকল্পেটির কাজ শুরু হয়। তুরস্ক বাদেও চলতি বছরের জানুয়ারিতে এ পাইপলাইন হয়ে বুলগেরিয়াতে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করেছে রাশিয়া। এছাড়া রাশিয়ার প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনকারী বৃহত্তম বেসরকারি কোম্পানি নোভাটেক বৈশ্বিক এলএনজি বাজারে দেশটির উপস্থিতি আরো বাড়িয়ে তুলছে বলেও জানান তিনি। ইয়ামাল এলএনজি প্লান্ট প্রকল্পের আওতায় ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এলএনজি রফতানি শুরু করে নোভাটেক। বর্তমানে দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি প্রকল্প আর্কটিক এলএনজি-২-এর মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান অধিক পোক্ত করেছে কোম্পানিটি। অবশ্য আর্কটিকে এলএনজি প্রকল্প বাস্তবায়নে রুশ সরকারের সহায়তা পাচ্ছে নোভাটেক।

গত বছরের অক্টোবরে রাশিয়ার এক জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা বলেছিলেন, আগামী দুই দশকেরও কম সময়ের মধ্যে আর্কটিক অঞ্চল রাশিয়ার প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন খাতের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। ২০৩৫ সাল নাগাদ দেশটির মোট প্রাকৃতিক গ্যাসের ৯০ শতাংশ উত্তোলন হতে পারে এ অঞ্চল থেকে।

রাশিয়ান ফার ইস্ট ও আর্কটিকের উন্নয়নবিষয়ক ডেপুটিমন্ত্রী আলেকজান্ডার ক্রিতিকভ বলেন, দেশটির জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস খাতে আর্কটিকের অবদান ক্রমেই বাড়ছে। জাতীয় পর্যায়ের মোট প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের ৯০ শতাংশ এখান থেকে উত্তোলনের সম্ভাবনার কথা বলেন তিনি। এছাড়া দেশটির মোট উত্তোলিত জ্বালানি তেলের এক-চতুর্থাংশের জোগান দিতে পারে অঞ্চলটি। তিনি বলেন, এলএনজির আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রভাবশালী হওয়ায় রাশিয়ার যে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা রয়েছে, তার মূল চাবিকাঠি এ আর্কটিক অঞ্চল। ফলে দেশটি আর্কটিক অঞ্চলের খনিজ সম্পদের পূর্ণ বিকাশে কর বিরতি, নিষ্কাশন করের ওপর বিশেষ ছাড়সহ অন্যান্য উপায়ে খাতসংশ্লিষ্টদের সহায়তা ও উদ্দীপনা দিয়ে আসছে।