পুঁজিবাজারের বিস্তার ও কাঠামোগত দুর্বলতা কাটাতে বহুজাতিক ও বড় প্রাইভেট কোম্পানিগুলোকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আইপিওতে (প্রাথমিক গণপ্রস্তাব) আসার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। স্বেচ্ছায় পুঁজিবাজারে অন্তর্ভুক্তি না হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার হাতে থাকা সিকিউরিটিজ অর্ডিন্যান্সের আইনি অস্ত্র বা বাধ্যবাধকতা প্রয়োগ করা হবে বলে জানিয়েছেন বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান। তিনি গতকাল রাজধানীর গুলশানের এক হোটেলে আয়োজিত আইডিএলসি ক্যাপিটাল মার্কেট কনক্লেভে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ, আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ, আইডিএলসি ফাইন্যান্স পিএলসির চেয়ারম্যান কাজী মাহমুদ সাত্তার, আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের চেয়ারম্যান এম জামাল উদ্দিন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলামসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
প্যানেল আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিএসইসি কমিশনার তানভীর হাবিব রহমান, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার, ডিবিএল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এমএ রহিম, সৌদি-বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (সাবিনকো) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. মারুফুর রহমান মজুমদার। আরো বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ইমাম আবু সাঈদ, আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের হেড অব ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিং মো. রাশিদুজ্জামান প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে আইডিএলসি ফাইন্যান্স পিএলসির চেয়ারম্যান কাজী মাহমুদ সাত্তার বলেন, ‘‘আমরা পুঁজিবাজারের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র, বিশেষ করে বন্ড মার্কেটকে কাঙ্ক্ষিতভাবে গড়ে তুলতে পারিনি। আমাদের বাজারে তারল্য বা লিকুইডিটি মূলত ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভর করে, যেখানে চেক লিখলেই টাকা তুলে নেয়া যায়, কিন্তু পুঁজিবাজারে নিজস্ব টেকসই তারল্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। পুঁজিবাজারের ফোকাস কেবল আইপিওতে সীমাবদ্ধ না রেখে এমনভাবে বিকাশ ঘটাতে হবে, যাতে এটি মূলধনের সঠিক সংস্থান ও বড় প্রজেক্টে ডেট অর্থায়নের উপযুক্ত সাপোর্ট দিতে পারে।
মূল প্রবন্ধে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ বলেন, ‘খেলাপি ঋণের হার বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা ও মূলধন ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানিসংকট এবং ব্যাংক খাতের সংকটে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমছে। ফলে তাদের সঞ্চয় ও বিনিয়োগ করার সক্ষমতা কমেছে। সার্বিক এ পরিস্থিতিতে নতুন করে বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা বড় চ্যালেঞ্জ। এ সংকট কাটিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যাংক খাতের পাশাপাশি পুঁজিবাজারের ওপর আস্থা ফেরানো জরুরি। দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য দেশের ভেতরে আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।’
আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের চেয়ারম্যান এম জামাল উদ্দিন বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি যত এগিয়ে যাচ্ছে, আমাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়নের চাহিদাও তত বাড়ছে এবং সে চাহিদা ক্রমেই বহুমাত্রিক রূপ নিচ্ছে। এ বাস্তবতায় একটি শক্তিশালী ও গতিশীল পুঁজিবাজার গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। দীর্ঘমেয়াদি করপোরেট অর্থায়নের জন্য পুঁজিবাজারকে আরো কার্যকর বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলা গেলে ব্যাংক খাতে এর ওপর ক্রমবর্ধমান অর্থায়নের চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, ‘অনেক উদ্যোক্তা স্বাধীন পরিচালক (ইনডিপেনডেন্ট ডিরেক্টর) বসানো বা স্বত্ব হারানোর ভয়ে পিছিয়ে থাকেন, কিন্তু স্বাধীন পরিচালকরা কোম্পানির মূল কৌশলগত নিয়ন্ত্রণে বাধা তৈরি করেন না। এছাড়া ব্যাংক ও রাজস্ব ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান অটোমেশনের ফলে এখন প্রাইভেট কোম্পানিতেও গোপন তথ্য বা ফিগার লুকিয়ে রাখার সুযোগ শেষ হয়ে আসছে।’
পারিবারিক ব্যবসার স্থায়িত্ব ও পরবর্তী প্রজন্মের ব্যবসায়িক উত্তরণে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তিকে একটি উত্তম মাধ্যম উল্লেখ করে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘বিএসইসি পর্যবেক্ষণ করছে কারা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বাজারে আসছে। তবে বহুজাতিক ও বড় কোম্পানিগুলো স্বেচ্ছায় এগিয়ে না এলে সিকিউরিটিজ অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী প্রদত্ত আইনি ক্ষমতাবলে কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্তির নির্দেশ দেয়ার “সিকিউরিটিজ অর্ডিন্যান্স নামের অস্ত্র’’ প্রয়োগ করতে বাধ্য হবে কমিশন।’
আইপিও আবেদনে সময়ক্ষেপণ রোধে পুরো যাচাই প্রক্রিয়া ঢেলে সাজানো হয়েছে উল্লেখ করে মাসুদ খান বলেন, ‘এর আগে বিএসইসি বা স্টক এক্সচেঞ্জে অডিট রিপোর্ট ও নথি যাচাই করতে গিয়েই দীর্ঘ সময় চলে যেত। নতুন নিয়মে প্রাথমিক নথিপত্র ও ব্যালান্স শিট ভেরিফিকেশনের পূর্ণ দায়ভার অডিটরকে নিতে হবে। অডিটকৃত নথি দাখিলের পর নিয়ন্ত্রক সংস্থা আর কোনো প্রশ্ন তুলবে না; তবে পরবর্তী সময়ে কোনো জালিয়াতি বা অনিয়ম ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট অডিটরের লাইসেন্স স্থগিতসহ কঠোর শাস্তি কার্যকর করা হবে।
এছাড়া মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা আনতে সরকারি সিকিউরিটিজের মতো “ডাচ অকশন মেথড’’ চালু করা হচ্ছে, যেখানে বিনিয়োগকারীরা কাট-অফ প্রাইসে বিড করতে পারবেন। বাজারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ১৮৮০ সালের পুরনো “ট্রাস্ট অ্যাক্ট’’ সংশোধনের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। বর্তমানে এ আইনের বাধ্যবাধকতার কারণে দেশের পেনশন ও লাইফ ইন্স্যুরেন্স ফান্ডগুলো কেবল সঞ্চয়পত্র ও সরকারি বন্ডে বিনিয়োগে সীমাবদ্ধ রয়েছে। আইনটি সংস্কার করা হলে ক্যাপিটাল মার্কেট ও করপোরেট বন্ডে বড় প্রাতিষ্ঠানিক তহবিলের প্রবাহ সৃষ্টি হবে।’










