নিরাপদ বিনিয়োগের চাহিদা বৃদ্ধি, সুদহার কমার প্রত্যাশা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ক্রমবর্ধমান স্বর্ণ সংগ্রহ মিলিয়ে মূল্যবান ধাতুটির দাম ক্রমে বাড়ছে। গতকাল স্বর্ণের দাম আউন্সপ্রতি রেকর্ড ৫ হাজার ১০০ ডলারে পৌঁছে যায়। এতে বৈশ্বিক স্বর্ণভাণ্ডারের সম্মিলিত আকার বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ইউরো। এ পরিস্থিতিকে পর্তুগালের জন্য সুখবরই বলা যায়। কারণ দেশটি এখনো এ মূল্যবান ধাতুর ওপর ভরসা করে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, পর্তুগালের কাছে রয়েছে ৩৮২ দশমিক ৬৬ টন স্বর্ণ, যার মূল্য প্রায় ৪ হাজার ৭০০ কোটি ইউরো। এ স্বর্ণের প্রায় অর্ধেক রাখা আছে ব্যাংক অব পর্তুগালের মালিকানাধীন একটি উচ্চ নিরাপত্তাসম্পন্ন ভবনে। বাকি অর্ধেক রয়েছে লন্ডনে।
বিশ্বে স্বর্ণভাণ্ডারের দিক থেকে পর্তুগালের অবস্থান ১৪তম ও পশ্চিম ইউরোপে সপ্তম। তালিকায় পর্তুগালের আগে রয়েছে জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও পোল্যান্ড।
মুদ্রা বা আর্থিক সংকটের সময় স্বর্ণ এক ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। মুদ্রার পতন ঘটলে বা আন্তর্জাতিক তারল্য পাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো স্বর্ণ বিক্রি করে মুদ্রা সংগ্রহ করতে অথবা জামানত হিসেবে অর্থায়ন নিশ্চিত করতে পারে। ১৯৭৭, ১৯৮৩ ও ২০১১ সালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তিনটি কর্মসূচির সময় এ কৌশল ব্যবহার করেছিল পর্তুগাল।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্যানুযায়ী, অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংকই মার্কিন ডলারের ওপর থেকে নির্ভরতা কমাতে স্বর্ণ কিনছে। গত এক বছরে সবচেয়ে বড় ক্রেতা ছিল পোল্যান্ড। দেশটি ভাণ্ডারে যোগ করেছে ৮২ দশমিক ৬৭ টন স্বর্ণ, ফলে মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৩০ দশমিক ৯ টন। এছাড়া কাজাখস্তান যোগ করেছে ৪০ দশমিক ৯৭, ব্রাজিল ৩১ দশমিক ৪৮ ও তুরস্ক ২৬ দশমিক ৬৮ টন স্বর্ণ। চীন ও চেক প্রজাতন্ত্রের ভাণ্ডারে যুক্ত হয়েছে যথাক্রমে ২৪ দশমিক ৮৮ ও ১৮ টন স্বর্ণ।
পর্তুগালের ভাণ্ডারে সর্বোচ্চ স্বর্ণ পৌঁছেছিল ১৯৭৪ সালে, ৮০০ টনেরও বেশি। এত বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ জমার পেছনে রয়েছে ব্রাজিলে ঔপনিবেশিক ইতিহাস এবং আধুনিক যুগে বাণিজ্য, বিশেষ করে ১৯৩৩-৭৪ সাল পর্যন্ত এসতাদো নোভো শাসনামলের ভূমিকা।
ব্রাজিলের স্বর্ণ নিয়ে বিস্তর আলোচনা থাকলেও আঠারো শতকে উপনিবেশ ও মূল ভূখণ্ডের মধ্যে প্রধান রফতানি পণ্য ছিল এ ধাতু। তবে তা এসতাদো নোভো যুগ পর্যন্ত টিকে ছিল, এমন সম্ভাবনা খুবই কম। অবশ্য একনায়ক আন্তোনিও দে অলিভেইরা সালাজারের আমলে জমা হওয়া স্বর্ণের বড় অংশের উৎস নাৎসি জার্মানি। কারণ বাজেট ভারসাম্য রক্ষায় সালাজারের একরোখা মনোভাব।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে নিজেদের নিরপেক্ষ ঘোষণা দেয়া পর্তুগাল সব পক্ষের সঙ্গেই বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। ওই সময় দেশটির অন্যতম রফতানি পণ্য ছিল কামান, গোলাবারুদ ও যুদ্ধযন্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত উপকরণ টাংস্টেন। উচ্চমান ও বিপুল মজুদের কারণে পর্তুগাল বিশ্বে টাংস্টেনের অন্যতম সরবরাহকারী হয়ে ওঠে। বিশেষ করে জার্মানির সমরাস্ত্র শিল্প প্রায় পুরোপুরি এ ধাতুর ওপর নির্ভরশীল ছিল। সালাজারের শর্ত অনুযায়ী, এসব রফতানির বড় অংশের মূল্য পরিশোধ করা হতো স্বর্ণে।
১৯৩৯ সালে ব্যাংক অব পর্তুগালের স্বর্ণভাণ্ডার ছিল মাত্র ৬৫ টন। ১৯৪৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩০৬ টনে। ১৯৭৪ সালের পর্তুগিজ বিপ্লবের সময় পৌঁছায় ৮৬৬ টনে। অবশ্য সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে স্বর্ণের মুদ্রাগত ভূমিকা হারিয়ে যাওয়ায় মজুদের বড় একটি অংশ বিক্রি করে দেয় পর্তুগাল। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত প্রতিটি দেশের কাছে থাকা স্বর্ণের পরিমাণই ছিল মুদ্রা জারির ভিত্তি। কিন্তু ওই সময়ের পর মূল্য ধাতুটি আর সেই ভূমিকায় থাকেনি। তবে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে স্বর্ণের ভূমিকা বাড়ছে। —ইউরোনিউজ অবলম্বনে










