চীনের সঙ্গে ভারতের তুমুল রাজনৈতিক বিরোধ চলছে। করোনা মহামারীর মধ্যেও লাদাখ সীমান্তে রক্ত ঝড়িয়েছে দুই দেশ। সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতি এড়ানো গেলেও উত্তেজনা কমেনি। ভূরাজনৈতিক বিরোধ এখন প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে বাণিজ্যে। বিরোধের জের ধরে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি কিংবা ভারত থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে জ্বালানি পণ্য রফতানিতে চীনা মালিকানাধীন ও পতাকাবাহী জাহাজ বা ট্যাংকার ব্যবহার বন্ধের কথা জানিয়েছে ভারত। খবর অয়েলপ্রাইসডটকম ও ব্লুমবার্গ।

ভারতের সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠানগুলো এরই মধ্যে জ্বালানি পরিবহনে ট্যাংকার সরবরাহকারীদের এ বিষয়ে অবহিত করেছে। বলা হয়েছে, বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে ভারতের পরিশোধন কেন্দ্রগুলোর জন্য অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে চীনা মালিকানাধীন কিংবা চীনের পতাকাবাহী ট্যাংকার ভাড়া করা যাবে না। একইভাবে ভারত থেকে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য রফতানিতেও একই নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। তবে এ বিষয়ে ভারত সরকার কিংবা দেশটির জ্বালানি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ঘোষণা দেয়া হয়নি।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চীনা ট্যাংকার পরিহার করায় ভারতের জ্বালানি আমদানি-রফতানিতে বড় কোনো সমস্যা তৈরি হবে না। অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে চীনা ট্যাংকারের ব্যবহার আগে থেকেই সীমিত। বরং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতে চীনা ট্যাংকার সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে ভাতীয় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। আর অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি-রফতানিতে ভারতীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠানগুলো লাইবেরিয়া, পানামা ও মরিশাসের পতাকাবাহী ট্যাংকার বেশি ব্যবহার করে। তবে অনেক সময় ট্যাংকার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে জলযান জোগাড় করে দেয়। মূলত এসব ক্ষেত্রে যাতে চীনা কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা পতাকাবাহী ট্যাংকারের সঙ্গে চুক্তি না হয়, সেই বিষয়ে সতর্ক করেছে ভারত।

চীন ও ভারত বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিকারক দেশ। গত শতকের ষাটের দশকের পর দেশ দুটির সম্পর্ক এখন সবচেয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি পার করছে। পারমাণবিক শক্তিধর দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ বাধলে তা দক্ষিণ এশিয়ার পাশাপাশি পুরো বিশ্বের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক চালচিত্র বদলে দিতে পারে। এমন আশঙ্কা থেকে দুই দেশই ভূরাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক উত্তেজনা চালিয়ে গেলেও সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো থেকে বিরত রয়েছে।

এদিকে নভেল করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যেও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি বাড়িয়েছে চীন। দেশটির জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব কাস্টমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) চীনা আমদানিকারকরা আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সব মিলিয়ে ২৬ কোটি ৯০ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করেছেন। দৈনিক হিসাবে এর গড় পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৯ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেলে। এক বছরের ব্যবধানে দেশটিতে জ্বালানি পণ্যটির আমদানি বেড়েছে ৯ দশমিক ৯ শতাংশ।

বছরের শুরু থেকে নভেল করোনাভাইরাসের মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছে চীন। সংক্রমণ এড়াতে টানা লকডাউনে কার্যত স্থবির ছিল দেশটির বড় শহরগুলো। মানুষ ছিল ঘরবন্দি। কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন খাতে নেমে এসেছিল অচলাবস্থা। এ পরিস্থিতি চীনে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চাহিদা কমিয়ে দিয়েছিল। ফলে বছরের শুরুর দিকে চীনে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি তুলনামূলক শ্লথ ছিল। যত দিন গেছে জ্বালানি পণ্যটির আমদানি বাড়িয়েছে চীন। লকডাউন পুরোপুরি উঠে যাওয়ার পর অর্থনীতিতে গতি ফেরায় এপ্রিল, মে ও জুন মাসে জ্বালানি তেলের আমদানি রেকর্ড পরিমাণ বাড়িয়েছে দেশটি।

করোনাকালে আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানির পথে হাঁটছে চীন। এজন্য দেশটির সরকার বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ঝেজিয়াং পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড কেমিক্যাল করপোরেশন লিমিটেডকে (জেডপিসি) লাইসেন্স দিয়েছে। চীনের ইতিহাসে এটাই প্রথম কোনো বেসরকারি জ্বালানি প্রতিষ্ঠান, যেটি জ্বালানি তেল রফতানির লাইসেন্স পেয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি কী পরিমাণ জ্বালানি তেল রফতানি করতে পারবে, সেই কোটা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।