দেশের আর্থিক খাতেরে কাঠামো নির্দিষ্ট কিছু চক্রে আটকে ছিল বলে মনে করছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তার মতে, ‘বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি টাকা দেবে, আর আমরা দেশ চালাব—এ সময় চলে গেছে। ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে যেতে হলে আমাদের প্রতি বছর ৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। অথচ আমরা তাদের ১০ বিলিয়ন ডলারের দিকে চেয়ে থাকব, তা হবে না। আমরা এখন নিউইয়র্কে “‍‌ডলার বন্ড” ইস্যু করতে যাচ্ছি এবং হংকংয়ে “‍‌বাংলাদেশ ডেডিকেটেড ফান্ড” গঠন করতে যাচ্ছি। প্যান্ডা বন্ড, সামুরাই বন্ড ও লোকাল কারেন্সি বন্ডের দিকেও আমরা এগোচ্ছি। আমরা দেশের সরকারি-বেসরকারি আর্থিক কাঠামোই পরিবর্তন করে দিচ্ছি।’

গতকাল রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন মন্ত্রী। ‘‌বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠান যৌথভাবে আয়োজন করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অব সিকিউরিটিজ কমিশনস (আইওএসসিও)। এবারের প্রতিপাদ্য ‘বিনিয়োগকারীর স্থিতিস্থাপকতা, ডিজিটাল প্রতারণা ও প্রতারণা সতর্কতা’।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘‌সত্যি বলতে, বাংলাদেশের পুঁজিবাজার কোনো সময়ই সেভাবে মনোযোগ পায়নি। স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমান যখন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পুনরায় চালু করলেন এবং মিউচুয়াল ফান্ড ডেভেলপ করলেন, তখন ওনার একটি চিন্তাভাবনা ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নীতিসহ অন্যান্য যেসব সহযোগিতা প্রয়োজন ছিল, তা সামগ্রিকভাবে আসেনি। একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি না থাকার কারণে আমাদের পুঁজিবাজার সত‍্যিকারার্থে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ফলে আর্থিক খাতের পুরো নির্ভরতা ব্যাংকের ওপর গিয়ে ঠেকেছে। প্রায় সবাই ব্যাংক থেকেই বড় বড় ঋণ নিয়েছে। অথচ ব্যাংকের মূল ভিত্তি হলো স্বল্পমেয়াদি আমানত, আর তারা দিচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, যা সুস্পষ্ট মিসম্যাচ।’

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বিগত সময়ে পুঁজিবাজারে যা হয়েছে, সেসব ভেবে বসে থাকার সুযোগ নেই এখন আর। বর্তমানে আমরা একে উদ্ধার করার চেষ্টা করছি, যার জন্য আমাদের কিছু কঠিন ও বেদনাদায়ক সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। বিশ্বমানের অর্থনীতির সঙ্গে তাল মেলাতে হলে আমাদের এখন “‍হাই স্ট্রিট থেকে ওয়ার্ল্ড স্ট্রিট”-এর দিকে যাত্রা করতে হবে। আমাদের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য বন্ড মার্কেট, ডেরিভেটিভস, সিকিউরিটাইজেশন ও ইকুইটি মার্কেটের ওপর জোর দিতে হবে।’

নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামোর চেয়ে নৈতিক দায়িত্বশীলতার সঙ্গে বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে একযোগে কাজ করার অনুরোধ জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘পুঁজিবাজারে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও পেশাদারত্ব দেখতে চাই। বিএসইসি একা কোনো অলৌকিক পরিবর্তন আনতে পারবে না। ব্রোকার, স্টক এক্সচেঞ্জ, ডিপোজিটরি, ক্রেডিট রেটিং সংস্থা ও ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের মতো প্রতিটি স্টেকহোল্ডারকে নিজেদের নৈতিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিশ্চিত করে সেলফ রেগুলেটেড হতে হবে। রেগুলেটর এসে নির্দেশ দেবে সে অপেক্ষায় না থেকে স্ব-উদ্যোগেই বাজারে স্বচ্ছতা ও বিশ্বাস নিশ্চিত করতে হবে। পুঁজিবাজারকে বর্তমান নাজুক অবস্থা থেকে পুনর্গঠন ও শক্তিশালী করতে বাজারসংশ্লিষ্ট সব অংশীদারের স্বতঃস্ফূর্ত সুশাসনচর্চার প্রয়োজন। তাহলে এক বছরের মধ্যে দেশের পুঁজিবাজারের চেহারা বদলে যাবে।’

অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার গনি। তিনি বলেন, ‘পুঁজিবাজারের সংস্কারে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ এগিয়ে চলছে। সরাসরি তালিকাভুক্তির (ডাইরেক্ট লিস্টিং) নিয়ম, প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর বিধিমালা ও ট্রাইব্যুনাল-সংক্রান্ত সংস্কার নিয়ে দ্রুত কাজ করা হচ্ছে। বাজারের কার্যকারিতা বাড়াতে ফ্লোর প্রাইস, সার্কিট ব্রেকারসহ বিভিন্ন নীতিগত বিষয়ও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। দুই বছরের মধ্যে দেশের পুঁজিবাজারকে এ অঞ্চলের অন্য বাজারগুলোর সঙ্গে তুলনীয় পর্যায়ে নেয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।’

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান। তিনি বলেন, ‘আইপিও আবেদনের পর অনুমোদন পেতে যে দীর্ঘ সময় লাগে, নতুন প্রক্রিয়ায় তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা হবে। তিন মাসের মধ্যে আমরা আইপিও অনুমোদন দেব। ডিএসই, সিএসই ও কমিশনের সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াগুলো সমন্বিতভাবে পরিচালনার মাধ্যমে সময় কমিয়ে আনা হবে। আমরা তিন মাসের মধ্যে আইপিও অনুমোদন করবই।’

তিনি আরো বলেন, ‘পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানি আনার ক্ষেত্রে ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের সুযোগও রাখা হচ্ছে। তবে এ ক্ষেত্রে যোগ্যতার মানদণ্ড অনেক কঠোর করা হয়েছে। কেবল এলিট বা অত্যন্ত যোগ্য কোম্পানিগুলোই সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ পাবে। বহুজাতিক ও বড় স্থানীয় কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আনতে সরাসরি তালিকাভুক্তির পাশাপাশি নতুন হাইব্রিড পদ্ধতিরও সুযোগ দেয়া হবে। এ ব্যবস্থায় একটি অংশ জনগণের কাছে শেয়ার ছাড়ার মাধ্যমে এবং অন্য অংশ বিদ্যমান মালিকদের শেয়ার অফলোডের মাধ্যমে বাজারে আসতে পারবে।’

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক। তিনি বিনিয়োগকারীদের আর্থিক স্বাক্ষরতার ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘আর্থিক স্বাক্ষরতা না থাকার কারণে অনেক বিনিয়োগকারী বিভিন্ন দুর্বল প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাই আর্থিক স্বাক্ষরতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহকে কেন্দ্র করে নয়; বরং পুরো বছরজুড়েই বিনিয়োগকারীদের জন্য সচেতনমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে।’

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন তার বক্তব্যে বলেন, ‘পুরো বিশ্বজুড়েই পুঁজিবাজারে বড় প্রাতিষ্ঠানটিক বিনিয়োগকারীর ভূমিকায় থাকে জীবন বীমা কোম্পানিগুলো। যদিও আমাদের দেশে এর বিপরীত চিত্র দেখা যায়। পুঁজিবাজার স্থিতিশীলতায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হিসেবে ভূমিকার রাখতে হলে বীমা খাতের উন্নয়ন ও সংস্কার করা প্রয়োজন।’

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার, ডিএসই চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।