ট্যারিফ বা শুল্কযুদ্ধ, প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা কিংবা তাইওয়ান ইস্যু—নানা সংবেদনশীল ভূরাজনৈতিক বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে দ্বন্দ্বের শেষ নেই। কিন্তু এ টানাপড়েনের মধ্যেও দুটি পরাশক্তিকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলেছে একটি সাধারণ উপাদান ‘‌ফাস্টফুড’। একদিকে বিশাল জনসংখ্যার চীনে দ্রুত বাজার সম্প্রসারণ করছে মার্কিন খাদ্য প্রস্তুতকারক ব্র্যান্ডগুলো। অন্যদিকে নিজ দেশের মন্দা এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ব্যবসার বিস্তার ঘটাচ্ছে চীনা রেস্তোরাঁ চেইনগুলো। খবর এপি।

বার্গার, ফ্রাইড চিকেন আর বাবল টি এখন দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা ও সংস্কৃতির নতুন একটি অনন্য সেতুতে পরিণত হয়েছে। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যাপারচার চায়নার প্রতিষ্ঠাতা ইয়ালিং জিয়াং এটিকে ব্যবসায়িক ও ভোক্তাভিত্তিক ‘গ্যাস্ট্রোডিপ্লোমেসি’ বা খাদ্য কূটনীতি বলে অভিহিত করেছেন।

তার মতে, আমেরিকানদের খাদ্যাভ্যাস বিশ্বমুখী হওয়ায় চীনা ব্র্যান্ডগুলোর জন্য জায়গা তৈরি হয়েছে। এ বাণিজ্যিক বিস্তার চীনকে ‘সফট পাওয়ার’ বা সাংস্কৃতিক প্রভাব বাড়াতে বড় সাহায্য করছে।

বাস্তবেও দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের জীবনে এসব খাবারের বিশেষ স্থান রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফাস্টফুডের প্রতি অনুরাগের কথা সবার জানা। এমনকি ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি একটি ম্যাকডোনাল্ডসের আউটলেটে ফ্রেঞ্চ ফ্রাইজ ভাজার কাজও করেছিলেন। অন্যদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে ২০১৩ সালে বেইজিংয়ের একটি দোকানে লাইনে দাঁড়িয়ে খুব সাধারণ একটি স্টিমড-বান বা ভাপা পিঠা খেতে দেখা গিয়েছিল।

চীনে মার্কিন ফাস্টফুড চেইনের বিস্তার

যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনের জনসংখ্যা প্রায় চার গুণ বেশি। ফলে বিশাল এ বাজারে নতুন ও পুরনো সব মার্কিন ফাস্টফুড ব্র্যান্ডগুলো প্রতিযোগিতা করছে। গত মাসেই সাংহাইয়ে চালু হয়েছে চার্চেস টেক্সাস চিকেনের প্রথম আউটলেট। উদ্বোধনী দিনে বৃষ্টির মধ্যেও আউটলেটের বাইরে লম্বা লাইনে জমা হন হাজারও চীনা গ্রাহক। অন্য বিখ্যাত ব্র্যান্ড ওয়েনডিস আগামী ১০ বছরে চীনে এক হাজার নতুন রেস্তোরাঁ চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি পুরনো ব্র্যান্ডগুলোও বসে নেই। ম্যাকডোনাল্ডস চলতি বছরই এক হাজার নতুন আউটলেট খোলার পরিকল্পনা করছে দেশটিতে। এদিকে ২০০৫ সালে চীনে প্রবেশ করা বার্গার কিং নিজেদের শাখা তিন গুণ বাড়িয়ে চার হাজারে নেয়ার পরিকল্পনা করছে।

আমেরিকান ফ্রাইড চিকেন চেইন কেএফসির জন্য এখন সবচেয়ে বড় বাজার হলো চীন। যুক্তরাষ্ট্রে ৩ হাজার ৭৫০টি শাখা হলেও চীনে ব্র্যান্ডটির আউটলেটের সংখ্যা প্রায় ১৩ হাজার।

বাজার গবেষকদের মতে, রাজনীতিতে যত দ্বন্দ্বই থাক না কেন, চীনের সাধারণ তরুণদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের খাবারের ব্র্যান্ডগুলোর আকর্ষণ এখনো তুঙ্গে।

যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রিয় চীনা ব্র্যান্ডের প্রবেশ

চীনের ফাস্টফুড ও পানীয়ের ব্র্যান্ডগুলোও এখন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ করছে। এর মধ্যে রয়েছে বাবল টি, ফলের চা, দুধ চা, কফি ও আইসক্রিমের ব্র্যান্ড।

চীনের অন্যতম বড় ফাস্টফুড চেইন মিক্সু গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম তিনটি দোকান খোলে। নিউইয়র্কের হেরাল্ড স্কয়ারে প্রতিষ্ঠানটির দোকান চালুর সময়ও ক্রেতাদের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। ঠাণ্ডার মধ্যেও মানুষ মিক্সুর সফট-সার্ভ আইসক্রিম, ফলের চা ও দুধ চা খেতে অপেক্ষা করেন।

মিক্সুর যুক্তরাষ্ট্রে আরো অন্তত দুই ডজন দোকান খোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব দোকান চারটি অঙ্গরাজ্যে খোলা হবে। শুধু মিক্সু নয়। ২০২৩ সালের পর অন্তত আরো নয়টি চীনা ফাস্টফুড ও পানীয় ব্র্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ করেছে। এর বেশির ভাগই পানীয় ও হালকা খাবারের ব্যবসা করে।

চীনের জনপ্রিয় চা ব্র্যান্ড হেইটিয়ার যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৪০টি দোকান রয়েছে। অন্যদিকে লাকিন কফির নিউইয়র্কে রয়েছে ২০টি দোকান। চীনের বাজারে লাকিন কফি স্টারবাকসকে পেছনে ফেলে সবচেয়ে বড় কফি ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে।

চীনা প্রতিষ্ঠান ওয়ালেসও যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রসারণ করছে। ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডটি চীনে মার্কিন ধাঁচের চিকেন ও বার্গার বিক্রি করে বড় হয়েছে। এখন চীনে প্রতিষ্ঠানটির রেস্তোরাঁর সংখ্যা ২০ হাজারের বেশি। গত মাসে ক্যালিফোর্নিয়ায় দ্বিতীয় মার্কিন দোকান খুলেছে ওয়ালেস। সেখানে স্থানীয় ক্রেতাদের পছন্দের কথা বিবেচনা করে চিকেন স্যান্ডউইচের রেসিপিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।