স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেডে (এসএওসিএল) নিজেদের অংশীদারিত্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এসএওসিএল যদি বিপিসির পাওনা পরিশোধে ব্যর্থ হয়, তাহলে শেয়ার কিনে কোম্পানিটির নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে বিপিসি। এদিকে দুই মাসে এসএওসিএল প্রায় ৩৩৯ কোটি টাকা পাওনা পরিশোধ করেছে বিপিসিকে। বাকি টাকা পরিশোধে নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিপিসির কর্মকর্তারা।

বিশ্লেষকরা জানান, জ্বালানি বিপণন ছাড়া ব্যক্তিগত ১২৪ কোটি টাকা পরিশোধ করা কোম্পানিটির পক্ষে বেশ কষ্টসাধ্য। অন্যদিকে অর্ধেক মালিকানা থাকায় বিপিসি সরাসরি কোম্পানিটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে না। সেজন্য এসএওসিএলে বিপিসির অংশীদারিত্ব বাড়ানো জরুরি। এছাড়া আগে এসএওসিএলের সক্ষমতা বিবেচনা না করে জ্বালানি বিপণনে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল, সেগুলো ভুল পদক্ষেপ ছিল বলে জানান তারা।

বিপিসির মাধ্যমে যেসব জ্বালানি তেল দেশে আমদানি করা হয়, তার একটি বড় অংশ বিপণন করে এসএওসিএল। অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন কোম্পানিতে (পদ্মা, মেঘনা, যমুনা অয়েল) সরকারের শেয়ারের পরিমাণ ৫১ শতাংশ এবং বেসরকারি খাতের ৪৯ শতাংশ হলেও এসএওসিএলের ক্ষেত্রে সরকারি শেয়ারের পরিমাণ ৫০ শতাংশ এবং বেসরকারি শেয়ার ৫০ শতাংশ। শেয়ারের পরিমাণ অর্ধেক হওয়ার সুবাধে এসএওসিএলের ওপর বিপিসির সরাসরি কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, অর্থ আত্মসাতের জন্য ঢাকায় এসএওসিএলের নামের সঙ্গে মিল রেখে অন্য আরেকটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে কোম্পানির সাবেক মহাব্যবস্থাপক মৃত মোহাম্মদ শাহেদ এবং কোম্পানির পরিচালক মঈন উদ্দিন আহমেদ, যার মধ্যে ৫৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদকে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে ২০১৯ সালে। সেটি এখনো তদন্তনাধীন। এছাড়া বিপণন ছাড়া এসএওসিএলের কাছে বিপিসির পাওনা আছে প্রায় ১২৪ কোটি টাকার বেশি।

বিপিসির তথ্যমতে, দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (প্রশাসন) মুনির চৌধুরী ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে এসএওসিএলের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তদন্ত শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে মুনীর চৌধুরীর নির্দেশে ২৮ জানুয়ারি উপপরিচালক এসএম সাহিদুর রহমান ও মোহাম্মাদ মাহমুদুর রহমানের সমন্বিত এনফোর্সমেন্ট টিম এসব ব্যাংকে অনুসন্ধান চালায়। অনুসন্ধানের পরিপ্রেক্ষিতে দুদক প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে তদন্ত করে ৫৭ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পায়। ব্যাংকের দেয়া তথ্যমতে, এসএওসিএলের পরিচালক মঈনউদ্দিন ও তার স্ত্রীর পিরামিড এক্সিম লিমিটেডের নামে গত তিন বছরে বিভিন্ন ব্যাংকে প্রায় ৪৩ কোটি টাকা এবং মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহেদের গুডউইন কোম্পানির নামে গত তিন বছরে প্রায় ১৪ কোটি টাকা জমা ও উত্তোলন করেন তারা। মামলাটি বর্তমানে দুদকে তদন্তনাধীন আছে।

এদিকে এসএওসিএলের নানা দুর্নীতি এবং অসংগতি রোধে বিপিসির উপমহাব্যবস্থাপক (বণ্টন ও বিপণন) মোরশেদ হোসাইন আজাদকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে উপমহাব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়।

অন্যদিকে এসএওসিএলের মহাব্যবস্থাপক মো. শাহেদ করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে কোম্পানিটির বকেয়া নিয়ে বেশ চাপে পড়ে বিপিসি। আর নতুন করে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অসংগতি এবং কোম্পানির পুনর্গঠনে মোরশেদ হোসাইন আজাদকে ৩০ নভেম্বর ২০২০ তারিখে দায়িত্ব দেয় বিপিসি।

এ বিষয়ে বিপিসির উপমহাব্যবস্থাপক (বণ্টন ও বিপণন) মোরশেদ হোসাইন আজাদ বণিক বার্তাকে বলেন, স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেড সরকারি ও বেসরকারি মালিকানাধীন থাকায় নানা জটিলতা ছিল আগে থেকেই। গত বছরের ৭ ডিসেম্বর আমি প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব নেয়ার পর সংস্কারমূলক কাজ করছি। বিপিসির বকেয়া পরিশোধসহ কোম্পানিটিতে দীর্ঘদিন হয়ে চলা দুর্নীতি এবং অসংগতিগুলো খুঁজে বের করার কাজ করছি। প্রতিষ্ঠানটির কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনা, নথি ব্যবস্থাপনা প্রচলন, অহেতুক খরচ কমানো, বিভিন্ন ক্রয়াদেশ অনুমোদনসাপেক্ষ করা ইত্যাদি কাজ করা হচ্ছে বলেও জানান বিপিসির এ কর্মকর্তা।

তিনি আরো জানান, এসএওসিএলের বকেয়া পাওনা যদি পরিশোধ না করা সম্ভব হয়, তাহলে বকেয়া টাকা সমপরিমাণের শেয়ার এসএওসিএল থেকে কিনে নেবে বিপিসি। তখন বিপিসি এই কোম্পানিতে তার অংশীদারিত্ব বাড়াবে, যা বিপিসি এবং এসএওসিএলের জন্য ভালো হবে বলে জানান তিনি।

বিপিসির তথ্যমতে, ব্যক্তিগত বকেয়া বাদে জ্বালানি তেল বিপণন বাবদ কোম্পানিটির কাছে বিপিসির বকেয়া পাওনা ছিল ৫২৯ কোটি টাকা। তবে বিভিন্ন এফডিআর ভেঙে গত দুই মাসে প্রায় ৩৩৯ কোটি টাকা বিপিসিকে পরিশোধ করেছে এসএওসিএল। এদিকে বকেয়া ১৯০ কোটি টাকা পরিশোধের জন্য সীতাকুণ্ডে ৩ দশমিক ৭২ একরের এসএওসিএলের একটি জমি নিলামে তুলতে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে বিপিসি। এ জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৩৫ কোটি টাকা বলে জানিয়েছে বিপিসি।

এদিকে কোম্পানিতে অপ্রয়োজনীয় খাতে খরচ কমাতে নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বিপিসির পক্ষ থেকে। এর মধ্যে এসএওসিএলের নামে শতাধিক ভিআইপি সিম কার্ড চালাতেন মালিকপক্ষের আত্মীয়-স্বজনরা। কিন্তু বিল পরিশোধ করা হতো এসএওসিএলের ফান্ড থেকে। এই সীমকার্ডগুলো জব্দ করেছে বিপিসি। কক্সবাজারে এসএওসিএলের এভিয়েশন ডিপো কোনো কাজে না লাগলেও প্রতি মাসে সেখানে ১৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা লোকসান দিত প্রতিষ্ঠানটি। এই ডিপো মেঘনার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানে অপ্রয়োজনীয় প্রায় ৬৮ জন লোকবল ছাঁটাই করা হয়েছে, যাদের প্রতি মাসে বেতন দেয়া হতো ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে এসএওসিএলের সেলস সেন্টার বন্ধ করে প্রতি মাসে সাশ্রয় হচ্ছে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অন্যদিকে এসএওসিএলের ৩৩টি গাড়ি কোম্পানির আত্মীয়-স্বজন ব্যবহার করত। এসব গাড়ি জব্দ করা হয়েছে। গাড়িগুলো দরপত্রের মাধ্যমে নিলামে তুলে বিক্রির প্রক্রিয়াকরণে কাজ করছে বিপিসি। এছাড়া মোংলা ও রংপুরের সেলস সেন্টার বন্ধ করা হচ্ছে।

সার্বিক প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসির) চেয়ারম্যান মো. আবু বকর ছিদ্দীক বণিক বার্তাকে জানান, এসএওসিএলের সঙ্গে বিপিসির হিসাবের অনেক গরমিল পাওয়া গেছে। বিভিন্ন সময়ে কোনো হিসাব ছাড়াই টাকা লেনদেন হয়েছে। দুদক এরই মধ্যে বিভিন্ন মামলার তদন্ত করছে। তাছাড়া কোম্পানিটির সাবেক মহাব্যবস্থাপক মারা যাওয়ায় পদটি এখনো খালি রয়েছে। আমরা লোকবল নিয়োগের কাজ করছি। বিপিসির বকেয়া যেগুলো ছিল. সেগুলো আদায়ে কাজ করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির সম্পদ যা আছে, তাতে পাওনা পরিশোধ হয়ে যাবে। সীতাকুণ্ডের জমি বিক্রির জন্য চেষ্টা চালানো হচ্ছে। আশা করছি সমস্যা হবে না।

তিনি আরো জানান, কোম্পানিটির কাছে যে টাকা পাওনা আছে, সেগুলো তাদের পরিশোধ করতে হবে। যদি কোনো কারণে এসএওসিএল টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হয়, তখনই আমরা কোম্পানিতে আমাদের অংশীদারিত্ব বাড়ানোর জন্য শেয়ার কিনে নেয়ার বিষয়ে পদক্ষেপ নেব।