সংকোচনের মুখোমুখি হয়েছে চীনের আমদানি ও রফতানি বাণিজ্য। গত মাসে দেশটির আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পতনের হার অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাসের চেয়েও বেশি। বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চাহিদায় ধীরগতি, উৎপাদন খাতে কভিডজনিত প্রতিবন্ধকতা এবং আবাসন খাতে দীর্ঘস্থায়ী মন্দা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। খবর রয়টার্স।

গতকাল প্রকাশিত শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুসারে, নভেম্বরে চীনের রফতানি আয় ২৯ হাজার ৬১০ কোটি ডলারে নেমেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ৮ দশমিক ৭ শতাংশ কম। রফতানিতে এ পতন অক্টোবরের দশমিক ৩ শতাংশের চেয়ে অনেক বেশি। বিশ্লেষকরা ৩ দশমিক ৫ শতাংশ পতনের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। গত মাসে রফতানি আয়ের পরিমাণ ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা ৩ দশমিক ৫ শতাংশ সংকোচনের আশঙ্কা করেছিলেন।

গত আগস্ট থেকেই দেশটির রফতানি ধীর হয়ে পড়েছে। কারণ ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার বিশ্ব অর্থনীতিকে মন্দার দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। আগামীতে রফতানি আরো সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের জ্যেষ্ঠ চীনা অর্থনীতিবিদ জুলিয়ান ইভান্স-প্রিচার্ড একটি নোটে বলেন, কভিডজনিত বিধিনিষেধ শিথিল করার কারণে চীনা পণ্যের রফতানি সীমিত বাড়বে। এতে ক্রয়াদেশ অনুযায়ী পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর বেগ পেতে হবে না। তবে মহামারী যুগের চাহিদার পরিবর্তন এবং আসন্ন বৈশ্বিক মন্দার কারণে চীনা পণ্যের চাহিদায় বড় পতন হবে।

গত মাসে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন কেন্দ্র জেংজো ও গুয়াংজুসহ অনেক চীনা শহরে কভিডজনিত বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। নভেম্বরের পরিসংখ্যানে মূলত এ পদক্ষেপের প্রভাবটি প্রতিফলিত হয়েছে। অ্যাপলের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ফক্সকন জানিয়েছে, নভেম্বরে প্রতিষ্ঠানটির আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ৪ শতাংশ কমে গিয়েছে। কারণ কভিডজনিত বিধিনিষেধের কারণে জেংজোতে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম আইফোন কারখানার উৎপাদন বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে চীনা পণ্যের চাহিদায় পতনের কারণে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের ভাড়াও কমেছে। সাংহাই শিপিং এক্সচেঞ্জ অনুসারে, নভেম্বরে আগের মাসের তুলনায় চীনা বন্দর থেকে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলে পণ্য পরিবহনের সূচক ২১ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে।

দেশটির দীর্ঘায়িত জিরো কভিড নীতি আমদানিকারকদেরও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কারণ লকডাউনের মতো পদক্ষেপ দেশটির অভ্যন্তরীণ চাহিদায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। নভেম্বরে দেশটির আমদানি ১০ দশমিক ৬ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। অক্টোবরে বছরওয়ারি আমদানি কমার হার ছিল দশমিক ৭ শতাংশ। এ হারও বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস ৬ শতাংশ সংকোচনের চেয়ে অনেক বেশি। এ পতনের হার ২০২০ সালের মে মাসের পর সর্বোচ্চ।

আমদানি-রফতানিতে পতনের কারণে দেশটির বাণিজ্য উদ্বৃত্তের পরিমাণও কমে এসেছে। গত মাসে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ৬ হাজার ৯৮৪ কোটি ডলারে নেমেছে। যেখানে অক্টোবরে রফতানি ও আমদানি বাণিজ্যের এ ব্যবধানের পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৫১৫ কোটি ডলার। গত মাসের বাণিজ্য উদ্বৃত্তের পরিমাণ গত এপ্রিলের পর সর্বনিম্ন। বিশ্লেষকরা যা ৭ হাজার ৮১০ কোটি ডলারে নামার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।

এদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে গত কয়েক মাসে চীনা সরকার নীতি সহায়তার ঘোষণ দিয়েছে। এগুলোর মধ্যে ব্যাংকগুলোর নগদ অর্থ রিজার্ভ রাখার পরিমাণ কমিয়ে আনা এবং রিয়েল এস্টেট খাতকে উদ্ধারের জন্য অর্থায়নের বাধা শিথিল করা অন্যতম। তবে এ ব্যবস্থাগুলো অর্থনৈতিক কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে যথেষ্ট কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ বেইজিং এখনো পুরোপুরি জিরো কভিড নীতি থেকে সরে আসেনি।

জুলিয়ান ইভান্স-প্রিচার্ড বলেন, জিরো কভিড নীতি থেকে সরে আসা এবং আবাসন খাতে সহায়তার মতো নীতিগুলো অভ্যন্তরীণ চাহিদা পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে। তবে চীনা অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে আরো বেশি পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। তাছাড়া বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার ঝুঁকিতে চীনা পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় দেশটির রফতানিও ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছে।