বিশ্ব অর্থনীতির কাঠামোকে বদলে দিয়েছে ছয় মাস ধরে চলা মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ, চীনের জ্বালানি তেল ব্যবহার কমিয়ে দেয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে উত্তোলন বাড়ানোর উদ্যোগসহ সব মিলিয়ে জ্বালানির বাজারে তৈরি হয়েছে নতুন বাস্তবতা। যুদ্ধ শেষ হলেও এসব পরিবর্তনের কিছু দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। খবর সিএনএন।

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ

ইরান যুদ্ধের আগে বিশ্বের যেকোনো দেশের পতাকাবাহী জাহাজ নির্বিঘ্নে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারত। মধ্যপ্রাচ্য থেকে পণ্য আনা-নেয়ার অন্যতম প্রধান পথ এটি। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ প্রতিদিন সরু জলপথটি দিয়ে পরিবহন করা হয়।

কিন্তু ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর পরিস্থিতি বদলে যায়। হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয় ইরান। পারস্য উপসাগরে প্রবেশ বা সেখান থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করা জাহাজেও হামলা চালায় দেশটি।

ফলে কার্যত বন্ধ হয়ে যায় গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি। বাধাগ্রস্ত হয় বিশ্ববাজারের দৈনিক প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেলের সরবরাহ। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দেয়।

মে মাসে কৌশল পরিবর্তন করে ইরান। পুরো প্রণালি বন্ধ রাখার বদলে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ শুরু করে। এজন্য ‘পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষ’ গঠন করে দেশটি। হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে ওই কর্তৃপক্ষের কাছে নিবন্ধন করতে বলা হয়। নির্ধারিত নৌপথ ব্যবহার ও পারাপারের জন্য টোল দেয়ার নিয়মও চালু করা হয়।

জুনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর ৬০ দিনের জন্য টোল নেয়া বন্ধ রাখতে সম্মত হয় ইরান। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষের কাছে নিবন্ধন না করা জাহাজে হামলা চালানো অব্যাহত রাখে দেশটি।

পরে ওই সমঝোতা কার্যত ভেঙে গেলে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে রাতের বেলা চলাচলকারী ‘ডার্ক ট্রানজিট’ জাহাজের জন্য সামরিক সহায়তা ও নিরাপত্তা দেয়ার উদ্যোগ নেয়। এর মাধ্যমে পারস্য উপসাগর থেকে তেল রফতানি বাড়ানো ও ইরানের ড্রোন হামলা এড়ানোর চেষ্টা করা হয়।

বেইর্ডের বিনিয়োগ কৌশলবিদ রস মে-ফিল্ড বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোকে এখন নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি এত দিন শুধু সম্ভাব্য সংকট হিসেবে দেখা হতো। যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে, এটি বাস্তবে কার্যকর একটি কৌশলও হতে পারে।’

যুদ্ধ শেষে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে জাহাজ চলাচলের জন্য ইরান টোল নেয়ার সুযোগ পেতে পারে বলে মনে করছেন জ্বালানি বাজার বিশ্লেষকরা। এতে আন্তর্জাতিক জলপথ ব্যবহারের ক্ষেত্রে নতুন নজির তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

তবে জেপি মরগানের পণ্যবাজার বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান নাতাশা কানেভার মতে, এমন ব্যবস্থা একেবারে নতুন নয়। বিভিন্ন দেশের প্রণালিতে নিরাপত্তা, নৌ-চলাচল ব্যবস্থাপনা, জরুরি সহায়তা ও পরিবেশ সুরক্ষার মতো সেবার জন্য ফি নেয়ার নজির রয়েছে।

তার মতে, তুরস্কের মতো ইরানও ফি নেয়ার ব্যবস্থা চালু করলে প্রতি ব্যারেল তেলের দামে প্রায় ১ ডলার যোগ হতে পারে। একটি বড় অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজের একবার যাওয়া-আসায় প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে।

জ্বালানির বাজারে চীনের প্রভাব আরো স্পষ্ট

ইরান যুদ্ধের আরেকটি বড় শিক্ষা হলো বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারে চীনের প্রভাব কতটা গভীর। চীন নিজে বড় তেল উত্তোলক নয়। কিন্তু যুদ্ধের সময় দেশটি দেখিয়েছে, তেলের চাহিদা খুব দ্রুত কমানো বা বাড়ানোর ক্ষমতা এর রয়েছে।

যুদ্ধের আগে চীন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল মজুদ করেছিল। সে মজুদ ব্যবহার করায় যুদ্ধ চলাকালে দেশটিকে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল কম অপরিশোধিত তেল আমদানি করতে হয়েছে। তবে মজুদ কমে গেলে চীনকে ফের তেল কিনতে হবে। ফলে ভবিষ্যতে দেশটির তেলের চাহিদা বাড়তে পারে। কিন্তু জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

এর বড় উদাহরণ বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি বা ইভি। চীনের পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মে দিবসের পাঁচদিনের ছুটিতে দেশটির মহাসড়কগুলোয় ইভি চার্জিংয়ের পরিমাণ ৫৫ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। তেল ও গ্যাসচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিবর্তে দ্রুত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাওয়ার সক্ষমতাও দেখিয়েছে চীন। এতে বড় ধরনের তেল সরবরাহ সংকটের মধ্যেও দেশটি জ্বালানি ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পেরেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে তেল উত্তোলন

ইরান যুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের উত্তোলন বাড়ানো। তেলের সরবরাহ সংকট মোকাবেলায় নতুন উৎস অনুসন্ধান ও বিকল্প জ্বালানি উন্নয়নের গতি বেড়েছে।

ব্রাজিল প্রতিদিন প্রায় আট লাখ ব্যারেল তেল উত্তোলন বাড়িয়েছে। গায়ানা বাড়িয়েছে তিন লাখ ব্যারেল। কানাডা দুই লাখ এবং নরওয়ে ১ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল উত্তোলন বাড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রও তেল উত্তোলন বাড়িয়েছে। যুদ্ধের শুরুতে সাময়িক মূল্যবৃদ্ধির কারণে অতিরিক্ত উৎপাদন করে পরে লোকসানে পড়ার আশঙ্কায় দেশটি উত্তোলন বাড়াতে কিছুটা সতর্ক ছিল। কিন্তু এখন গত বছরের একই সময়ের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন প্রায় নয় লাখ ব্যারেল বেশি তেল উত্তোলন করছে।

হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তোলন কিছুটা কমতে পারে। তবে জেপি মরগানের পূর্বাভাস অনুযায়ী, তা বর্তমান মাত্রার কাছাকাছি থাকবে।

বিকল্প পথে তেল পরিবহনের চেষ্টা

হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি তেল উত্তোলক দেশগুলোও পরিবহন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনছে। সৌদি আরব হরমুজ এড়িয়ে পণ্য ও তেল পরিবহনে বড় ট্রাকের বহর ব্যবহার করছে। লোহিত সাগরের দিকে স্থলপথে তেল ও পণ্য পাঠাচ্ছে দেশটি। ইরাকও ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত নতুন পাইপলাইন নির্মাণের বিষয়ে শেভরনের সঙ্গে আলোচনা করছে। এর লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালির বিকল্প পথ তৈরি করা।

এদিকে তেল উত্তোলনকারী দেশগুলোর জোট ওপেকও নতুন চাপে পড়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এপ্রিলে ওপেক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এরপর জোটটির দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল উত্তোলক ইরাকও সদস্যপদ নিয়ে নতুন করে ভাবছে। যুদ্ধ শেষে প্রতিদিন ৫০ লাখ ব্যারেল তেল উত্তোলনের অনুমতি চায় ইরাক। দীর্ঘমেয়াদে দেশটির লক্ষ্য ৭০ লাখ ব্যারেলে নেয়া।