বিশ্ববাজারে নভেম্বরে চালের দাম বেড়েছে ৭-৮ শতাংশ। এর মধ্য দিয়ে ১৫ বছরের ইতিহাসে খাদ্যপণ্যটির দাম সর্বোচ্চে উঠেছে। উচ্চ চাহিদা ও সীমিত সরবরাহ এ মূল্যবৃদ্ধিতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। ব্যবসায়ী ও রফতানিকারকরা বলছেন, চাল উৎপাদন মৌসুম শেষ হওয়াও মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণগুলোর একটি। খবর দ্য হিন্দু বিজনেস পোস্ট।
বাণিজ্য বিশ্লেষক এস চন্দ্রশেকারন বলেছেন, ‘বিশ্ববাজারে চাল সরবরাহ কমেছে। কিন্ত চাহিদা বেড়েছে। ভারত সাদা ও ভাঙা চাল রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছে। ফলে বিশ্ববাজারে অন্তত ১ কোটি ৬০ লাখ টন চালের ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যা পুরো বছরের চাল বাণিজ্যের এক-তৃতীয়াংশ।’
কয়েক সপ্তাহ ধরে আধা সেদ্ধ চাল রফতানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে উল্লেখ করে চন্দ্রশেখরন বলেন, ‘এমনকি বাসমতি চাল রফতানিও হঠাৎ বেড়েছে।’
ইন্টারন্যাশনাল গ্রেইন কাউন্সিলের (আইজিসি) তথ্যমতে, ২০২৩ সালে থাইল্যান্ডের চালের দাম ৩৯ ও ভিয়েতনামের ৪৪ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে ভারতীয় সেদ্ধ চালের দাম বেড়েছে ৪০ শতাংশ। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজার নিয়ন্ত্রণে নয়াদিল্লি নন-বাসমতি সাদা চাল রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে। তা সত্ত্বেও দেশটিতে প্রধান এ খাদ্যপণ্যের দাম অব্যাহত বাড়ছে।
নয়াদিল্লিভিত্তিক রফতানিকারক রাজেশ পাহাড়িয়া জৈন জানিয়েছেন, ‘ভারতে চাল সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও দাম বাড়তির দিকে। ফ্রি অন বোর্ড (এফওবি) চুক্তিতে ভারতীয় সেদ্ধ চালের দাম উঠেছে টনপ্রতি ৫২৫ ডলারে। এর সঙ্গে ২০ শতাংশ অতিরিক্ত রফতানি শুল্কও দিতে হচ্ছে।
জৈন জানান, রফতানিকারকদের জন্য প্রতি টন ২৫ শতাংশ ভাঙা আধা সেদ্ধ চাল ২৯ হাজার রুপি এবং ৫ শতাংশ ভাঙা চাল বিক্রি হচ্ছে টনপ্রতি ৩১ হাজার রুপিতে।
থাই রাইস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (টিআরইএ) মতে, শতভাগ আধা সেদ্ধ থাই চাল বিক্রি হচ্ছে টনপ্রতি ৬৫০ ডলারে। আর ৫ শতাংশ ভাঙা থাই সাদা চালও টনপ্রতি ৬৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। একই সময়ে ভিয়েতনামি ৫ শতাংশ ভাঙা সাদা চাল লেনদেন হচ্ছে ৬৬৩-৬৬৭ ডলারে এবং একই জাতের পাকিস্তানি চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৯৩-৫৯৭ ডলারে।
ভিয়েতনামের ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন জানিয়েছে, বিক্রি কম হওয়া সত্ত্বেও ভিয়েতনামি চালের দাম ২০০৮ সালের পরে এ-যাবৎকালের সর্বোচ্চে উঠেছে। সামগ্রিক সরবরাহস্বল্পতার কারণে মূল্য বাড়ছে।
এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় আইজিসি ২০২৩-২৪ মৌসুমের বৈশ্বিক বাণিজ্য পূর্বাভাস সংশোধন করে ৪ শতাংশ কমিয়ে এনেছে। তবে ডিসেম্বরে বৈশ্বিক কৃষি সরবরাহ ও চাহিদা পূর্বাভাস (ডব্লিউএএসডিই) প্রতিবেদনে মার্কিন কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ) বলছে, ২০২৩-২৪ মৌসুমে বৈশ্বিক চাল সরবরাহ সামান্য বাড়বে। সীমিত বাণিজ্য, ব্যবহার কমা এবং উচ্চ মজুদ এক্ষেত্রে প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে। থাইল্যান্ডে উৎপাদন বাড়ায় চলতি বিপণন মৌসুমে সরবরাহ মাত্র দুই লাখ টন বেড়ে দাঁড়াতে পারে ৬৯ কোটি ২৮ লাখ টনে। দেশটিতে আগের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি পানি সরবরাহ উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ভারতের কৃষিপণ্য রফতানিকারক সমিতির (এসিইএ) সভাপতি এম মদন প্রকাশ বলেন, ‘আমরা আশা করছি, শ্রীলংকা থেকে পোন্নি সেদ্ধ চালের চাহিদা বাড়বে। বর্তমানে এ জাতের চাল টনপ্রতি ৬২৫-৬৫০ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। আমাদের সেদ্ধ চালের কোনো ঘাটতি নেই। আফ্রিকায়ও এ-জাতীয় চালের চাহিদা বেশি।’
সাদা চাল রফতানি নিষিদ্ধ, আধা সেদ্ধ চালের ওপর ২০ শতাংশ রফতানি শুল্ক আরোপ এবং বাসমতি চালের ন্যূনতম রফতানি মূল্য টনপ্রতি ৯৫০ ডলার করেছে ভারত। এতে ২০২৩ সালে বিশ্ববাজারে চালের দাম ব্যাপক বেড়েছে।
এল নিনোর প্রভাব, অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি ও বন্যার মতো সমস্যার কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় খাদ্যশস্যের ফলন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ২০২৪ সালের এপ্রিলে ভারতে জাতীয় নির্বাচনের আগে খাদ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সতর্ক হয়েছে নরেন্দ্র মোদি সরকার। তাই চাল, চিনির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য ও ভোগ্যপণ্য রফতানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে দেশটি। ভারত এসব পণ্যের শীর্ষস্থানীয় রফতানিকারক হওয়ায় বিশ্ববাজারে সরবরাহ ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।










