আবাসন খাতসংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে বড় আকারের ঋণসহায়তা দিতে চায় চীনের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকগুলো। অর্থনীতিতে গতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধি চাঙ্গায় ৪৬ হাজার কোটি ডলার ঋণসহায়তার জন্য প্রস্তুত রয়েছে বলে জানায় তারা।

নিক্কেই এশিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নগদ অর্থ সংকটে জর্জরিত আবাসন কোম্পানিগুলোকে ৩ ট্রিলিয়ন ইউয়ানের বেশি ঋণ দেবে চীনা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। ঋণভারে জর্জরিত কোম্পানিগুলোয় গতিশীলতা এনে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনতে চায় তারা। চীনের বৃহত্তম রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়না এক ঘোষণায় জানায়, কান্ট্রি গার্ডেন হোল্ডিংসসহ ১২টি শীর্ষ ঋণগ্রহীতাকে ৬৫ হাজার ৫০০ কোটি ইউয়ান ঋণ দেবে তারা।

চীনের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া এজেন্সির আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় শহর শেনঝেনে ৩১৫টি প্রকল্প চালু হচ্ছে। এতে বিনিয়োগ হচ্ছে ৮৭ হাজার ৯০০ কোটি ইউয়ান বা ১২ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। সম্প্রতি এশিয়ার সিলিকন ভ্যালি হিসেবে পরিচিত শহরে আয়োজিত এক বিনিয়োগ সম্মেলন থেকে এ ঘোষণা দেয়া হয়।

চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে প্রবৃদ্ধির চাকা সচল করতে অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে চীন। চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে অবকাঠামো খাতে ১ ট্রিলিয়ন ইউয়ান অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিকল্পনা নীতিনির্ধারকদের। ২০০৮-০৯-এর অর্থনৈতিক সংকটের পর অবকাঠামো খাতে এ রকম বড় অংকের বিনিয়োগ বৃদ্ধি দেখেনি বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির দেশটি।

২০২০ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকের পর চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে শ্লথগতির প্রবৃদ্ধি দেখেছে চীন। অল্পের জন্য সংকোচন এড়িয়েছে চীন। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দেশটির অর্থনীতি সম্প্রসারণ হয়েছে দশমিক ৪ শতাংশ। সাংহাই, কুনশানসহ চীনে কয়েক মাসের লকডাউনে দেশটির শিল্পোৎপাদন ও ভোক্তা ব্যয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার প্রভাব পড়েছে সরবরাহ চেইন ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। বৈশ্বিক অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে চীনের অর্থনীতির চাঙ্গা হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মানছেন বিশেষজ্ঞরা।

সাম্প্রতিক এক জরিপের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, লকডাউনের প্রভাবে জুনে চীনব্যাপী বেকারত্ব হার ছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। গত মে মাসের ৫ দশমিক ৯ শতাংশের চেয়ে অবশ্য কিছুটা উন্নত হয়েছে। অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে চীনের বিভিন্ন প্রাদেশিক সরকার প্রথমার্ধে রেকর্ড হারে বিশেষ বন্ড এসপিবি মুদ্রণ করেছে। এদিকে গত জুনে ৮০ হাজার কোটি ইউয়ান ব্যাংকঋণ অনুমোদন করেছে বেইজিং। ২০০৮-০৯-এর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের সময় অবকাঠামো খাতে ৪ ট্রিলিয়ন ইউয়ান বিনিয়োগ করেছিল চীন। কিন্তু বর্তমানে সে রকম লাভজনক অবকাঠামো প্রকল্প হাতে নেই বেইজিংয়ের। এমনটা মনে করছেন সাংহাই জাম্বু কনসাল্টিংয়ের চেয়ারম্যান ঝ্যাং লিয়াও।

তবে কিছু ডিজিটাল অবকাঠামো যেমন—ফাইভজি বেজ স্টেশন ও ডাটা সেন্টারের মতো প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদে চীনের উপকারে আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া পানি সংরক্ষণাগার এবং বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পও রয়েছে নতুন অবকাঠামো প্রকল্পের আওতায়। নগরে গ্যাস সরবরাহ প্রকল্পগুলো পুরনো ধাঁচের পাইপলাইন নেটওয়ার্কের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ৪৮টি বিনিয়োগ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে দ্য ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রিফর্ম কমিশন (এনডিআরসি)। এতে ব্যয় হয়েছে ৬৫ হাজার ৪২০ কোটি ইউয়ান। ২০২১ সালের পুরো বিনিয়োগের ৮০ শতাংশেরও বেশি।

প্রথমার্ধে বেশ ঝক্কিঝামেলার মধ্য দিয়ে গিয়েছে চীনের অর্থনীতি। দ্বিতীয়ার্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা হাতে নেয়া হলেও সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। বিশ্বের শীর্ষ এ শিল্পোৎপাদন হাবটির বড় সমস্যা হচ্ছে এর জিরো কভিড পলিসি। দ্বিতীয়ার্ধেও স্থানীয় ব্যবসা, কর্মসংস্থান ও ভোক্তা ব্যয়ে নেতিবাচক প্রভাব রাখতে পারে এ নীতি। কিন্তু প্রবৃদ্ধি চাঙ্গায় পুরনো পথেই হাঁটছে চীন। বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প হাতে নেয়ার মাধ্যমে অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে চাচ্ছে তারা।