চা শিল্পের জন্য ভারত বিশ্বজুড়ে প্রসিদ্ধ। দেশটির প্রধান চা উৎপাদনকারী রাজ্যগুলোর মধ্যে আসাম শীর্ষস্থানীয়। দেশটিতে প্রতি বছর মোট উৎপাদিত চায়ের অর্ধেক রাজ্যটি একাই উৎপাদন করে। তবে চলতি বছরে পুরো ভারতের চা শিল্পে ধস নেমেছে। উৎপাদনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমছে রফতানি। একই অবস্থা আসামের চা বাগানগুলোতেও। খাতসংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, চলতি বছর আসামে চা উৎপাদন রেকর্ড পরিমাণ কমে যেতে পারে। এরই মধ্যে রাজ্যটিতে পানীয় পণ্যটির উৎপাদন ৪৮ শতাংশের বেশি কমেছে। একদিকে নভেল করোনাভাইরাসের মহামারী ও টানা লকডাউন, অন্যদিকে আকস্মিক বন্যায় আসামের চা উৎপাদন খাতকে এ চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। খবর গুয়াহাটি প্লাস ও বিজনেস রেকর্ডার।

টি অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়ার দেয়া সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত পাঁচ মাসে ভারতের আসাম রাজ্যে চা উৎপাদন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৮ দশমিব ৩২ শতাংশ কমেছে। বছরের এ সময়টাকে রাজ্যটির চায়ের শীর্ষ উৎপাদনকাল ধরা হয়। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের একই সময়ে রাজ্যটির বাগানগুলো থেকে সব মিলিয়ে ২২ কোটি ৪০ হাজার কেজি চা সংগ্রহ করা হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নানা ধরনের সংকটের কারণে এ বছর পানীয় পণ্যটির উৎপাদন ব্যাপক হারে কমেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত আসামে মোট ১১ কোটি ৩৭ লাখ ২০ হাজার কেজি চা উৎপাদন হয়েছে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রাজ্যটিতে পানীয় পণ্যটির উৎপাদন কমেছে ১০ কোটি ৬৩ লাখ ২০ হাজার কেজি, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক।

ভারতের টি বোর্ডের এক প্রেস নোটে বলা হয়েছে, নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে টানা লকডাইনের পথ বেছে নিয়েছে ভারত। দেশটির চা বাগানগুলোকেও এর আওতাভুক্ত করা হয়েছে। একটি নির্দিষ্ট বিরতিতে চা পাতা সংগ্রহ করতে হয়। লকডাউনে শ্রমিকের অভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে পাতাগুলো অতিবাদামি হয়ে সংগ্রহের অনুপযুক্ত হয়ে উঠছে, কমছে উৎপাদন। এর ওপর বার্ষিক বন্যার কবলে পড়েছে আসামের বাগানগুলো। সব মিলিয়ে এ বছর রাজ্যটিতে চা উৎপাদনে ধস নামতে পারে।

এর আগে টি অর্ব অব ইন্ডিয়ার মাসভিত্তিক ফসল উৎপাদনবিষয়ক প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করে চলতি বছরে আসামের আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে একটি প্রাক্কলন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল আসামের নর্থ ইস্টার্ন টি অ্যাসোসিয়েশন (এনইটিএ)। এতে বলা হয়েছিল, লকডাউনের জেরে ২০২০ সালে রাজ্যটির চা শিল্পের আর্থিক ক্ষতি ছুঁতে পারে ১ হাজার ২১৮ রুপি।

অবশ্য শুধু আসামই নয়, পুরো ভারতের চা শিল্পের অবস্থা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে এ বছর। যদিও মাহমারীর শুরুর দিকে ভারতের চা এস্টেটের স্বত্বাধিকাররা জানিয়েছিলেন, দেশটির টি এস্টেটগুলোতে নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। ফলে প্রথম দিকে দেশটির চা বাগানগুলো খোলা রাখা হয়েছিল। তবে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক লকডাউন ঘোষণার পর কর্মীদের নিরাপত্তাবিষয়ক সতর্কতাস্বরূপ এস্টেটগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। এর আওতায় পড়ে ভারতের ১ হাজার ৪২২টি নিবন্ধিত চা এস্টেট। এছাড়া আড়াই লাখের বেশি মাঝারি ও ক্ষুদ্র চা উৎপাদনকারীও এ লকডাউনের আওতায় পড়ে। এ সময় দেশটি থেকে পানীয় পণ্যটির সরবারহ একেবারে বন্ধ হয়ে পড়ে।

ভারতের চা কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রাথমিকভাবে স্থানীয় টি বোর্ড জানিয়েছিল, লকডাউনের জেরে দেশটির বাগানগুলোতে চা উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় ১০ কোটি কেজি কমে যেতে পারে, আর্থিক হিসাবে যার পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ২ হাজার কোটি রুপির বেশি। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে আসাম ও পাশ্চিমবঙ্গের চা উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো। কারণ ভারতে উৎপাদিত মোট চায়ের সিংহভাগ উৎপাদন হয় এ দুই রাজ্যে। বার্ষিক হিসাবে ভারতে উৎপাদিত মোট চায়ের ৫০ শতাংশের মতো উৎপাদন হয় শুধু আসামে। গত বছর দেশটির উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যটিতে মোট ১৩৯ কোটি কেজি চা উৎপাদন হয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশটির চা শিল্পের ক্ষতি টি বোর্ড অব ইন্ডিয়ার আগের প্রাক্কলনের তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।