জার্মানিতে একসময় ডে-কেয়ার বা ‘কিতা’য় শিশুদের জন্য আসন পাওয়া ছিল সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয়। বছরের পর বছর অপেক্ষমাণ তালিকায় নাম থাকত, তবু জায়গা মিলত না। কিন্তু এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো। দেশটিতে পড়তি জন্মহার ও বাড়ি ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় বড় শহরগুলোয় ডে-কেয়ার কেন্দ্রে শিশু পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। খবর এফটি।
বিশেষ করে রাজধানী বার্লিনে এ পরিবর্তন একদম স্পষ্ট। একসময় এখানকার কিতায় অপেক্ষমাণ তালিকা দীর্ঘ ছিল, এখন সেখানে অনেক আসন ফাঁকা পড়ে থাকছে। অনেক পরিবার খরচ সামলাতে না পেরে শহর ছেড়ে অন্য এলাকায় চলে যাচ্ছে। ফলে শিশুর সংখ্যাও কমে যাচ্ছে।
জার্মানির সরকারি সহায়তাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ‘কিন্ডারগার্টেন সিটি’ বার্লিনে ৫৮টি ডে-কেয়ার সেন্টার পরিচালনা করে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্লাউডিয়া ফ্রাইস্ট্যুলার বলেন, ‘শিশুর সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে গেছে। আগের তুলনায় এখন মোট শিশুর সংখ্যাই কম। সাধারণত আমাদের কেন্দ্রে সাত হাজারের বেশি শিশু থাকত। কিন্তু ২০২৫ সালে তা নেমে আসে ছয় হাজারের নিচে।’
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে জার্মানিতে নারীপ্রতি গড় সন্তান জন্মের হার নেমে আসে ১ দশমিক ৩৫-এ, যা আগের বছরের তুলনায় কম। শুধু বার্লিনেই গত দুই বছরে ৯৭টি ডে-কেয়ার কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে ফ্রাংকফুর্ট ও মুনস্টারের কিছু এলাকায়ও।
ফেডারেল ইনস্টিটিউট ফর পপুলেশন রিসার্চের অধ্যাপক মার্টিন বুজার্ড বলেন, ‘কম জন্মহার দেশের ভবিষ্যতের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর। বিভিন্ন সংকট এখন পারিবারিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা। মানুষ যখন নানা সংকটে থাকে, তারা তখন সন্তান নেয়ার সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসে।’
কভিড-মহামারী, ইউক্রেন যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মানুষের মনে ভয় তৈরি করেছে বলে তিনি মনে করেন।
জার্মানিতে এখনো তিন বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য প্রায় তিন লাখ ডে-কেয়ার আসনের ঘাটতি রয়েছে। এ সংকটের কারণেই অনেক নারী খণ্ডকালীন কাজ করতে বাধ্য হন বলে মনে করা হয়। তবে বড় শহরগুলোয় এখন উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে, সেখানে ডে-কেয়ার সেন্টারে আসন খালি থাকছে।
বার্লিনে থাকেন ইতালীয় নাগরিক মারিয়া কিয়ারা ফেরান্তে। তিনি ভেবেছিলেন ডে-কেয়ার পাওয়া খুব কঠিন হবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ডে-কেয়ার পাওয়া আশ্চর্যজনকভাবে সহজ ছিল। ১০টির মতো কিতায় আবেদন করেছিলেন, সাত-আটটি থেকে ইতিবাচক উত্তর পান বলে জানান মারিয়া। এমনকি সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করায় কয়েকটি কেন্দ্র আবার যোগাযোগ করে।
এ পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেক ডে-কেয়ার কেন্দ্রের কর্তৃপক্ষ নতুনভাবে অভিভাবকদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে অভিবাসী পরিবারদের দিকে বেশি ঝুঁকছে প্রতিষ্ঠানগুলো। বিদেশী ভাষায় বিজ্ঞাপন দেয়া হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার বাড়ানো হয়েছে। ফ্রোবেল নামের একটি ডে-কেয়ার গ্রুপ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ইউক্রেনীয় ও আরবি ভাষায় বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। পাশাপাশি বিদেশী অভিভাবকদের জন্য জার্মান প্রশাসনিক জটিলতা বিষয়ে সহায়তাও দেয়া হচ্ছে।
তবে বাড়ি ভাড়ার চাপ এখনো বড় সমস্যা বলে জানান ডে-কেয়ার কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক পাউলিনা ভোজনিকি। তিনি বলেন, ‘অনেক পরিবার বার্লিন ছেড়ে চলে যাচ্ছে। ফলে শিশুদের সংখ্যা কমে গেলে সরকারি অর্থায়নও কমে যায়।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পূর্ব জার্মানিতে এ সংকট আরো তীব্র। পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এ অবস্থায় টিকে থাকতে হলে ডে-কেয়ার কেন্দ্রগুলোকে নতুনভাবে নিজেদের মানিয়ে নিতে হবে।








