বাংলাদেশে সরবরাহ ব্যয় বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে বেশি বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য, শিল্প ও বস্ত্র এবং পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, ‘দেশে সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১৬ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিক গড় প্রায় ১০ শতাংশ। পরিবহন, উৎপাদন ও আমদানি-রফতানি ব্যয় কমিয়ে এ ব্যবধান কমাতে হবে।’

গতকাল হংকংয়ে বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের আয়োজনে ‘বাংলাদেশে বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তব্যকালে এসব কথা বলেন মন্ত্রী। এ সময় বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে নীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত, সরবরাহ ব্যয় কমানো, কাস্টমস ব্যবস্থার অটোমেশন ও ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর জোর দেন তিনি।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘তথ্যপ্রযুক্তির কারণে একজন বিনিয়োগকারী এখন বিশ্বের যেকোনো দেশের ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশ সহজেই যাচাই করতে পারেন। ফলে বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে অন্যান্য দেশের সঙ্গে ব্যবসায়িক পরিবেশ, নীতি ও সক্ষমতার তুলনীয় মান তৈরি করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘২০২৯ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সুবিধা ধরে রাখতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করা হচ্ছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে বাংলাদেশের প্রায় ৯৭ শতাংশ পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়েছে। আরো প্রায় ১৩টি দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে।’

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনাও শিগগির শুরু হবে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘এলডিসি উত্তরণের আগেই এ বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর আশা করছে বাংলাদেশ। তা সম্ভব না হলেও অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে বর্তমান বাজার সুবিধা অব্যাহত রাখার উদ্যোগ থাকবে।’

চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে আন্তর্জাতিক অপারেটরদের সম্পৃক্ততা এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি। এসব অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন ও বন্দর ব্যবস্থাপনার ব্যয় কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন মন্ত্রী।

ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঋণপত্র খোলার পর্যায়ে যেতে কয়েকশ দিন পর্যন্ত সময় লাগে। পুরো প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল করা হচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে নতুন একটি প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ ১৪ দিনের মধ্যে ঋণপত্র খোলার পর্যায়ে যেতে পারবে।’

ট্রেড লাইসেন্স ও শেয়ার হস্তান্তরসহ বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রক্রিয়াও ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘এর ফলে উদ্যোক্তাদের সরকারি দপ্তরে সরাসরি উপস্থিতির প্রয়োজন অনেকটাই কমবে।’

কাস্টমস ব্যবস্থার সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অটোমেশনের মাধ্যমে আমদানিকারকদের পণ্য খালাসের সময় ও ব্যয় কমানো হবে। প্রতিষ্ঠিত ও নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় শারীরিক পরিদর্শন কমিয়ে ঝুঁকিভিত্তিক কাস্টমস ব্যবস্থাপনা চালুর উদ্যোগ রয়েছে। আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে কাস্টমসের অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ ও প্রক্রিয়া অনেকটাই শিথিল হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।

বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরিতে নীতির ধারাবাহিকতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত। তাই কোনো নীতি প্রণয়নের পর অল্প সময়ের মধ্যে তা পরিবর্তন করা হলে বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। নীতিতে পরিবর্তন প্রয়োজন হলে তা নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কার্যকর করা উচিত, যাতে বিনিয়োগকারীরা সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় পুরো পরিস্থিতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পান।’

সেমিনারে বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পের কথাও তুলে ধরেন তিনি। বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ বাংলাদেশ ও ভারত করে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে এ খাতে আরো বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়িক পরিবেশের দুর্বলতা কাটিয়ে বাংলাদেশকে বিনিয়োগের জন্য আরো প্রতিযোগিতামূলক করে তোলাই সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এজন্য অবকাঠামো, নীতি, কাস্টমস ও ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ায় ধারাবাহিক সংস্কার করা হচ্ছে।’