বিশ্বজুড়ে বিলাসবহুল পণ্যের বাজারে মন্দা ভাব চলছে। এ পরিস্থিতিতে দামি রত্নখচিত হ্যান্ডব্যাগ বা ভ্যানিটি ব্যাগের দিকে নজর দিচ্ছে বিশ্বের নামিদামি জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানগুলো। কার্টিয়ার, বুলগারি ও বুচ্চেল্লাতির মতো বিখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো এ খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, রত্নখচিত এসব ব্যাগ জুয়েলারি ব্র্যান্ডগুলোকে নিজেদের নকশা ও শৈলী নতুনভাবে তুলে ধরার সুযোগ দিচ্ছে। একই সঙ্গে তুলনামূলক সাশ্রয়ী হওয়ায় নতুন ক্রেতাদের আকৃষ্ট করারও সুযোগ তৈরি করছে।
প্যারিসে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ‘ওত কুত্যুর’ ফ্যাশন উইকে কার্টিয়ারের ফ্ল্যাগশিপ রু দ্য লা পেতে’ শোরুমে এক ডজন বিশেষ ব্যাগ প্রদর্শন করা হয়। প্রতিটি ব্যাগেই বসানো ছিল বহুমূল্য রত্ন। এগুলো কার্টিয়ারের ‘সোয়ার’ সংগ্রহের অংশ। দামি ঘড়ি ও গহনার জন্য পরিচিত হলেও ১৯০৬ সাল থেকেই গহনার পাশাপাশি রত্নখচিত ব্যাগ তৈরি করে আসছে কার্টিয়ার।
আন্তর্জাতিক ফ্যাশন গবেষণা সংস্থা ম্যাককিনসে অ্যান্ড কোম্পানির ‘দ্য স্টেট অব ফ্যাশন ২০২৬’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৮ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে হ্যান্ডব্যাগ বিক্রি বছরে গড়ে ৬ দশমিক ১ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। একই সময়ে গহনার বাজার বাড়তে পারে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। তবে তৈরি পোশাকের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রেতারা ব্যাগ ও গহনাকে ব্যক্তিগত রুচি প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেন। ফলে রিসেল বা পুনর্বিক্রির বাজারেও এসব পণ্যের বেশ চাহিদা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান বেইন অ্যান্ড কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শীর্ষ অবস্থানে থাকা বিলাসবহুল পণ্যের বিক্রি প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। এ পরিস্থিতিতে হ্যান্ডব্যাগ জুয়েলারি ব্র্যান্ডগুলোর জন্য নতুন ক্রেতা তৈরির একটি পথ হয়ে উঠেছে। অতিদামি গহনা সাধারণত নিয়মিত ব্যবহার করা হয় না। কিন্তু ব্যাগ তুলনামূলকভাবে দৈনন্দিন ব্যবহারের একটি পণ্য। ফলে নতুন ক্রেতাদের কাছে পৌঁছতে এটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে।
বার্নস্টাইনের গ্লোবাল হেড অব লাক্সারি গুডস লুকা সোলকা বলেন, ‘হ্যান্ডব্যাগ জুয়েলারি ব্র্যান্ডগুলোকে সাধারণ ক্রেতাদের কাছে আরো সহজে পৌঁছতে সাহায্য করে। এটি নতুন ক্রেতাদের জন্য এক ধরনের প্রবেশপথ। এসব ক্রেতার কেউ কেউ পরে ব্র্যান্ডের দামি গহনা বা ঘড়ি কেনার সিদ্ধান্ত নেন।’
কার্টিয়ারের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা আর্নল্ড কারেজ বলেন, ‘আমাদের ব্যাগগুলো গহনা ও ঘড়ির নান্দনিকতারই অন্য এক বহিঃপ্রকাশ।’ তবে বিলাসপণ্য পরামর্শক সুসানা নিকোলেত্তি সতর্ক করে বলেন, ‘যেসব জুয়েলারি ব্র্যান্ডের নিজস্ব ভাবমূর্তি এখনো শক্তিশালী নয়, তাদের জন্য ব্যাগের মতো নতুন পণ্যে বেশি মনোযোগ দেয়াটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।’
বুলগারি পঞ্চাশের দশক থেকে রত্নখচিত হ্যান্ডব্যাগ তৈরি করছে। ২০২৪ সালে গ্রিক ফ্যাশন ডিজাইনার মেরি ক্যাত্রান্তজুকে চামড়াজাত পণ্য ও আনুষঙ্গিক পণ্যের ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর নিয়োগ দেয় প্রতিষ্ঠানটি। চলতি বছর তারা ‘আইকনস মিনোদিয়ের’ নামে পাঁচটি ক্লাচ ব্যাগের সংগ্রহ বাজারে আনে।
অন্যদিকে ইতালির শতবর্ষী জুয়েলারি ব্র্যান্ড বুচ্চেল্লাতিও পুরনো নকশার ব্যাগ ফিরিয়ে এনেছে। বিশের দশকে লা স্কালা অপেরা হাউজের দর্শকের জন্য স্বর্ণ ও রুপার লকযুক্ত ব্যাগ তৈরি করত প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৪ সালে পুরনো ব্যাগ প্রদর্শনের পর ক্রেতাদের আগ্রহে সে নকশা আবার তৈরি করা হয়। বুচ্চেল্লাতির প্রধান নির্বাহী নিকোলা লাকসিঙ্গার জানান, নতুন সংগ্রহটি বাজারে আসার এক সপ্তাহের মধ্যেই সব বিক্রি হয়ে যায়।
ডিজাইনারদের মতে, ব্যাগের উপরিভাগ বা সারফেস বড় হওয়ায় সেখানে নিখুঁত কারুকাজ ও নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ বেশি। যেমন ভ্যান ক্লিফ অ্যান্ড আরপেলস ত্রিশের দশকে একটি ব্যাগে প্রথম ‘মিস্ট্রি সেট’ প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিল। পরে এ প্রযুক্তি গহনা তৈরিতেও ব্যবহার করা হয়।
ফলে রত্নখচিত হ্যান্ডব্যাগ এখন শুধু ব্যবহারিক পণ্য নয়, অনেক ক্রেতার কাছে সংগ্রহযোগ্য শিল্পকর্ম হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। এ কারণে চাহিদা বাড়লেও ব্র্যান্ডগুলো এসব ব্যাগ সীমিত সংখ্যায় তৈরি করছে।
খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস










