একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধ, অন্যদিকে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা; এ দুই কারণে বিদায়ী বছরে ওয়াশিংটন ও তেহরান থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি কমাতে বাধ্য হয়েছে চীনা আমদানিকারকরা। বিকল্প আমদানি উৎস হিসেবে সৌদি আরবের প্রতি ঝুঁকেছে চীন। গত বছর সৌদি আরব থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি প্রায় ৪৭ শতাংশ বাড়িয়েছে দেশটি। একই সঙ্গে গত বছর চীনের জ্বালানি তেলের বাজারে রাশিয়ার হিস্যাও বেড়েছে। চীনের জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব কাস্টমসের বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। খবর সিনহুয়া ও রয়টার্স।

অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের শীর্ষ ভোক্তা দেশ চীন। জ্বালানি পণ্যটির অভ্যন্তরীণ চাহিদার সিংহভাগ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে দেশটি। চীন বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিকারকও। দেশটির রাজস্ব বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে চীনা আমদানিকারকরা ৬৩ লাখ ৫০ হাজার টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে, যা আগের বছরের প্রায় অর্ধেক। ডিসেম্বরে দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ ছিল।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলমান বাণিজ্যযুদ্ধ চীনের বাজারে অন্যান্য অনেক পণ্যের মতো মার্কিন জ্বালানি তেলের আমদানি সংকুচিত করে ফেলেছে। গত বছর দেশটিতে মার্কিন জ্বালানি তেল আমদানি অর্ধেকে নেমেছে। বাণিজ্যযুদ্ধের লাগাম টানতে চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রথম পর্যায়ের চুক্তিতে পৌঁছেছে ওয়াশিংটন-বেইজিং। এখন চীনের বাজারে মার্কিন জ্বালানি তেলের আমদানি বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।

ইরানের সঙ্গেও চীনের জ্বালানি বাণিজ্য সংকুচিত হয়ে এসেছে। ডিসেম্বরে তেহরানের কাছ থেকে সাকল্যে ৪ লাখ ৫ হাজার টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করেছে বেইজিং। আর গত বছর ইরান থেকে চীনা আমদানিকারকরা সব মিলিয়ে ১ কোটি ৪৭ লাখ ৭০ হাজার টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে, যা আগের বছরের অর্ধেক। তেহরানের ওপর চলমান মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ইরান ও চীনের জ্বালানি বাণিজ্যে লাগাম টেনেছে।

চীনের রাজস্ব বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বিশ্বস্ত মিত্র ভেনিজুয়েলার কাছ থেকে ১ কোটি ১৩ লাখ ৯০ হাজার টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করেছে দেশটি, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কম।

যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, ভেনিজুয়েলার বিকল্প হিসেবে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে সৌদি আরবের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়িয়েছে চীন। দেশটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী বছরে বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানিকারক সৌদি আরব থেকে চীনা আমদানিকারকরা ৮ কোটি ৩৩ লাখ ২০ হাজার টন জ্বালানি তেল আমদানি করেছে। দৈনিক হিসাবে যা দাঁড়ায় ১৬ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল। আগের বছরের তুলনায় এ সময় সৌদি আরব থেকে চীনে জ্বালানি পণ্যটির আমদানি প্রায় ৪৭ শতাংশ বেড়েছে। গত ডিসেম্বরে চীনা আমদানিকারকরা সৌদি আরব থেকে ৬৯ লাখ ৯০ হাজার টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করেছে। এর মধ্য দিয়ে চীনের জ্বালানি তেলের আমদানি বাজারে সবচেয়ে বড় উৎস হিসেবে অবস্থান পোক্ত করেছে সৌদি আরব।

সৌদি আরবের পাশাপাশি গত বছর রাশিয়া থেকেও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি বাড়িয়েছে চীন। দেশটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এ সময় চীনা আমদানিকারকরা রাশিয়া থেকে ৭ কোটি ৭৬ লাখ ৪০ হাজার টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করেছে। দৈনিক হিসাবে এর পরিমাণ ১৫ লাখ ৫৫ হাজার ব্যারেল। এক বছরের ব্যবধানে রাশিয়া থেকে চীনের বাজারে জ্বালানি পণ্যটির আমদানি বেড়েছে প্রায় ৯ শতাংশ। এর মধ্য দিয়ে গত বছর চীনা জ্বালানি তেলের আমদানি বাজারে দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে রাশিয়া।

অল্প সময়ের মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধের লাগাম টানা সম্ভব না হলে এবং ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা না উঠলে চলতি বছর চীনের জ্বালানি তেলের আমদানি বাজারে সৌদি আরব ও রাশিয়ার হিস্যা আরো বাড়তে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।