স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ-পরবর্তী সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় রফতানি পণ্য বহুমুখীকরণের আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা। গতকাল ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘এলডিসি-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রফতানি খাতের প্রস্তুতি’ শীর্ষক সেমিনারে তারা এ আহ্বান জানান।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান। তিনি বলেন, ‘গত পাঁচ দশকে আমাদের রফতানি বাড়লেও রফতানি পণ্যের বৈচিত্র্যকরণে বাংলাদেশ বেশ পিছিয়ে রয়েছে, যেখানে আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলোর অগ্রগতি অনেক বেশি। মুদ্রানীতি ও অর্থবিষয়ক নীতিমালার সমন্বয়, সরকারি সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো, খেলাপি ঋণ হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য পুঁজিবাজারের নির্ভরতা বৃদ্ধির বিষয়গুলো এলডিসি-পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আমাদের মুদ্রানীতির কার্যকারিতা তেমন পরিলক্ষিত হয়নি।’ এমতাবস্থায় পরিস্থিতি বিবেচনায় আরো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারণে আরো সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়ে ড. সেলিম বলেন, ‘বাণিজ্যবিষয়ক লজিস্টিক সেবা প্রদানে বাংলাদেশ বেশ পিছিয়ে রয়েছে, যার উত্তরণ অপরিহার্য। সেই সঙ্গে শিল্প খাতের ভবিষ্যতের প্রয়োজনীয়তা নিরিখে মানব সম্পদের দক্ষতা উন্নয়ন করতে হবে।’
সেমিনারে ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, ‘রফতানিমুখী শিল্পের জন্য স্বল্প সুদে অর্থায়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ে একটি সহায়ক বিনিময় হার নির্ধারণ করতে হবে। এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী সময়ের প্রস্তুতির জন্য আমাদের পর্যাপ্ত সময় নেই। সরকার নীতিসহায়তা দিচ্ছে, তবে বেসরকারি খাত সামনের দিনগুলোতে একটি টেকসই দীর্ঘমেয়াদি নীতিসহায়তা প্রাপ্তির প্রত্যাশা করে।’
২০২৬ সাল পর্যন্ত পোশাক খাতের প্রণোদনা সুবিধা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়ে সেমিনারে বিজিএমইএ পরিচালক আসিফ আশরাফ বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য দেশে বৈদেশিক মুদ্রার একটি সহায়ক এক্সচেঞ্জ রেট থাকা দরকার।’
সোনালী আঁশ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান পাটোয়ারি বলেন, ‘তৈরি পোশাক ছাড়া পাট, চামড়া ও চা প্রভৃতি পণ্যের রফতানি তেমন উল্লেখজনক নয়। কারণ নীতিসহায়তা ও সক্ষমতার অপ্রতুলতা রয়েছে। ব্যবসা পরিচালন ব্যয় হ্রাস করতে না পারলে আমাদের উদ্যোক্তারা সক্ষমতা হারাবে। দীর্ঘমেয়াদি নীতিসহায়তা প্রদানের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের আশ্বাস বাড়ালে দেশী বিনিয়োগ বাড়বে।’
ঢাকা চেম্বারের ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি মালিক তালহা ইসমাইল বারী বলেন, ‘তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়া ও পাদুকা, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ, পাট ও পাটপণ্যের মতো শিল্পগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশকে এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এফএমসিজি, প্লাস্টিক পণ্য, হালকা প্রকৌশল, হালাল পণ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে রফতানি বৃদ্ধিতে মনোযোগী হতে হবে। সম্ভাবনাময় খাতগুলোর বিকাশে ক্রেডিট ইন্স্যুরেন্স, এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড এবং ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল লোন প্রভৃতি থেকে ঋণ প্রাপ্তির বিষয়ে ব্যাংকগুলোর আরো এগিয়ে আসা প্রয়োজন।’
মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে অংশগ্রহণকারীরা জ্বালানিসহ অন্যান্য সেবাপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে বহুজাতিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘হাই এন্ডেড’ খাতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং পণ্য প্রসারে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পণ্য মেলার আয়োজনের প্রস্তাব করেন।










