কভিড-পরবর্তী সময়ে পশ্চিমা বিশ্বে কাজের ধরন আমূল পাল্টে গেছে। অফিসে উপস্থিতির বাধ্যবাধকতা শিথিল হওয়ায় অনেক কর্মীই গোপনে কর্মসপ্তাহ চারদিনে নামিয়ে আনছেন। বিশেষ করে শুক্রবার পরিণত হয়েছে ছুটির দিনে। আনুষ্ঠানিক নীতি না থাকলেও ‘অঘোষিত চারদিনের কর্মসপ্তাহ’ এখন যুক্তরাজ্যে লক্ষণীয় প্রবণতায় রূপ নিচ্ছে। উৎপাদনশীলতা, কর্মীদের লাইফস্টাইল ও নিয়োগকর্তাদের ব্যবস্থাপনাগত উদ্বেগেও এর ছাপ পড়ছে। খবর এফটি।
লন্ডনের কেন্দ্রস্থলের ক্লাইম্বিং জিমে প্রায়ই শুক্রবার বিকালে হাজির হন টম। বিজ্ঞাপন কোম্পানির এ কর্মী এদিন ‘অঘোষিত’ ছুটি উপভোগ করেন। ছদ্মনামে কথা বলা ৩৮ বছর বয়সী টম জানান, শুক্রবার সকালে সাধারণত পোষা প্রাণীর যত্নে সময় দেন। তিনি বলেন, ‘আমার স্ত্রী আর আমি দিনটিকে ডগ ডে বলি। ওইদিন কুকুরটাই সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পায়।’
টমের ধারণা, তার অনেক সহকর্মীই শুক্রবার এভাবে ছুটি কাটান। এটাও স্বীকার করেন সুবিধাটি সবার জন্য সমান নয়। তিনি বলেন, ‘আমি টিমের নেতৃত্ব পর্যায়ের কাজ করি। তাই আমার জন্য ছুটি কাটানো তুলনামূলক সহজ। জুনিয়র কর্মীদের জন্য বিষয়টি নিশ্চয়ই কঠিন।’
বর্তমান লেবার সরকার ও আগের কনজারভেটিভ সরকার উভয় পক্ষই সরকারি সংস্থাগুলোর চারদিনের কর্মসপ্তাহে যাওয়ার সমালোচনা করেছে। কভিড-মহামারীর পর থেকে অল্প হলেও বাড়তে থাকা কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিকভাবে এ নীতি গ্রহণ করেছে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক কর্মীই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই শুক্রবার কাজ করছেন না বা খুব কম কাজ করছেন।
আনুষ্ঠানিকভাবে চারদিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছে, এমন প্রতিষ্ঠানগুলো একাধিক জরিপে উৎপাদনশীলতা ও কর্মীদের মানসিক সুস্থতার উন্নতির কথা উল্লেখ করেছে। স্কটিশ সরকার জানিয়েছে, গত বছর দুটি বিভাগে পরীক্ষামূলকভাবে চারদিনের সপ্তাহ চালুর পর উৎপাদনশীলতা ও কর্মীদের জীবন মান বেড়েছে।
যুক্তরাজ্যের অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিকসের (ওএনএস) গত আগস্টে জানিয়েছিল, ২০১৯ সালের পর থেকে এক লাখেরও বেশি কর্মী চারদিনের কর্মসপ্তাহে কাজ করছেন। চারদিনের সপ্তাহের পক্ষে কাজ করা সংগঠন ‘ফোর ডে উইক ফাউন্ডেশন’-এর হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক ব্রিটিশ নিয়োগকর্তা এ নীতি গ্রহণ করেছে।
গোপনীয়তার কারণে অঘোষিত চারদিনের সপ্তাহে কাজ করা কর্মীদের কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য নেই। তবে অবসর ও খুচরা খাতে বিক্রির তথ্য থেকে শুক্রবার কাজের বিষয়ে তুলনামূলক ঢিলেঢালা মনোভাবের কিছু প্রাথমিক ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। যেমন মহামারীর আগের তুলনায় আউটার লন্ডনে শুক্রবার দুপুরে জিমে উপস্থিতি প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে।
ভোক্তা আচরণ বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান এমআরআই সফটওয়্যারের তথ্য অনুযায়ী, লন্ডনের কেন্দ্রস্থল বাদ দিলে গ্রেটার লন্ডনে শুক্রবার ভোক্তাদের পদচারণা ২০২৩ সাল থেকে বছরে গড়ে ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে বেড়েছে।
কর্মীদের শুক্রবারে অনুপস্থিতি নিয়ে নিয়োগকর্তারা ক্রমেই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছেন বলে জানান মানবসম্পদ আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান পেনিনসুলার প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা কেট পামার। তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে যেসব খাতে উৎপাদনশীলতা পরিমাপ কঠিন, সেখানে ব্যবস্থাপনা দলগুলো বুঝে উঠতে পারছে না এ প্রবণতার প্রতিক্রিয়ায় কী করা উচিত।’
কভিডের সময় স্থায়ীভাবে চারদিনের কর্মসপ্তাহ চালু করে টার্গেট পাবলিশিং। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডেভিড ক্যান বলেন, ‘বাস্তবতা হলো পা সবসময় পুরোপুরি অ্যাক্সিলারেটরে চেপে রাখা যায় না। কাজের সময় কমালে কর্মীরা বেশি অনুগত হয় এবং কাজের গতি বেড়ে যায়।’
এ কৌশলের সমর্থকরা মনে করিয়ে দেন, একসময় পাঁচদিনের কর্মসপ্তাহকেও অস্বাভাবিক বলে মনে হতো। ফোর্ড মোটরে শনিবার কাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের ১০০ বছর পূর্ণ হচ্ছে চলতি বছর। কোম্পানিটির এ উদ্যোগকে দুদিনের সাপ্তাহিক ছুটির সূচনাবিন্দু হিসেবে ধরা হয়।










