প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্য (ওয়াশ) খাতে অতীতের তুলনায় বেশ অগ্রগতি হলেও এখনো কাঙ্ক্ষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে আরো বেশকিছু সময়োপযোগী উদ্যোগ নিতে হবে। জাতিসংঘের শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের অর্ধেকের বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখনো মৌলিক স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়নি। বিদ্যালয়ে হয়তো স্যানিটেশন ব্যবস্থা আছে, তবে সেটি স্বাস্থ্যসম্মত নয় বা ব্যবহারের অনুপযুক্ত। বর্তমানে দেশে সামগ্রিকভাবে স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। এ অবস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি উপেক্ষিত থাকবে, তা মোটেও আশা করা যায় না। বিশেষ করে ছাত্র-ছাত্রীদের স্যানিটেশন সমস্যার সমাধানে সরকার স্কুল কর্তৃপক্ষকে যে নির্দেশনা দিয়েছে, আমরা তার সঠিক বাস্তবায়ন দেখতে চাই। যারা এর বাস্তবায়নে উদাসীনতার পরিচয় দেবেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কেননা এর সঙ্গে শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট সবার স্বাস্থ্যের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ছাত্রীদের জন্য আলাদা স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে পারে। সরকারি নির্দেশনায় শৌচাগারে পর্যাপ্ত সাবান, পানি, অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ রাখার কথা বলা হয়েছে। এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা তা শিক্ষা কর্মকর্তা ও স্কুল কমিটিকে মাঝেমধ্যে সরেজমিনে গিয়ে দেখতে হবে। এ ব্যাপারে আপস করা যাবে না। ছাত্র-ছাত্রীদেরও সচেতন করে তুলতে হবে। স্বাস্থ্য ও মানসম্মত এবং আধুনিক স্যানিটেশন নির্মাণ বা সংস্কারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও পৃথকভাবে পদক্ষেপ নিতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং ইউনিসেফ পানি ও স্যানিটেশন-সংক্রান্ত বৈশ্বিক তথ্য-উপাত্ত নিয়ে এ বছরের জুলাইয়ে প্রকাশ করে ‘জয়েন্ট
মনিটরিং প্রোগ্রাম (জেএমপি) প্রতিবেদন ২০২১’। প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ‘পানি
ও স্যানিটেশন খাতের উন্নতিতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। গত পাঁচ বছরে এ দুই খাতে বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে দিয়েছে ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের মতো দেশগুলো। অথচ এ দুই ক্ষেত্রে আগে বাংলাদেশের অগ্রগতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সরকার ও কর্তৃপক্ষ অনেক টাকা খরচ করে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট নির্মাণ করে দিলেও স্বল্প সময়ের ব্যবধানে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এবং অবহেলায় এর মান নষ্ট হয়ে যায়। বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টয়লেটগুলোর পরিবেশ অত্যন্ত নোংরা। বদনা ও কমোড নোংরা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাবান রাখার কেস থাকলেও এতে সাবান থাকে না। কোনো টয়লেটেই নেই টিস্যু বা তোয়ালে। দরজার ভেতরের ছিটকিনির রিং ভাঙা। পয়োনিষ্কাশনের বেসিন, পানির পাইপ ও অন্য সামগ্রীর সবই ভাঙা। টয়লেটগুলোয় মেয়েদের জন্য স্যানিটারি ন্যাপকিন বা কাপড় বদলানোর নিরাপদ পরিবেশ নেই। ফলে বিশেষ সময়গুলোয় বেশির ভাগ মেয়েই টয়লেটের বাজে অবস্থার কারণে অসুস্থতার কথা বলে ছুটি নিয়ে বাসায় চলে যেতেও বাধ্য হয় অনেক ক্ষেত্রে।
স্যানিটারি ব্যবস্থায় একটি কেন্দ্রীয় অবকাঠামো তৈরি করা যেতে পারে, যেমন নালা ব্যবস্থা, খাল ব্যবস্থা, পানির ঢলে বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং বর্জ্য ফেলার নির্ধারিত ভূমি ব্যবস্থা। এসব অবকাঠামো ময়লা পানি ও অন্যান্য শক্ত বর্জ্য নিষ্কাশনে ব্যবহূত হবে। স্যানিটেশন প্রযুক্তিকে নির্দিষ্ট স্থানে সহজে ব্যবহারযোগ্যভাবেও প্রস্তুত করা যেতে পারে। যেমন পিট ল্যাট্রিন কিংবা পানিবিহীন টয়লেট ইত্যাদির জন্য এরূপ প্রযুক্তি কাজে লাগতে পারে। কেবল প্রযুক্তিগত বিষয়াদির দিকে নজর দিলেই হবে না, জনগণকে স্যানিটেশনের ব্যবস্থা প্রদানের লক্ষ্যে পুরো ব্যবস্থার দিকেই মনোযোগ দিতে হবে। যেমন টয়লেট, ময়লা পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, আবর্জনা সবকিছুরই সঠিক ব্যবস্থাপনা করা। ব্যবহারকারী, মানববর্জ্য ও নষ্ট পানি সংগ্রহ পদ্ধতি, আবর্জনা সরানো এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ ও পুনর্ব্যবহার অথবা নিষ্কাশন—এ সবকিছুই স্যানিটেশন চেইনের ভেতরে অন্তর্ভুক্ত। যেকোনো সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য সুস্বাস্থ্য রক্ষায় উন্নত স্বাস্থ্যবিধি ও নিরাপদ পানির সঙ্গে সঙ্গে পর্যাপ্ত স্যানিটেশনের গুরুত্ব অপরিসীম। উন্নত স্যানিটেশনের অভাবে নানা রোগ-ব্যাধির বিস্তার ঘটে। স্যানিটেশন থেকে উদ্ভূত বেশির ভাগ রোগ-ব্যাধির দারিদ্র্যের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক বিদ্যমান। পরিষ্কার পানির অভাব ও অনুন্নত স্যানিটেশনের কারণে অনেক রোগ-জীবাণু জন্মায় এবং বিস্তার লাভ করে।
সরকার এরই মধ্যে সব স্কুলে শৌচাগারের মানোন্নয়নের তাগিদ ও নির্দেশনা দিয়েছে। এমনকি ছাত্রীদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও বলা হয়েছে, কিন্তু কোনো কোনো স্কুল কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এ ব্যাপারে স্কুলের প্রধান শিক্ষকের যেমন সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি ব্যবস্থাপনা কমিটিরও নিয়মিত খোঁজখবর ও দেখভাল করা উচিত। শুধু তা-ই নয়, এ ব্যাপারে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাই-বা কেন উদাসীনতার পরিচয় দেবেন? এসব তো জনহিতকর কাজের মধ্যেই পড়ে। এ সমস্যা কেবল গ্রামগঞ্জের স্কুলে রয়েছে এমন নয়, একইভাবে শহর-নগরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও আছে। রাজধানীর অনেক নামকরা স্কুলেও এ সমস্যা থাকার ব্যাপারে অভিযোগ করেন অভিভাবকরা। এসব স্কুলে নিয়মিত তদারকির অভাবে স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন যেন অরণ্যে রোদনে পরিণত হয়েছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তির সময় অবকাঠামোগত উন্নয়ন খাতে হাজার হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়; কিন্তু সেই অনুযায়ী ব্যয় করা হয় না বলে যে অভিযোগ আছে তা নতুন নয়। শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীদের এ রকম সুযোগ-সুবিধার দিকে ভ্রুক্ষেপ করা হয় না। স্কুলের ম্যানেজমেন্ট কমিটি এসব সমস্যার সমাধান করে না, যা কাম্য নয়। এজন্য শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
দেশের পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্য খাতে অগ্রগতি অর্জন করতে হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্য কার্যক্রম আরো জোরদার করাও বাঞ্ছনীয়। সরকার, সহযোগী প্রতিষ্ঠান, দাতাগোষ্ঠী ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো বর্তমানে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তাদের এজেন্ডাভুক্ত করেছে। এ খাতে বেশকিছু অগ্রগতি হলেও রয়েছে নানা সংকট। বিবিএস পরিচালিত জাতীয় স্বাস্থ্যবিধি জরিপ ২০১৮-এর তথ্যানুযায়ী, দেশে ৭৪ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ সুপেয় পানির ব্যবস্থা রয়েছে। ৫৯ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মানসম্মত স্যানিটেশন এবং ৪৪ শতাংশ বিদ্যালয় স্বাস্থ্যবিধির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে। এখন সময় হয়েছে স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থার পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন করার। আশার কথা, স্থানীয় সরকারের আওতায় সেক্টর উন্নয়ন পরিকল্পনা ২০১৫-২১-এ প্রতি ৫০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একটি করে স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার নির্মাণ করার পাশাপাশি মেয়ে শিক্ষার্থী, প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পৃথক স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন নিশ্চিতের নির্দেশনা দেয়া আছে। এর সুষ্ঠু বাস্তবায়নে তদারকিও জোরদার করতে হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মৌলিক স্যানিটেশন সংকটের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এটি উন্নয়নে দ্রুতই দেশব্যাপী বিশেষ কার্যক্রম হাতে নেয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজ করতে পারে।
বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব এখন মহামারীর ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। বৈজ্ঞানিক বিভিন্ন গবেষণায় বলা হচ্ছে, এ মহামারী নির্মূল হতে বেশ সময় লাগবে এবং এর সঙ্গেই আমাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা মেনে বসবাস করতে হবে। সুপেয় পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশনের প্রাপ্যতা এ মহামারী মোকাবেলায় একটি অন্যতম সরবরাহ, যেখানে বিদ্যালয় ও মাদ্রাসার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে পরিকল্পনায় রেখে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। শুদ্ধাচারবিষয়ক সূচক নির্ধারণ করে ওইসব বিদ্যালয়ে পানি ও স্যানিটেশনের কী কী উন্নতি হতে পারে তার একটি কলাকৌশল নির্ধারণ করা হয়। পিছিয়ে পড়া এলাকা এবং চরের বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি, স্থানীয় পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিনবিষয়ক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসহ (যেমন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, শিক্ষা প্রকৌশলী অধিদপ্তর, উপজেলা শিক্ষা অফিস) অভিভাবকদের সঙ্গে কর্মশালা করে জানা যায়, অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ের উদ্যোগেই এসব সমস্যা সমাধান সম্ভব। পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখার প্রয়োজনীয়তা এবং এ বিষয়টিকে স্থানীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে উত্থাপন করে তাদের নজরে আনলেই আলাদা প্রকল্প প্রণয়ন বা বাস্তবায়ন নিয়ে চিন্তার অবসান ঘটে।










