বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একটি বড় সময় শ্রেণীকক্ষ ও গ্রন্থাগারে কাটান। কিন্তু শ্রেণীকক্ষের আসবাব দীর্ঘক্ষণ পাঠগ্রহণের উপযোগী নয়। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে হাড় ও মাংসপেশির জটিলতাসহ নানা রোগব্যাধি বাড়ছে বলে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে। গবেষণাটির বরাত দিয়ে গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শ্রেণীকক্ষ ও গ্রন্থাগারের আসবাব শরীরের জন্য আরামদায়ক ও বিজ্ঞানসম্মত নয়। এ কারণে ৫২ শতাংশ শিক্ষার্থী হাড় ও মাংসপেশির ব্যথায় ভুগছেন। এছাড়া পিঠের নিচে, ঘাড়, কোমরসহ দেহের নানা স্থানে ব্যথার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ত্রুটিপূর্ণ আসবাবের সম্পর্ক রয়েছে বলেও জানা যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ত্রুটিপূর্ণ আসবাব ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট জটিলতার যে তথ্য গবেষণায় উঠে এসেছে, তা উদ্বেগজনক। সমস্যা থেকে উত্তরণে একাডেমিক আসবাবের আদর্শ মানদণ্ড নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশেষজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ারদের সহায়তায় মানসম্পন্ন আসবাবের নকশা প্রণয়ন ও তা তৈরির পদক্ষেপ নিতে পারে। পাশাপাশি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের পক্ষ থেকেও একাডেমিক আসবাবের আদর্শ মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিতে পারে।

আলোচ্য গবেষণাটি দেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচালিত হলেও দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষের আসবাবের ধরন, গড়ন ও মান প্রায় একই রকমের। ফলে ধরে নেয়া যায় দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধিকাংশ শিক্ষার্থীই নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ পাঠগ্রহণে সহায়ক আসবাবের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু বাংলাদেশে সে পুরনো ডিজাইনের আসবাবই ব্যবহার হয়ে আসছে বছরের পর বছর। অধিকাংশ আসবাবের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, স্থানীয় মিস্ত্রিরাই এগুলোর ডিজাইন ও নির্মাণ করে থাকেন। মাপজোকের কোনো বিষয় এতে নেই। এগুলোর কোনোটিই আরামদায়ক ও দীর্ঘসময় পড়ার উপযোগী নয়। শুধু শ্রেণীকক্ষ নয়, আবাসিক হলগুলোয়ও শিক্ষার্থীরা অবৈজ্ঞানিক চেয়ার-টেবিল ব্যবহারে করে, সেগুলোও মানসম্পন্ন নয়। ভুল নকশায় বানানো আসবাব ব্যবহারের কারণে একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী মাস্কুলোস্কেলিটাল সমস্যায় ভুগছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের সময়ের এক-তৃতীয়াংশই ব্যয় করেন শ্রেণীকক্ষে ও গ্রন্থাগারে। এতে বৈজ্ঞানিকভাবে শরীরের জন্য অনুপযোগী আসবাবে দীর্ঘক্ষণ অনুপযোগী ভঙ্গিতে বসায় এমন জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে। এক্ষেত্রে দ্রুতই একাডেমিক আসবাবের আদর্শ মানদণ্ড তৈরি করা প্রয়োজন। মানদণ্ড তৈরি করলেই হবে না, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেটি মেনে চলছে কিনা, সেটিও দেখতে হবে। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

অক্সফোর্ড, কেমব্রিজের মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্লাসরুম অডিটরিয়ামের মতো। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য এটি ব্যবহূত হলেও অল্প শিক্ষার্থীদের ক্লাস সাধারণত আরামদায়ক চেয়ার ও টেবিলে হয়ে থাকে। শুধু আসবাবই নয়, ব্ল্যাকবোর্ড বা হোয়াইট বোর্ডের দূরত্ব ও উচ্চতাও সেখানে একটি বড় বিষয়। শিক্ষার্থীদের চোখ থেকে এটি কতটা দূরে ওপরে না নিচে সেটিও বিবেচনার বিষয়। আসবাব সাজানোর পুরো প্রক্রিয়াটি মেডিকেল ও একই সঙ্গে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিষয়। বাংলাদেশে এসব বিষয় নিয়ে তেমন গবেষণা হয়েছে বলে জানা যায় না। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের মধ্যেও এটি নিয়ে ভাবনা-চিন্তা নেই বললে চলে। বছরের পর বছর একই ধরনের আসবাব ব্যবহার করে যাওয়া হচ্ছে। অথচ প্রযুক্তির প্রসার ঘটেছে বোর্ডের জায়গায় আধুনিক প্রজেক্টর সংযোজিত হয়েছে। এক্ষেত্রে কেমন উপকরণ ও আসবাব দরকার, সেটি নিয়েও বাংলাদেশে কারো ভাবনা-চিন্তা নেই। অথচ মানসম্পন্ন শিক্ষার সঙ্গে একাডেমিক আসবাবের সম্পর্ক রয়েছে। শারীরিক দুর্বলতা বা জটিলতা নিয়ে সুষ্ঠুভাবে জ্ঞানার্জন সম্ভব নয়। তাছাড়া শিক্ষাজীবনে তৈরি হওয়া জটিলতার কারণে কর্মজীবনেও তার প্রভাব পড়ে। এতে তার উৎপাদনশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা তার ক্যারিয়ার সম্প্রসারণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক আসবাব তৈরির ক্ষেত্রে প্রথমে কাজের প্রয়োজন এবং শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বিবেচনাপূর্বক সর্বোত্তম কার্যকর পাঠগ্রহণ কাঠামো তৈরি করা উচিত, যাতে পুরো প্রক্রিয়াটি সর্বোচ্চ দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা যায়। আসবাবের ওজন, ব্যবধান এবং উচ্চতার পার্থক্যের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। আসবাব স্থাপনের সময় সংযোগেও বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন। যদি একে অন্যের আকার, উচ্চতা এবং স্থানের পরিমাণ খুব বড় বা ছোট হয় তবে এটি নানা জটিলতা তৈরি করতে পারে। এখানে বড় সমস্যা বয়স, উচ্চতা ও ওজন অনুযায়ী আসবাব বিন্যাসের সুযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। ফলে সবকিছুর গড় ধরে মানসম্পন্ন আসবাব তৈরি করা যেতে পারে। ফিক্সড আসবাব তৈরির চেয়ে অ্যাডজাস্টেবল আসবাব তৈরির দিকে মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। এতে শিক্ষার্থীরা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী চেয়ার-টেবিল উপর-নিচ ও আগে-পাছে করার মাধ্যমে সমন্বয় করে নিতে পারেন।

স্বল্পসময় ও দীর্ঘসময়ে পড়ালেখার ওপর ভিত্তি করে আসবাবের ধরনও আলাদা হয়ে থাকে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শ্রেণীকক্ষের আসবাব ও গ্রন্থাগারের আসবাব একই ধরনের হয় না। এমনকি আবাসিক হলের পড়ার টেবিল ও চেয়ার বৈজ্ঞানিক উপায়ে তৈরি করা বাঞ্ছনীয়। পাঠ্যপুস্তকের মানোন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শারীরিক দিকেও মনোযোগ দেয়া আবশ্যক। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে পাঠদানে কেমন আসবাব ব্যবহার করা হবে, তার একটি সরকারি গাইডলাইন রয়েছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের আসবাবের কোনো গাইডলাইন নেই। দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্তশাসিত, তারা চাইলে বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পাঠগ্রহণ উপযোগী মানসম্পন্ন আসবাব তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে দেশের প্রকৌশল ও মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজস্ব জনবল কাঠামো ব্যবহারে করে যুগোপযোগী আরামদায়ক পাঠগ্রহণে সহায়ক আসবাবের বিভিন্ন মডেল তৈরি করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের পক্ষ থেকেও উদ্যোগটি নেয়া যেতে পারে। তবে সর্বাগ্রে একাডেমিক আসবাব তৈরি ও ব্যবহারসংক্রান্ত একটি নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন।

দুঃখজনক বিষয় হলো, একাডেমিক আসবাব তৈরির কোনো মানদণ্ড বা নিয়ম বাংলাদেশে নেই। বিদ্যমান আসবাব আমদানি অথবা স্থানীয়ভাবে তৈরি করা হয়, যা শিক্ষার্থীদের শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে তৈরি করা হয় না। এমন অনেক আসবাব দেখা যায়, যা শিক্ষাগ্রহণের ব্যবহার করা থাক দূরে ন্যূনতম পর্যায়ে ব্যবহারেরও যোগ্য থাকে না। মানসম্পন্ন আসবাব নিশ্চিত করতে তাই একাডেমিক আসবাব কেমন হবে তার একটি নীতিমালা বা গাইডলাইন প্রণয়ন জরুরি। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেটি মানছে কিনা, সেটিও তদারক করতে হবে।