চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনায় বিশ্বের অন্যতম নাজুক দেশ বাংলাদেশ। তথ্য বলছে, বন্যা, খরা, পাহাড়ি ঢল কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রতি বছর দেশে ১০-২০ শতাংশ ফসল নষ্ট হয়। এ অবস্থায় কৃষককে দুর্যোগজনিত আর্থিক ঝুঁকি ক্ষতি থেকে সুরক্ষা দিতে তাদের বীমার আওতায় আনার পরামর্শ দিয়েছেন রাজধানীতে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় আমন্ত্রিত বক্তারা। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় তথা সরকারের প্রয়োজনীয় গাইডলাইন তৈরি করা এখন জরুরি।
সময়ান্তরে জিডিপিতে কৃষির অংশ কমে এলেও কর্মসংস্থানে এর অবদান উল্লেখযোগ্য। দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪০ শতাংশ এখনো কোনো না কোনোভাবে কৃষিতে নিয়োজিত। শ্রমে-ঘামে ফসল ফলিয়ে তারা মানুষের খাদ্য জোগাচ্ছেন। দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রতি বছরই ফসলহানিসহ নানা ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন তারা। নগদ অর্থ ও ত্রাণ সহায়তা জুগিয়ে আপত্কালে বরাবরই তাদের পাশে থাকে সরকার। তাদের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি অনুপাতে রাষ্ট্রীয় এসব সহায়তা অপ্রতুল। ফলে তাদের ঘুরে দাঁড়ানো অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। দুয়েক বছর আগে কৃষক সমাজকে সুরক্ষা দিতে সরকার বিশেষ করে হাওরের সাত জেলায় শস্যবীমা চালুর একটা পাইলট কর্মসূচি নিয়েছে। এর আওতায় ফসলের ক্ষতি নিরূপণ করে কৃষকদের আর্থিক সুবিধা দেয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা উন্নত বীজ ক্রয় এবং নতুন করে আবাদ করতে অনেকটা আর্থিকভাবে সক্ষম হয়ে উঠছেন। শুধু শস্যবীমা নয়, সামগ্রিক কৃষি খাতে নানা ধরনের ক্ষুদ্র বীমা পলিসি প্রবর্তন জরুরি। কিন্তু এক্ষেত্রে জনচেতনতা ঘাটতি, অবকাঠামোগত সমস্যা, কারিগরি, রেগুলেটরি, বীমা প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার অভাব, বিতরণ মাধ্যম ও প্রিমিয়াম প্রদানে কৃষকের আর্থিক অসচ্ছলতা প্রভৃতিই হলো প্রধান বাধা। এসব বাধা দূর না করলে কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না।
বিশ্বের অনেক দেশে কৃষি খাতকে ক্ষুদ্র বীমার আওতায় আনা হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ব্রাজিল, কোস্টারিকা, জাপান, মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিপাইন। সেসব দেশে সরকার প্রথমে একটা ব্যাপকভিত্তিক গাইডলাইন তৈরি করে দিয়েছে। তার ভিত্তিতে বীমা কোম্পানিগুলো কৃষকের ঝুঁকি নিরসনে কাজ করছে। উন্নয়ন করছে নানা পলিসি। সেখানকার কোম্পানিগুলো এরই মধ্যে নেমড-পেরিল ক্রপ পলিসি, অ্যানিমেলস পলিসি, ইনডেক্সবেজড পলিসি এবং মাল্টি-পেরিল ক্রপ পলিসিসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র বীমা চালু করেছে। যেমন মাল্টি-পেরিল ক্রপ পলিসির আওতায় তারা সুনির্দিষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনায় ক্ষতির পাশাপাশি প্রত্যাশিত ফলনের ঘাটতির ভিত্তিতেও আর্থিক সুরক্ষা দিচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রতিটি কৃষকের ফলনের ইতিহাসকে বেজলাইন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আফ্রিকার কিছু দেশের কৃষকও কৃষি বীমা ব্যবহার করে সুফল পাচ্ছেন। বিশেষ করে কেনিয়ার কথা উল্লেখ করা যায়। দেশটি রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্দেশনার আলোকে সূচকভিত্তিক কৃষি বীমা চালু করেছে। এ ধরনের বীমা খরা বা অতিবৃষ্টির ঝুঁকি থেকে কৃষকদের সুরক্ষা দিতে সফল হয়েছে। প্রতিবেশী ভারতেও কৃষকদের জন্য কয়েক ধরনের বীমা চালু আছে। ফলে কৃষক সমাজ নানাভাবে উপকৃত হচ্ছে। এসব দেশের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।
দেশের নিম্ন আয়ের অনেক মানুষেরই জীবিকার উৎস কৃষিকাজ এবং তারাই বন্যা ও খরায় সাধারণ ভুক্তভোগী। সরকার তাদের নানাভাবে সহায়তা দিচ্ছে। কৃষি উপকরণে ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত দুটি ব্যাংক কৃষিঋণ দিচ্ছে। সব বাণিজ্যিক ব্যাংকও এখন কখনো সরাসরি, কখনো ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠান কিংবা অন্য মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কৃষকদের কৃষিঋণ প্রদান করছে। কিছুটা অগ্রগতি সত্ত্বেও ঋণ প্রক্রিয়াকরণে দেরি, জামানত নিরাপত্তার অবমূল্যায়ন, মাঠপর্যায়ের কর্মীদের প্রেষণার ঘাটতি এবং ঋণগ্রহীতার বীমা কাভারেজের অভাবে কৃষিঋণ প্রদানে ব্যাংকগুলো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। ফলে কৃষক প্রত্যাশিত সুফল পাচ্ছেন না। আবার কোনো ক্ষতির সম্মুখীন হলে তা থেকে উত্তরণ তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় কৃষককে সুরক্ষা দিতে ক্ষুদ্র বীমা সুবিধা নিশ্চিতের যে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে তা সময়োপযোগী। এটিকে এগিয়ে নিতে সরকারের দ্রুত আবশ্যকীয় দিক-নির্দেশনা প্রস্তুত করতে হবে।
সাধারণ বীমা করপোরেশন সত্তরের দশকে একটা কৃষিবীমা চালু করেছিল, সেটি ধরে রাখা যায়নি। হাওরে যে শস্যবীমা চালু করা হয়েছে, সে ব্যাপারেও কৃষককে খুব একটা আগ্রহী করে তোলা যায়নি। কৃষকদের আগ্রহ বাড়াতে প্রচারণামূলক কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। আবার শস্যবীমা শুধু হাওরের জেলাগুলোয় সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, অতিবৃষ্টি, খরা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলগুলো এলাকা অনুযায়ী ভাগ করে সেটি সবখানে ছড়িয়ে দিতে হবে। সর্বাগ্রে কৃষিতে উদ্ভাবনী নানা পলিসি উন্নয়নে কোম্পানিগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রণোদিত করতে হবে। প্রত্যন্ত এলাকা পর্যন্ত বীমা প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি বীমার বিষয়ে ক্ষুদ্র কৃষকদের সচেতন করে তোলার বিষয়েও নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ। গণমাধ্যমে চালাতে হবে প্রচারণা। কৃষকদের জন্য বীমা সহজলভ্য করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। প্রয়োজনে কৃষকবান্ধব মোবাইল অ্যাপ উদ্ভাবন করা যেতে পারে। শুধু একমুখী পলিসি নয়, কৃষকের সমস্যা চিহ্নিত করে বিভিন্ন ধরনের ক্ষুদ্র বীমা চালু করতে হবে। প্রিমিয়াম রাখতে হবে খুব যৌক্তিক হারে, যেন তা চাষীদের বহন করা কষ্টসাধ্য না হয়। যারা প্রিমিয়াম দিতে পারবেন না, তাদেরটা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে দেয়া যায় কিনা, সেটি মাথায় রাখা দরকার। বিষয়গুলো আমলে নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের জোরালো প্রচেষ্টা নেয়া চাই।
পাঁচ দশকে দেশের কৃষি খাতে বড় ধরনের সাফল্য এসেছে। মোট উৎপাদন অনেক বেড়েছে। ফসলে বৈচিত্র্য এসেছে। শুধু ফসল নয়, ফলমূল, সবজি, মাছ, পোলট্রি, গবাদি পশু উৎপাদনও বেড়েছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের কৃষি খাত আজ নানাভাবে হুমকির সম্মুখীন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সামনে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পৌনঃপুনিকতা ও ভয়াবহতা আরো বাড়বে বলে বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস। তেমনটা হলে কৃষক সমাজের জীবন-জীবিকা আরো ঝুঁকিতে পড়বে। সুতরাং কৃষক পরিবারের সুরক্ষায় কৃষিকে ক্ষুদ্র বীমার আওতায় আনার যে পরামর্শ দেয়া হয়েছে, তা সময়োচিত। এটা বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি।










