প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ভূমিকম্পের ধ্বংসযজ্ঞ কতটা ভয়াবহ হতে পারে সেটিই আমরা দেখেছি চলতি বছরের তুরস্ক-সিরিয়ার ভূমিকম্পে। গত ৬ ফেব্রুয়ারি তুরস্কের দক্ষিণাংশে ঘটে যাওয়া ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্পে প্রায় ৫০ হাজার মতো মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয় আর রেখে যায় ধ্বংসলীলার অবশিষ্ট হাহাকারের করুণ চিত্র। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী এ ভূমিকম্পে তুরস্কের প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার মতো আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। তুরস্কের ভূমিকম্পের ঘটনা আমাদের সবার মনে দাগ কেটে গেছে। আর এরই মধ্যে গত শুক্রবার ভোরে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় ৪ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ সময় শুক্রবার ভোর ৫টা ৫৭ মিনিটে এ ভূমিকম্প অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৩। আরো জানা যায়, ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ঢাকা থেকে ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে দোহারে। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে। ঢাকার মহানগরীর অতিনিকটে ভূমিকম্পের কেন্দ্র হওয়ায় ভূমিকম্পের তীব্রতা অনেকে বুঝতে পেরেছেন। কর্মব্যস্ত সপ্তাহ শেষে ঘুমন্ত নগরবাসীর শুক্রবারের ভূমিকম্পে আতঙ্কিত হয়ে অনেকেই রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। এখন সবার মনে বেশ কিছু প্রশ্ন উদয় হচ্ছে এমন ভূমিকম্প কী বড় কোনো বিপর্যয়ের বার্তা দিচ্ছে রাজধানীবাসীকে? রাজধানী ঢাকার ভূমিকম্প পূর্বপ্রস্তুতি কেমন? এছাড়া বাংলাদেশ ভূমিকম্পের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থান হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা বার বার সতর্কবার্তা দিয়েছেন, বাংলাদেশে ৮ মাত্রা বা তার চেয়ে বড় ধরনের ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সে রকম ভূমিকম্প হলে ঢাকা শহরের অন্তত ছয় হাজার ভবন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। প্রাণহানি হবে অন্তত তিন লাখের মতো।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশে স্বল্প ও মাঝারি মাত্রার বেশকিছু ভূমিকম্প হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে ও এর আশপাশের অঞ্চলে ভূমিকম্প নিয়ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সুনির্দিষ্ট তথ্যের অভাব রয়েছে। তবে ভূমিকম্পের কিছু নথিপত্রে পাওয়া গেলেও সেখানে তথ্য বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য অপ্রতুল। ভূতত্ত্ব বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে ২০-২৫ বছরে ছোট, মাঝারি ও বড় মাত্রার শতাধিক ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। তবে এসবের মধ্যে ৭ বা তার চেয়ে বড় মাত্রার ভূমিকম্পের সংখ্যা খুব বেশি নয়। এছাড়া ইতিহাস ঘেঁটে দেখলে বাংলাদেশের সিলেট, চট্টগ্রাম ও ঢাকায় ১৫৪৮, ১৬৪২, ১৬৬৩, ১৭৬২, ১৭৬৫, ১৮১২, ১৮৬৫ ও ১৮৬৯ সালে ভূমিকম্প হওয়ার কথা উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়া ১৮২২ ও ১৮১৮ সালে সিলেট ও শ্রীমঙ্গলে ৭ দশমিক ৫ ও ৭ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। তবে এসব ভূমিকম্পের রিখটার স্কেলে মাত্রা বা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তেমন কোথাও বর্ণনা পাওয়া যায় না। মূলত ভূমিকম্প হওয়ার ব্যাপারে যেটা জানা প্রয়োজন তাহলো ভূগর্ভের নিচে থাকা টেকটোনিক প্লেটগুলো চলাচলের কারণে ভূত্বকের মধ্যে শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে। সঞ্চিত শক্তির পরিমাণ যত বেশি হবে, ভূমিকম্পের মাত্রা তত বেশি হবে। ভূত্বকে এ শক্তির জমা হওয়া নির্ভর করে সময় ও প্লেটের গতির ওপর। স্বল্প সময়ে কম শক্তি এবং দীর্ঘ সময়ে বেশি শক্তি ভূত্বকে জমা হয়। এ শক্তি ভূত্বকের শিলার সহনীয় মাত্রা অতিক্রম করলেই নতুন ফাটল সৃষ্টি বা পুরনো ফাটল সক্রিয় করে বের হওয়ার চেষ্টা করে। এ সময়ই মূলত ভূমিকম্প হয়ে থাকে। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য মতে, এমনিতেই বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত এবং এর নিচে যে পরিমাণ শক্তি জমা রয়েছে তা যেকোনো সময় মারাত্মক ভূমিকম্পের জন্ম দিতে পারে। পূর্বেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট-মাঝারি ভূমিকম্পগুলো ভালো বার্তা দেয় না। বরং এটি বড় ভূমিকম্পের ইঙ্গিত বহন করে। ভূমিকম্প গবেষকরা বলেছেন, বড় ভূমিকম্পের শতবছরের মধ্যে আরেকটি বড় ভূমিকম্প হয়। বাংলাদেশে সবশেষ ১৯১৮ সালে মধুপুর ফল্টে বড় ভূমিকম্প হয়েছিল। বড় ভূমিকম্পের ইতিহাস হিসেবে বলছে বাংলাদেশের জন্য শতবছর ঘনিয়ে এসেছে। সে দিক থেকে আগামী সময়ে মধ্যে বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা প্রকট হয়ে উঠেছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে যেহেতু ভূমিকম্পের কোনো পূর্বাভাস করা সম্ভব নয় আর একে প্রতিরোধ করাও সম্ভব নয়। তাই ভূমিকম্প ঝুঁকিপ্রবণ এলাকায় অবস্থান করে আমাদের রাজধানী ঢাকার ভূমিকম্পের পূর্বপ্রস্তুতি কেমন রয়েছে—এমন প্রশ্ন মাথায় আসা কোনো অবান্তর প্রশ্ন নয়। এমনিতেই আমাদের ঢাকা মহানগরী অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে যেখানে বেশির ভাগ ইমারত নির্মাণে মানা হয়নি ভূমিকম্প সহনীয় নির্মাণ বিধিমালা। তাই বড় মাত্রা যেকোনো ভূমিকম্প ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাতে পারে এ মহানগরীতে। আসলে যেকোনো সময় বড় ধরনের ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও বাংলাদেশে তেমন ভূমিকম্প মোকাবেলায় কোনো প্রস্তুতি নেই বললেই চলে। অন্যদিকে ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধারকাজের তেমন কোনো প্রস্তুতি নেই আমাদের, আর যা আছে তা যথেষ্ট নয় ঢাকার মতো জনবহুল নগরীর জন্য। রাজধানী ঢাকার মতো বড় শহরগুলোয় যে পরিমাণ বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে তাতে ভূমিকম্পে ভবনধস ঘটলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে ব্যাহত হবে উদ্ধারকাজ। ভূমিকম্প মোকাবেলার জন্য চীনের সহায়তায় ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ হাতে নেয়া হলেও তার কাজ চলছে ধীরগতিতে। ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করতে হয় যার জন্য ন্যাশনাল অপারেশন সেন্টার দরকার। বাংলাদেশে এখনো এ ধরনের কোনো সংস্থা নেই। এছাড়া বড় দুর্যোগ হলে আন্তর্জাতিক সাহায্য-সহযোগিতা আসতে হলে স্থানীয় ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট কমিটি দরকার যা এখনো গঠিত হয়নি। তবে সরকারের পক্ষ থেকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় বলছে ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধারকাজে সিটি করপোরেশনগুলোকে আলাদা আলাদা অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। এসব অঞ্চলে ৩৬ হাজার প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক তৈরি করা হয়েছে। তার সঙ্গে কাজের সহায়তার জন্য ২০১৯ সালে ২২০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। এছাড়া ভূমিকম্প-পরবর্তী অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজ এবং দুর্যোগ মোকাবেলা কার্যক্রমকে শক্তিশালী করতে ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
ভূমিকম্প ঘটলে কখন বা কবে ঘটবে এবং ভূমিকম্পের যেহেতু কোনো প্রতিরোধ নেই, তাই এটি নিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি না করে। ভূমিকম্পের বিষয়ে জনসতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, ভূমিকম্প-পরবর্তী সময়ে উদ্ধারে পূর্বপ্রস্তুতি তৈরি করে রাখতে হবে। জনগণের মনে আতঙ্ক তৈরি না করে জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। জাপানে প্রায় সময় ভূমিকম্প হয়। তাদের জনসচেতনতা ও পরিকল্পনা মোতাবেক প্রস্তুতিমূলক কাজের কারণে তাদের ভূমিকম্প থেকে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ খুবই কম হয়ে থাকে। সরকারের উচিত হবে বিশেষজ্ঞদের দেয়া পরামর্শমতো পূর্বপ্রস্তুতিমূলক কাজগুলো করে যাওয়া। যেমন দ্রুততার সঙ্গে ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা। ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এনডিএমআইএস) নামে একটি ওয়েবসাইট ডাটাবেজ তৈরি যার ব্যাপারে আগে পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। বিভিন্ন ধরনের প্রজেক্ট ও এনজিও এর মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে স্টাডি রিপোর্ট প্রস্তুতকরণ ও সুপারিশমালা প্রণয়ন করতে হবে। ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগের পর নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য প্রয়োজনীয় খোলা জায়গা নেই ঢাকা শহরে, সেটার ব্যবস্থা তৈরি করা। লাখ লাখ প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকের দল গড়ে তোলা যাতে দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে তাদের কাজে লাগানো যায়। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃক সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষিত প্রশিক্ষক ও উদ্ধারকারী জনবলের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃক আধুনিক যন্ত্রপাতি সংগ্রহের চেষ্টা আরো বেগবান করতে হবে। আর তার সঙ্গে ভূমিকম্পসংক্রান্ত ঝুঁকিগুলো চিহ্নিতকরণ অংশ হিসেবে ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত শুরু করে দিতে হবে, দুর্যোগ ও দুর্ঘটনা-পরবর্তী পুনর্বাসন এবং পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে আরো দুর্যোগ সহনীয়ভাবে পুনর্গঠন কার্যক্রম তৈরি করতে হবে। আর এভাবেই আমাদের ও সরকারের সমন্বিত প্রচেষ্টায় কেবল ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবেলায় আমাদের পূর্বপ্রস্তুত করতে পারে।
মো. আবিদ মঈন খান: সাংবাদিক










