বাংলাদেশ
ও যুক্তরাষ্ট্রের
মধ্যে ওয়াশিংটনে
গতকাল অনুষ্ঠিত
হলো উচ্চপর্যায়ের
অর্থনৈতিক সংলাপ।
চার সেশনে
বিভাজিত এ
সংলাপে গুরুত্ব
পেয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য
ও বিনিয়োগ,
শ্রমিকের কর্মপরিবেশ
ও ট্রেড
ইউনিয়ন, খাদ্য
ও কৃষি
সহায়তা, ওষুধ,
তথ্য ও
যোগাযোগ প্রযুক্তি,
টেলিযোগাযোগ, ডিজিটাল
খাতসহ বিভিন্ন
বিষয়। নানা
দিক থেকে
সংলাপটি গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক সময়ে
কিছু বিষয়ে
অস্বস্তি সত্ত্বেও
দুই দেশের
অর্থনৈতিক সম্পৃক্তি
বেড়েছে। তথ্য
বলছে, দুই
দেশের প্রত্যক্ষ
অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক
সংযোগ এখন
১২ বিলিয়ন
ডলার ছাড়িয়েছে।
এরই মধ্যে
পোশাক রফতানি,
রেমিট্যান্স, এফডিআই,
জ্বালানি, ব্যাংক,
বীমা, এভিয়েশনসহ
বেশকিছু খাতের
প্রধান চালিকাশক্তি
হয়ে উঠেছে
দেশটি। যুক্তরাষ্ট্রের
দৃষ্টিতে বাংলাদেশ
এখন মার্কিন
বিনিয়োগের এক
সম্ভাবনাময় গন্তব্য
হিসেবে বিবেচিত।
এ প্রেক্ষাপটে
সংলাপটি দ্বিপক্ষীয়
বাণিজ্য ও
বিনিয়োগ বৃদ্ধির
অন্তরায়গুলো দূরীকরণে
ভূমিকা রাখবে
বলে প্রত্যাশা।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে
বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয়
সম্পর্ক দীর্ঘদিনের।
স্বাধীনতার পর
থেকে আমাদের
উন্নয়নযাত্রার অন্যতম
সহযোগী হিসেবে
কাজ করছে
দেশটি। ১৯৭২
সাল থেকে
ইউএসএইড প্রায়
৬ বিলিয়ন
ডলার সাহায্য
দিয়েছে বাংলাদেশকে।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন
ও প্রতিরক্ষা
খাতে প্রভূত
সহায়তা করেছে
দেশটি। সময়ান্তরে
গভীর হয়েছে
অর্থনৈতিক সম্পর্ক।
তবে এখনো
এ-সংক্রান্ত
সম্ভাবনাগুলোকে যথাযথভাবে
কাজে লাগানো
যায়নি। দেশটিতে
জিএসপির আওতায়
যে বাণিজ্য
সুবিধা পাওয়া
যেত, সেটি
স্থগিত রয়েছে।
পোশাক পণ্যের
সবচেয়ে বড়
বাজার হিসেবে
যুক্তরাষ্ট্রে প্রবৃদ্ধি
ভালো হলেও
এখানে কাঙ্ক্ষিত
অর্জন করতে
পারেনি বাংলাদেশ।
দেশটির বড়
আমদানি ঝুড়িতে
বাংলাদেশের অংশগ্রহণও
যৎসামান্য। আবার
যে মাত্রায়
মার্কিন বিনিয়োগ
আসার কথা,
তার গতিও
শ্লথ। এর
পেছনে আমাদের
দিক থেকেও
এখনো ভৌত
ও অভৌত
কিছু ঘাটতি
বিরাজমান। সাম্প্রতিক
বছরগুলোয় বিদ্যুৎ
উৎপাদন সক্ষমতা
বাড়লেও নিরবচ্ছিন্ন
গ্যাস-বিদ্যুৎ-জ্বালানি
প্রাপ্তির অনিশ্চয়তা
দূর হয়নি।
নিবন্ধন, ভূমি
অধিগ্রহণ থেকে
শুরু করে
ব্যবসা পরিচালনার
প্রক্রিয়াগুলোও এখানে
বেশ জটিল
ও সময়সাপেক্ষ।
পদে পদে
আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা
বিদ্যমান। আইনকানুনে
আছে অস্পষ্টতা-অস্বচ্ছতা।
পুঁজি প্রত্যাবাসন
কিংবা মুনাফা
স্থানান্তর প্রক্রিয়া
তেমন একটা
সহজ নয়।
অন্য দেশগুলোর
চেয়ে করপোরেট
করহার এখানে
তুলনামূলক বেশি।
তদুপরি কর-ভ্যাট
আহরণ প্রক্রিয়ায়
রয়ে গেছে
জটিলতা। অনেক
ক্ষেত্রে দ্বৈত
করের সমস্যাও
আছে। প্রাতিষ্ঠানিক
সিদ্ধান্ত গ্রহণ
থেকে শুরু
করে এখানে
সার্বিক প্রক্রিয়া
ও পদ্ধতিগুলো
বেশ ধীর।
এগুলো যুক্তরাষ্ট্র
থেকে বিনিয়োগ
আকর্ষণের পথে
অন্তরায়।
বিশ্বের সর্ববৃহৎ
অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের
বিনিয়োগ ও
অর্থনৈতিক সম্পৃক্তি
অনেক দেশেই
বিদ্যমান। দেশটির
ঐতিহ্যিক বিনিয়োগ
গন্তব্যের মধ্যে
রয়েছে জাপান,
যুক্তরাজ্য, জার্মানি,
আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস,
অস্ট্রেলিয়া, স্পেন,
বেলজিয়াম ও
দক্ষিণ কোরিয়ার
মতো দেশগুলো।
সেসব দেশে
এখন শ্রম
মজুরি ও
আনুষঙ্গিক ব্যয়
ঊর্ধ্বমুখী। এ
প্রেক্ষাপটে মার্কিন
কোম্পানিগুলো ধীরে
ধীরে নতুন
নতুন গন্তব্যে
যাচ্ছে। সাম্প্রতিক
সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের
দেশ ইসরায়েল,
কাতার, সংযুক্ত
আরব আমিরাত,
পূর্ব এশিয়ার
দেশ সিঙ্গাপুর,
থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন,
ভিয়েতনাম ও
দক্ষিণ-পূর্ব
এশিয়ায় ভারতে
বিনিয়োগ বাড়িয়েছে
দেশটি। কোনো
কোনোটির সঙ্গে
টিফা চুক্তি
করেছে, কোনো
কোনোটির সঙ্গে
এফটিএ করেছে।
দেশগুলোর সঙ্গে
অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব
আরো বাড়াতে
আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র।
নিজেকে বিনিয়োগ
গন্তব্য হিসেবে
আকর্ষণীয় করে
তুলতে ব্যাপক
কাঠামোগত ও
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার
করেছে দেশগুলো।
ভৌত অবকাঠামো
সুবিধা বাড়িয়েছে।
নীতি কাঠামো
সহজ ও
পরিপূরক করেছে।
প্রক্রিয়াগত ও
আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা
কমিয়েছে। কর
কাঠামোয় এনেছে
উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।
কর আদায়ের
প্রক্রিয়া সহজ
ও স্বয়ংক্রিয়
করেছে। সর্বোপরি
নিশ্চিত করেছে
একটি সহায়ক
বিনিয়োগ পরিবেশ।
বৈশ্বিক নীতি-কৌশল
পর্যালোচনা করে
আমাদেরও এসব
ক্ষেত্রে উন্নতি
দরকার।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন,
গত পাঁচ
বছরে দুই
দেশের সম্পর্কোন্নয়নের
বড় দিক
ছিল সংলাপ।
সুনির্দিষ্টভাবে অর্থনৈতিক
সংলাপ বড়
ভূমিকা রেখেছে।
সর্বশেষ ২০১৯
সালে প্রথম
অর্থনৈতিক সংলাপটি
হয়েছিল। এটি
আনুষ্ঠানিক আলোচনার
দ্বিতীয় পর্ব।
এ সংলাপে
যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়াগুলো
বাংলাদেশকে জানিয়েছে।
আর বাংলাদেশ
জানিয়েছে তার
চাওয়াগুলো। পারস্পরিক
বোঝাপড়ার জন্য
এ সংলাপ
গুরুত্বপূর্ণ। নিকট
অতীতের অভিজ্ঞতা
আমাদের ভালো
নয়। আশা
করা হয়েছিল,
বাংলাদেশের সঙ্গে
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য
ও বিনিয়োগ
সহযোগিতা চুক্তি
(টিকফা) হলে
দুই দেশের
অংশীদারত্ব আরো
বাড়বে। বেশ
আগেই এ
চুক্তি সই
হয়েছে। কিন্তু
এখন পর্যন্ত
ফোরামটি একটি
কার্যকর ফোরামে
পরিণত হতে
পারেনি। দ্বিপক্ষীয়
নানা ইস্যুতে
নিয়মিত বৈঠক
হচ্ছে বটে,
কার্যকর সুফল
মিলছে না।
সুতরাং বিষয়টির
ধারাবাহিকতা বজায়
রেখে এ
সংলাপকে একটা
ফলপ্রসূ জায়গায়
নিতে হবে।
দেশের জ্বালানি
তেল ও
গ্যাস, ব্যাংক
ও বীমা
এবং বিদ্যুৎ
উৎপাদন খাতে
যুক্তরাষ্ট্রের অনেক
বিনিয়োগ এসেছে।
এখানে দেশটির
বিনিয়োগ প্রসারের
আরো সুযোগ
আছে। এটাকে
মাথায় রেখে
প্রয়োজনীয় কাঠামোগত
ও প্রাতিষ্ঠানিক
সংস্কার করতে
হবে। বড়
মার্কিন কোম্পানিগুলোকে
ধরে রাখার
পাশাপাশি নতুনগুলোকে
আকর্ষণ করতে
যে পরিমাণ
পদ্ধতিগত উন্নয়ন
দরকার, তাতে
মনোযোগ দিতে
হবে। কর
জটিলতার মতো
বিষয়গুলো দূর
করা নিয়ে
ভাবতে হবে।
ব্যবসা-বাণিজ্যের
পদ্ধতিগুলো আরো
সহজ করা
দরকার। বাণিজ্যবিরোধ
নিষ্পত্তির ক্ষেত্রগুলো
আরো স্বচ্ছ
হতে হবে।
আমরা দেখছি
নানাভাবে বিনিয়োগ
বাধা নিরসনের
চেষ্টা করছে
সরকার, তবে
তা হচ্ছে
বেশ ধীরগতিতে।
কাজটি আরো
বেগবান করতে
হবে। এদিকে
যুক্তরাষ্ট্র আমদানি
বাণিজ্যে চীননির্ভরতা
কমাতে চায়।
এজন্য পণ্য
আমদানির উৎস
হিসেবে অন্যতম
সম্ভাবনাময় বিকল্প
হিসেবে বাংলাদেশকেই
বিবেচনা করছে
দেশটি। অতীতে
আফ্রিকার দেশগুলো
বা ভিয়েতনামে
এ ধরনের
বিকল্প তৈরির
চেষ্টা করেছিল
যুক্তরাষ্ট্র। তবে
চীন ইস্যুতে
ওইসব দেশ
থেকে মুখ
ঘুরিয়ে নিয়েছে
ওয়াশিংটন। বাকি
দেশগুলোর মধ্যে
বাংলাদেশেই এখন
তুলনামূলক বেশি
সম্ভাবনা দেখতে
পাচ্ছেন দেশটির
বাণিজ্য খাতসংশ্লিষ্টরা।
এটা বাংলাদেশের
জন্য সুবর্ণ
সুযোগ। সেজন্য
সুশাসন, শ্রম
অধিকার ও
কর্মপরিবেশ বিষয়ে
তাদের যে
অস্বস্তি আছে
তা নিরসনে
দৃশ্যমান উদ্যোগ
নিতে হবে।
গত পাঁচ বছরে দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় দ্বিগুণে। এফডিআইয়ের মতো দৃশ্যমান ক্ষেত্রের বাইরে জ্ঞান ও প্রযুক্তি বিনিময়ও বেড়েছে। করোনা মোকাবেলায় দেশটি বিপুল পরিমাণ টিকা অনুদান দিয়েছে বাংলাদেশকে। এসব তাত্পর্যজনক অগ্রগতি। এমন প্রেক্ষাপটে যে অর্থনৈতিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হলো তা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তাই এ ধরনের সংলাপের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি।










