পাঁচ দশক ধরে দেশে অবস্থানরত বিহারিরা বিভিন্ন ক্যাম্পে মানবেতর জীবনযাপন করে আসছেন। ন্যূনতম সুবিধা থেকেও তারা বঞ্চিত। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণেও তাদের সক্ষমতা নেই। বাড়তি জনসংখ্যার কারণে ঢাকার ক্যাম্পগুলোয় অপরিকল্পিতভাবে একের পর এক বহুতল পাকা বাড়ি উঠছে। যেকোনো সময় এসব বাড়ি ধসে প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অতিসম্প্রতি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নতুন ওয়ার্ডের উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থানরত বিহারিদের জন্য সরকার আবাসন ও কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী আশ্রয়হীনদের জন্য গৃহ প্রদানের পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং সেটি সাফল্যের সঙ্গে বাস্তবায়ন হচ্ছে। সে প্রেক্ষাপট থেকে বিহারিদের আবাসন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার উদ্যোগটি ইতিবাচক। তবে বিষয়টি যেন শুধু প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে বা বিহারিদের অধিকারে থাকা স্থান দখলের প্রক্রিয়া না হয়, তাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিহারিদের পুনর্বাসনে ত্রাণ ও দুর্যোগ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সক্রিয়তা সবচেয়ে বেশি জরুরি। সর্বোপরি উন্নয়নশীল বাংলাদেশে একটি জনগোষ্ঠীর মানবেতর জীবন যাপনের বিষয়টি কাম্য নয়।
স্বাধীনতা
যুদ্ধের পর দেশের বিভিন্ন
স্থানে আটকে পড়া উর্দুভাষীদের ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব দ্য রেড ক্রস (আইসিআরসি)
একত্র করে। তাদের একটি অংশের জায়গা
হয় মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পে। সে সময় প্রতিটি
অবাঙালি পরিবারের
জন্য অস্থায়ী
ভিত্তিতে আইসিআরসি
৮ ফুট বাই ৮ ফুটের টিন শেড বাড়ি তৈরি করে দেয়। কালক্রমে
টিন শেড বাড়ি এখন পাকা হয়েছে।
সরু গলিতে
একেকটি একতলা
বাড়িতে তারা দ্বিতল বাড়ি তৈরি করেছেন।
আর আইসিআরসির
পর ক্যাম্পের
দায়দায়িত্ব বাংলাদেশ
সরকারের ত্রাণ
ও পুনর্বাসন
মন্ত্রণালয়ের ওপর বর্তেছে। ক্যাম্পের
অনেক ছেলেমেয়ে
উচ্চশিক্ষিত হলেও তারা শুধু বিহারি পরিবারে
জন্ম নেয়ায়
চাকরি পাচ্ছেন
না। আবার দরিদ্র এ মানুষগুলো চিকিৎসার
ব্যয় বহন করতে না পেরে সুস্থ
থাকার জন্য ডাক্তারের বদলে ফার্মেসিতে গিয়ে ওষুধ কেনার
ওপর নির্ভরশীল।
দেশজুড়ে ছড়িয়ে
থাকা বিহারি
ক্যাম্পে একেকটি
ঝুপড়ি ঘরে ১০-১৫ জন বসবাস
করে। একটি কামরার ভেতরে
রান্না, খাওয়া,
ঘুম। সেখানেই
ঠাসাঠাসি করে রাখা প্রয়োজনীয়
আসবাব। প্রায়
সব ঘরেই একই চিত্র।
এছাড়া একই গোসলখানায় একাধিক
নারী কিংবা
একাধিক পুরুষকে
গোসল করতে দেখা গেছে।
২০০৮ সালে বেশকিছু বিহারিকে
ভোটাধিকারের সুযোগ
দেয়া হয়। তাদের সবচেয়ে
বড় ক্যাম্প
হচ্ছে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প। এ ক্যাম্পের বাসিন্দাদের চিকিৎসা, পয়োনিষ্কাশন ও গ্যাসের মতো নাগরিক সেবার
অবস্থা অত্যন্ত
নাজুক। ক্ষেত্রবিশেষে নাগরিক সুবিধা পেতে বিহারিদের নিজের
পরিচয়ও লুকিয়ে
রাখতে হয়, যা একুশ শতকে সুখকর
নয়।
বর্তমানে ঢাকা শহরের অভ্যন্তরে আটকে পড়া বিহারি হিসেবে পাকিস্তান গমনের উদ্দেশ্যে যারা বসবাস করে আসছে, এদের প্রত্যেকে জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন ক্যাম্প থেকে এসে নিজ নিজ পেশায় নিয়োজিত থেকে রুটি-রুজির ব্যবস্থা করছে। শরণার্থী শিবির থেকে এদের বের হতে এবং সেখানে প্রবেশের ব্যাপারে কোনো ধরনের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নেই। এরা কেউ আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনায় শরণার্থী শিবিরের বাইরে বসবাস করতে চাইলে সেক্ষেত্রে কোনো আইনগত বাধা নেই। আবাসনের অসুবিধা, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও মানবিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে রাজধানী ঢাকার বিহারি ক্যাম্পগুলো সরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ নেয়া হলেও সেই কাজ অনেকটা থমকে আছে। ঢাকার আশপাশে সুবিধাজনক স্থানে এগুলো স্থানান্তরের কথা ছিল। এজন্য প্রাথমিকভাবে গাজীপুর ও কেরানীগঞ্জের দুটি স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে তা চূড়ান্ত করা হয়নি। এক্ষেত্রে ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের সক্রিয়তা প্রয়োজন। জমি সমস্যার সমাধানে ভূমি মন্ত্রণালয় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। কাজের গতি বৃদ্ধি ও মান নিশ্চিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সমন্বয়সহ তদারকির দায়িত্ব পালন করতে পারে। এক্ষেত্রে যথাযথ পুনর্বাসনের আগে কেউ উৎসাহিত হয়ে তাদের উচ্ছেদ করে জায়গা দখল না করে, সেটিও দেখা দরকার। কারণ এরই মধ্যে কিছু প্রভাবশালীর দৃষ্টি তাদের জায়গার ওপর পড়েছে। কারণ এসব স্থান রাজধানী বা বিভাগীয় বা জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে এবং এর দামও অনেকে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার সুযোগে পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরুর আগে বিহারিদের যেন উচ্ছেদ না করা হয়, সরকারকে তা নিশ্চিত করতে হবে। আগে যথাযথ আবাসন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা তারপর স্থানান্তর করতে হবে। একই সঙ্গে বিহারিদের জমি অবশ্যই সরকারের অধিকারে নিতে হবে যাতে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি এটি দখল করতে না পারে।
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঢাকার ক্যাম্পগুলোয় থাকা জনগোষ্ঠীকে ঢাকার অদূরে বিভিন্ন স্থানে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছিল। বিভিন্ন স্থানে প্রাথমিকভাবে জায়গা দেখা হয়েছিল। কিন্তু সেই উদ্যোগ আর এগোয়নি। এবারের নির্দেশনারও যেন একই পরিণতি না হয়, তা নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নজরদারি প্রয়োজন। কালের নিয়মে ঢাকার ক্যাম্পগুলোর জমির দাম বেড়েছে। ফলে অনেকের নজর এখন এসব জায়গার ওপরে। নানা স্থানে জমি দখল করতে পেশি শক্তি ব্যবহার করতেও দেখা যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশে প্রায় দুটি প্রজন্ম পেরিয়ে গেছে কিন্তু বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে পূর্ণ মর্যাদা, সম্মান ও সহযোগিতা পাচ্ছে না তারা। দেশের কয়েকটি জেলায় অবস্থিত ক্যাম্পগুলোয় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। আইনগত দিক থেকে আটকে পড়া পাকিস্তানিরা বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ার পূর্ণ স্বীকৃতি পেলেও মূলত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তহীনতার কারণেই এ সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। সামাজিকভাবে বাংলাদেশের উন্নতির মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থানে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে। তাছাড়া তারা নানা অসামাজিক কার্যক্রমসহ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, যা নিয়ন্ত্রণ করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বাড়তি বেগ পেতে হচ্ছে। পুনর্বাসনের মাধ্যমে এ সামাজিক সমস্যার সমাধানও সম্ভব।
উর্দুভাষী
জনগোষ্ঠীর আর কেউই পাকিস্তানে
ফিরতে চায় না। তবে এর আগে একদিকে পাকিস্তানে
ফিরে যাওয়ার
আকুতি, অন্যদিকে
প্রতিদিনের জীবনসংগ্রাম—এ টানাপড়েনে পার হয়ে গেছে কয়েক দশক। ক্যাম্পের অমানবিক
জীবনযাপনই তাদেরকে
পাকিস্তানে সুন্দর
জীবনের অলীক স্বপ্ন দেখাচ্ছিল।
সেই ঘোর এত দিনে কেটে গেছে তাদের। যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন,
তাদের অনেকেই
মারা গেছেন।
যারা বেঁচে
আছেন, সারা জীবনের অস্থির
ও অনিশ্চয়তায়
ভরা জীবনের
দিকে তাকিয়ে
হতাশার নিঃশ্বাস
ফেলেন। পাকিস্তান
সরকার বারবার
নেয়ার আশ্বাস
দিয়েও তাদের
ফিরিয়ে নেয়নি।
এদিকে আর্থিক
দুরবস্থার কারণে
সবাই বাংলাদেশের
মূল জনগোষ্ঠীর
সঙ্গে মিশতেও
পারেনি। যাদের
আর্থিক অবস্থা
ভালো তাদের
মূল জনস্রোতে
মিশতে কষ্ট হয়নি। বিহারিরা
বাংলাদেশের নাগরিক
হওয়ার আইনি স্বীকৃতি পেয়েছে।
এখন তাদের
সামনে চ্যালেঞ্জ
মূল স্রোতে
মিশে যাওয়ার।
তবে অবশ্যই
সরকারকে এ বিষয়ে সহযোগিতা
করতে হবে। সরকারের দারিদ্র্য
বিমোচন কর্মসূচির
আওতায় এদের নিয়ে এসে আর্থিক দুরবস্থা
কাটানোর সুযোগ
সৃষ্টি করতে পারে। মুক্তিযুদ্ধে যারা বিরোধিতা করেছে
এবং হত্যার
সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের
খুঁজে বের করে শাস্তি
দিতে হবে—এটা যেমন ঠিক, তেমনি
যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে
যুক্ত নয়, এমন সাধারণ
উর্দুভাষীদের সঙ্গে
শত্রুভাবাপন্ন হওয়াটাও
ঠিক হবে না। উর্দুভাষী
তরুণ প্রজন্মের
সঙ্গে বাঙালি
তরুণ প্রজন্মের
সেতুবন্ধ রচনায়
কার্যকরী উদ্যোগ
নিতে হবে। এক্ষেত্রে একটা ওয়েলফেয়ার ফান্ড
করা যেতে পারে। যার আওতায় সারা দেশের সব ক্যাম্পে অবস্থানরত
মানুষকে একমুখী
উন্নয়ন কার্যক্রমের আওতায় আনা যায়। সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শিশুদের
শিক্ষা নিশ্চিত
করা এবং যারা কিশোর
থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে উঠছে, তাদের
জন্য কর্মমুখী
প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা
করা। তবে যা-ই করা হোক না কেন, তাদের মতামত
নেয়া চাই।
উর্দুভাষীরা নানাভাবে বাংলাদেশের জনজীবনে জড়িয়ে পড়েছে। তাদের খাবারশৈলী সর্বমহলে প্রশংসিত, নরসুন্দর হিসেবে সমাজে তাদের ভূমিকা রয়েছে। তাদের কার্যক্রমগুলো আরো ছড়িয়ে দিতে এবং অর্থনীতিতে অবদান বাড়িয়ে তুলতে বিহারিদের আবাসন ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে নেয়া কার্যক্রমের দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। দুঃখজনক বিষয় হলো, বেশ কয়েক বছর ধরে ঝুলে রয়েছে এটি। প্রত্যাশা থাকবে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী কার্যক্রমের গতি বাড়বে। মনে রাখতে হবে, জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে অবহেলিত রেখে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের যাত্রা সুখকর হবে না।










