গত দুই দশকে দেশে সিমেন্ট ও ইস্পাত শিল্পের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছে। গ্রাম-শহর সর্বত্রই বাড়িঘর-ভবন নির্মাণে এখন ব্যবহার হচ্ছে দেশে উৎপাদিত নির্মাণ উপকরণ। শুধু তা-ই নয়, পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, কর্ণফুলী টানেল, মেট্রোরেলের মতো বড় অবকাঠামো নির্মাণ হচ্ছে আমাদের নিজস্ব সিমেন্ট ও ইস্পাত দিয়ে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে রফতানিরও বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে এসব পণ্যের। এ প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট খাতের উদ্যোক্তারা রফতানিতে প্রণোদনার দাবি করে আসছেন অনেক দিন ধরে। সম্প্রতি সিমেন্ট শিট ও ইস্পাত পণ্য রফতানিতে প্রণোদনা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। সুষ্ঠুভাবে এর বাস্তবায়নই কাম্য।
সময়ান্তরে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে সিমেন্ট ও ইস্পাত শিল্প। কিন্তু খাত দুটি প্রতিনিয়ত কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। করোনা মহামারীতে গত বছর সরকারি প্রকল্পের নির্মাণকাজ তেমন বাড়েনি; বরং অনেক কাজ বন্ধ ছিল। আবাসন কোম্পানিগুলোরও চাহিদা বাড়েনি তেমন। এর একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তার ওপর আছে করসংক্রান্ত বিভিন্ন ঝামেলা। এ দুই শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ফেরত পাওয়ার কথা। গত দুই-তিন বছর থেকে সেই অর্থ ফেরত পাওয়া যাচ্ছে না। প্রক্রিয়াটি জটিল হওয়ায় বিপুল অর্থ আটকে আছে। বাড়তি বোঝা হিসেবে থাকা আগাম কর প্রত্যাহারের কথা বলা হচ্ছিল। সেটি প্রত্যাহার করা হয়নি। ফলে করোনার ধাক্কা সামলে খাত দুটি ঘুরে দাঁড়াতে হিমশিম খাচ্ছে। সব মিলিয়ে সিমেন্ট ও ইস্পাত শিল্পের উদ্যোক্তারা নানা সংকটের বেড়াজালে বন্দি। এ থেকে পরিত্রাণে রাষ্ট্রের সহায়ক উদ্যোগ জরুরি।
বিশ্বের সব দেশেই সম্ভাবনাময় খাতগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হয়। আমরা দেখছি ভিয়েতনাম পোশাক খাতের বাইরে ইলেকট্রনিক ও ইলেকট্রিক্যাল শিল্প, পাদুকা শিল্প ও কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে নীতি সহায়তা দিচ্ছে। অব্যাহত প্রণোদনা দিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি বাড়াতেই এ উদ্যোগ। সমরূপভাবে কম্বোডিয়াও প্রধান রফতানি খাত পোশাকের বাইরে ট্রাভেল গুডস ইন্ডাস্ট্রি, প্রাকৃতিক রাবার শিল্প, ক্ষুদ্র প্রকৌশল শিল্প ও মত্স্য খাতে উল্লেখযোগ্য হারে প্রণোদনা দিচ্ছে। ফলে দেশটির রফতানি বাণিজ্য বাড়াতে খাতগুলো শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে সমর্থ হয়েছে। প্রতিযোগী হওয়ায় দেশগুলোর নীতি ও পদক্ষেপ আমাদের জন্য বিশেষভাবে শিক্ষণীয়।
রফতানি বাণিজ্যকে উৎসাহিত করতে প্রণোদনার কিছু ব্যবস্থা আমাদের দেশেও অবশ্য প্রচলিত। অতীতে বিশেষ করে পোশাক, পাট, চামড়াসহ কিছু পণ্যের রফতানি বাড়াতে এটি উল্লেখযোগ্য সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। প্রণোদনাপ্রাপ্ত আগের পণ্যের সঙ্গে যুক্ত হতে যাচ্ছে সিমেন্ট শিট ও ইস্পাত পণ্য। বলা হচ্ছে, এসব পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে নিট এফওবি মূল্যের ওপর ৪ শতাংশ হারে উৎপাদনকারী ও রফতানিকারক প্রণোদনা প্রাপ্ত হবেন। এজন্য স্থানীয় মূল্য সংযোজনের হার ন্যূনতম ৩০ শতাংশ হতে হবে। কারা পাবেন, কতটুকু পাবেন, শর্তাবলি কী, প্রণোদনার জন্য কীভাবে আবেদন করবেন, কী ধরনের কাগজপত্র লাগবে, অনুমোদিত ডিলার ব্যাংক কীভাবে কর্মপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে—সব বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রতিটি ধাপে নির্দেশনার যথাযথ পরিপালন নিশ্চিত করা চাই।
সিমেন্ট শিট ও ইস্পাত পণ্য রফতানিতে প্রণোদনা দেয়ার বিষয়টি একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। কিন্তু এর সুষ্ঠু বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জও কম নয়। নিকট অতীতে দেখা গেছে, কিছু পণ্যের রফতানিতে সরকারের দেয়া প্রণোদনা একশ্রেণীর জালিয়াত চক্র হাতিয়েছে। কোথাও প্রকৃত ঘোষণার চেয়ে কম পণ্য, কোথাওবা ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য দেখিয়ে কিংবা ভুয়া রফতানি দলিল তৈরি করে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেছে। শুধু তা-ই নয়, রফতানি না করলেও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে নগদ সহায়তা দেয়ার প্রমাণ মিলেছে কোনো কোনো ব্যাংকের বিরুদ্ধে। বিভিন্ন খাতে করোনাকালীন প্রণোদনা প্যাকেজের ক্ষেত্রেও এ ধরনের অনিয়ম হয়েছে। যার প্রাপ্য তিনি পাননি, পেয়েছেন অন্য কেউ। ফলে অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত সুফলভোগী বঞ্চিত হয়েছেন। সিমেন্ট-ইস্পাত পণ্য রফতানি প্রণোদনার ক্ষেত্রে এ ধরনের অনিয়ম যেন না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। গ্রাহক থেকে ব্যাংক সব পক্ষকে স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্য নির্দেশনায় শাস্তির কথাও সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে। শুধু কাগজে শাস্তির কথা বললে হবে না, অনিয়ম প্রতিরোধে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির নজরদারি বাড়াতে হবে। অনুমোদিত ব্যাংক থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে নিয়মিত বসতে হবে। সর্বোপরি কোনো ধরনের অনিয়ম হলে বিধি মোতাবেক কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এর বিকল্প নেই।
আগের কিছু পণ্যে নগদ সহায়তার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে রফতানিকারক ও ব্যবসায়ীদের। রফতানির ছয় মাসের মধ্যে নগদ সহায়তা চেয়ে আবেদনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও নগদ সহায়তার একটি আবেদন নিষ্পত্তি হতে সময় লেগে যাচ্ছে দুই-আড়াই বছর। ফলে নতুন করে রফতানির উদ্যোগ নেয়ার ক্ষেত্রে প্রণোদনা একজন ব্যবসায়ীকে যে উৎসাহ দেয়ার কথা, তা যেমন দিতে পারছে না; তেমনি এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে কাগজপত্র নিয়ে দৌড়ঝাঁপে ব্যবসায়ীদের নাভিশ্বাস উঠছে। এর বাইরে সরকারি দপ্তরগুলোর অনিয়ম, দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তো রয়েছেই। ফলে যারা উেকাচ দিয়ে লিয়াজোঁ করছেন, তারা দ্রুত পেলেও অন্যদের প্রণোদনা পেতে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। কাজেই বিষয়টি আমলে নিয়ে সিমেন্ট শিট ও ইস্পাত পণ্য রফতানিতে প্রণোদনা প্রাপ্তির প্রক্রিয়াটি যথাসম্ভব হয়রানিমুক্ত করতে হবে। নইলে এর কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না।
ভারতের সেভেন সিস্টার্স রাজ্যগুলোয় দেশের সিমেন্ট, সিমেন্ট শিট ও ইস্পাত পণ্য রফতানি হচ্ছে। আফ্রিকার দেশগুলোসহ অন্য নিম্ন আয় ও উন্নয়নশীল দেশে এসব পণ্যের বাজার সম্ভাবনা রয়েছে। সিমেন্ট শিট ও ইস্পাত পণ্যের রফতানিতে গৃহীত প্রণোদনার সিদ্ধান্ত সেসব আমাদের রফতানি বাণিজ্য বাড়াবে। নতুন নতুন বাজার উন্মোচন এবং রফতানি ঝুড়ির বৈচিত্র্যেও এটি সহায়ক হবে বৈকি।










