বরাবরের
মতো জাতীয়
সংসদে উপস্থাপিত
হতে যাচ্ছে
২০২২-২৩ অর্থবছরের
জাতীয় বাজেট।
এর প্রাক্কলন
করা হয়েছে
৬ লাখ
৭৭ হাজার
৮৬৪ কোটি
টাকা। ১৯৭২-৭৩
অর্থবছরে দেশের
প্রথম বাজেট
ছিল ৭৮৬
কোটি টাকা
মাত্র।
জাতির জনক
বঙ্গবন্ধু শেখ
মুজিবুর রহমান
শৈশব, তারুণ্য
ও যৌবন
অতিক্রম করেন
দু-দুটি
বিশ্বযুদ্ধ দেখে
এবং বেড়ে
ওঠেন কৃষিনির্ভর
অভাবী ও
মন্বন্তরের বাংলায়।
বয়স যখন
তার মধ্যগগনে
তখন তিনি
বাংলাদেশের রাষ্ট্রনায়ক।
পেলেন যুদ্ধবিধ্বস্ত
স্বদেশ ও
অভাব। জানালেন
দুনিয়া ঘুরে
খাদ্য আনতে
পারেননি; খেতে
হলে তা
উৎপাদন করে
খেতে হবে।
কারিগরি বিশেষজ্ঞ
হিসেবে কৃষি
গ্র্যাজুয়েটদের দিলেন
প্রথম শ্রেণীর
মর্যাদা। তিনি
তাই প্রথম
বাজেটে কৃষিকে
দিলেন অগ্রাধিকার।
সে ধারাবাহিকতায়
বাংলাদেশের কৃষি
আজ খোরাকি
কৃষি থেকে
বাণিজ্যিক কৃষিতে
রূপান্তর ঘটেছে।
বাজেটে কৃষির
হিস্যা বাড়ানো
তাই সময়ের
দাবি।
মানুষের প্রধান
ও মৌলিক
চাহিদা খাদ্য।
তা পূরণ
করতে হলে
অগ্রাধিকার দিতে
হবে খাবারের
জোগানে। দেশের
খাদ্যনিরাপত্তায় কৃষির
গুরুত্ব অনুধাবন
করে জ্বালানি
তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য
ও ইউরোপীয়
কোনো কোনো
দেশ ঊষর
আফ্রিকায় কৃষিজমি
নিজ আয়ত্তে
আনার প্রতিযোগিতায়
নেমেছে।
বর্তমানে বিরূপ
প্রকৃতি, কভিড-১৯
এবং অনিশ্চিত
ও চলমান
রাশিয়া-ইউক্রেন
যুদ্ধের প্রভাবে
বিশ্বময় ধনী-দরিদ্র
নির্বিশেষে সবার
জীবনকে নানাভাবে
নাড়া দিয়ে
যাচ্ছে। তার
সঙ্গে দেশে
আমদানি ব্যয়
বৃদ্ধি এবং
রফতানি ও
প্রবাসীদের পাঠানো
আয়প্রবাহে ভাটা,
দেশে থাকার
পরেও খাদ্যপণ্যের
মজুদদারির কারণে
মূল্যবৃদ্ধির পাগলা
ঘোড়ার নাচন
আর ডলারের
অবিরাম ঊর্ধ্বগতির
অভিঘাত—আশা-ভরসা
ও প্রাপ্তির
খাতাকে সংকুচিত
করছে। ডলারের
রিজার্ভ বর্তমানে
নেমে ৪
হাজার ৪০০
কোটি ডলারে
স্থিত। এরই
মধ্যে আমদানিনির্ভর
খাদ্যপণ্যের আমদানি
কর কমানোর
সুবিধা ভোক্তার
চেয়ে বণিকদের
পকেটই ভারী
করছে।
বিদ্যমান বৈশ্বিক
প্রাকৃতিক, অর্থনৈতিক
ও রাজনৈতিক
আবহাওয়ার মধ্যে
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ
করে নিত্যপ্রয়োজনীয়
পণ্যদ্রব্যের মূল্য
সাধারণ মানুষের
ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে
রাখা, কর্মসংস্থান
সৃষ্টি করে
সব শ্রেণীর
মানুষের আয়ের
সংস্থান এবং
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর
জন্য সুরক্ষা
বলয়ের ব্যবস্থা
করে দেশের
প্রবৃদ্ধি ও
উন্নতির দিগ্দর্শন
প্রতিফলিত হবে
বাজেটে।
বাজেট সামনে
রেখে আমজনতার
প্রত্যাশা ডাল-ভাত
খেয়ে সুন্দরভাবে
বেঁচে থাকার,
হতদরিদ্রদের শ্বাস
ফেলে বেঁচে
থাকার আশা।
কৃষকসমাজ নজরুলের
ভাষায় চায়
দুটো ভাত,
একটু নুন
এবং বণিকরা
চায় শুল্কহার
হ্রাস। উদ্যোক্তাদের
আশা কর
অবকাশ ও
প্রণোদনা, ধনীরা
চায় করের
বোঝা হালকা
হোক। সরকার
চায় সবার
প্রত্যাশা পূরণ
করে দেশজ
সম্পদের প্রবৃদ্ধি
ও উন্নয়ন।
দেশ যদিও
প্রধান খাদ্যশস্য
ধান উৎপাদনে
মোটামুটি স্বনির্ভর।
খাদ্যনিরাপত্তার জন্য
কয়েক লাখ
টন চাল
আমদানি করতে
হয়। গম,
ডাল, ভোজ্যতেল,
মসলাদি উল্লেখযোগ্য
পরিমাণে আমদানি
করতে হয়।
যদিও খাদ্যনিরাপত্তা,
বৈদেশিক মুদ্রা
সাশ্রয় ও
অভ্যন্তরীণ কৃষিপণ্যের
জোগান বাড়াতে
দেশে এসব
কৃষিপণ্য উৎপাদনের
বিকল্প নেই।
আমদানির পর
সহনীয় মূল্য
বজায় রাখতে
দিতে হবে
কর রেয়াত।
শস্য উৎপাদন
ব্যবস্থা অব্যাহত
রাখার জন্য
কৃষি উপকরণ,
যেমন বীজ,
সার, সেচ
ব্যবস্থাপনা, যান্ত্রিক
চাষাবাদ ও
পরিবহনাদি নিরন্তর
কৃষকের হাতের
কাছে রাখতে
হবে। তাই
কৃষিবান্ধব সরকার
তাতে বরাবরের
মতো ভর্তুকি
দিচ্ছে এবং
আগামীতেও অব্যাহত
রাখবে সেটাই
প্রত্যাশা। ওই
সেবা কমলে
বা মূল্যবৃদ্ধিতে
মূল্যস্ফীতির সূচকে
উষ্ণ উল্লম্ফন
ঘটতে থাকবে।
উৎপাদন বৃদ্ধির
জন্য যেমন
চাই সঠিক
প্রযুক্তি আবার
তা ঠিক
রাখতে নদী
ও হাওরের
বাঁধ ভাঙন,
শস্য পরিবহনে
সড়ক ও
গ্রোথ সেন্টারের
অবকাঠামো উন্নয়নও
জরুরি। ফসলের
অপচয় রোধ,
মূল্য সংযোজনের
মাধ্যমে আয়
বৃদ্ধির জন্য
তৃণমূল পর্যায়ে
আনুষঙ্গিক সুবিধা
বৃদ্ধি প্রয়োজন।
এসব সুবিধা
ঠিকমতো কার্যকর
হলে তা
পরোক্ষভাবে কৃষিপণ্য
উৎপাদন থেকে
ভোক্তার হাত
পর্যন্ত সম্প্রসারণ
ঘটায়।
প্রাকৃতিক সম্পদ,
ভূমির মতো
সীমিত পানিসম্পদ
সুরক্ষার জন্য
সেচ সুবিধা
ও ভূ-উপরিস্থ
পানির সর্বোত্তম
ব্যবহার নিশ্চিত
করতে ভূগর্ভস্থ
সেচের পানির
ব্যবহার কমিয়ে
পানি সংরক্ষণের
উদ্যোগ ও
তাতে বরাদ্দ
থাকা জরুরি।
খোরপোশের কৃষি
এখন বাণিজ্যিক
কৃষিতে রূপান্তর
ঘটেছে। অনেক
স্মার্ট হয়েছে।
তবে বৈশ্বিক
মানে পৌঁছতে
এখনো অনেক
পথ বাকি।
এখন চাষাবাদ
থেকে ফসল
তোলা, বিশেষায়িত
পরিবহনে একেক
ধরনের যন্ত্র
ও জনবলের
প্রয়োজন। এসব
প্রক্রিয়া চলমান
থাকলে উৎপাদিত
পণ্য ভোক্তার
নাগালে নির্বিঘ্নে
পৌঁছতে পারবে।
যান্ত্রিক চাষাবাদ
সময় ও
ব্যয়সাশ্রয়ী। কৃষিপণ্য
প্রক্রিয়াজাত ও
পরিবহনকালে বেশ
একটা অংশ
নষ্ট হয়।
যত তৃণমূলে
পণ্যের মূল্য
সংযোজন করা
যাবে, এর
ইতিবাচক প্রভাব
উৎপাদকের ওপর
পড়বে। ভর্তুকি
দেয়া যন্ত্র
আমদানিতে শুল্ক
ছাড় রয়েছে।
সঙ্গে রয়েছে
এআইটি ও
অ্যাডভান্স ট্রেড
ভ্যাট। এছাড়া
যন্ত্র বিক্রির
ওপর ভ্যাট
রয়েছে। ফলে
একটি যন্ত্র
আমদানিতে দুবার
ভ্যাট দিতে
হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলোকে।
এর ওপর
বাধা হয়ে
দাঁড়িয়েছে টাকার
বিপরীতে ডলারের
মূল্যবৃদ্ধি। এতে
প্রায় ১০
শতাংশ বেশি
দামে যন্ত্র
আমদানি করতে
হচ্ছে। এরই
মধ্যে ফ্রেইট
চার্জ বেড়েছে।
কৃষি খাতের
যন্ত্র আমদানিতে
৩০ শতাংশ
করপোরেট ট্যাক্স
দিতে হয়,
যা যন্ত্রের
মূল্যবৃদ্ধিতে প্রভাব
পড়ে। অথচ
মত্স্য ও
প্রাণিসম্পদ খাতে
কিছু ক্ষেত্রে
এ হার
৩-৫
শতাংশ। কৃষিযন্ত্র
আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে
সমহারের মধ্যে
আনা প্রয়োজন।
গ্রাম পর্যায়ে
পাঁচ লাখের
অধিক মেকানিক,
যন্ত্রচালক এবং
তাদের সঙ্গে
সংযুক্ত হাজার
হাজার ওয়ার্কশপ
কর্মী রয়েছেন।
আধুনিক দক্ষ
ও লাভজনক
কৃষির জন্য
তাদের যথাযথ
প্রশিক্ষণ ও
ক্ষেত্রভেদে পুঁজি
সহায়তা দেয়া
দরকার। ট্রাক্টর,
কম্বাইন হারভেস্টার,
রাইস ট্রান্সপ্লান্টার,
রিপার ও
বিশেষায়িত পরিবহনের
মতো ভারী
যন্ত্রপাতির জন্য
কৃষকের জন্য
এখনো সরাসরি
ব্যাংকঋণ সুবিধা
নেই। কৃষিযন্ত্রের
ব্যবহার বাড়াতে
বড় ও
মাঝারি কৃষকের
১০-১৫
লাখ টাকার
ঋণ নেয়ার
প্রয়োজন রয়েছে।
কৃষি যন্ত্রপাতি
ব্যবহারের সুবিধা
মাঠ পর্যায়ে
সম্প্রসারণ করতে
হলে এর
আমদানি, সংযোজন,
নির্মাণ, বিপণন
বা ক্রয়ে
ঋণ সুবিধা
ও কর
অবকাশ বাজেটে
রাখতে হবে।
প্রসঙ্গত, বেসরকারি
বীজ ও
কৃষি প্রক্রিয়াকরণ
শিল্পগুলোর প্রসারেও
তা ভাবা
দরকার।
কৃষি উৎপাদন,
বিপণন, উন্নয়নের
চাবি বেসরকারি
সংস্থার হাতে।
কাজেই কৃষক
কী, কতখানি
করবেন তা
নির্ভর করে
তার দেখা
বাজার ওঠানামার
ধারণা থেকে।
কৃষিতে বেসরকারি
খাতকে আরো
সম্পৃক্ত করতে
বাজেটে সুনির্দিষ্ট
পরিকল্পনা ও
বরাদ্দ থাকতে
হবে। দেশের
তরুণদের মধ্যে
উদ্যোক্তা তৈরি
করতে বাজেটে
বিশেষ বরাদ্দ
প্রয়োজন। কৃষি
উদ্যোক্তা ফাউন্ডেশনের
মাধ্যমে দেশের
লাখ লাখ
নবীনকে কৃষি
খাতে আনা
দরকার।
বর্ণিত উৎপাদন
ব্যবস্থার জন্য
কৃষিতে বিনিয়োগ
বৃদ্ধিতে সরকারি
পর্যায়ে বাজেটে
বরাদ্দ রাখতে
হবে। এর
জন্য প্রণোদনা
ও ভর্তুকি
না পেলে
অঙ্কুরেই বিনষ্ট
হবে কৃষিতে
প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা।
কৃষিতে দিন
দিন আধুনিক
প্রযুক্তি যোগ
হচ্ছে, তা
মাঠ পর্যায়ে
সম্প্রসারণ করতে
হলে হাতে-কলমে
প্রশিক্ষণ ও
গণমাধ্যমে প্রচারের
সুবিধা বাড়াতে
হবে। গবেষণা
ও শিক্ষার
বিনিয়োগ বাড়াতে
হবে। সামনে
চতুর্থ কৃষি
ও শিল্প
বিপ্লবের তাগিদে
সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার
চাই শিক্ষার
মানোন্নয়নে।
হতদরিদ্রদের জন্য
সরকারের আবাসন
ভূমিতে সবজি
ও ফল
উৎপাদনের পরিকল্পনা
ও প্রশিক্ষণ
এবং ইউনিয়ন
পর্যায়ে নার্সারি
থেকে মানসম্পন্ন
বীজ ও
চারার জোগান
দেয়ার ব্যবস্থা
করা গেলে
গ্রামীণ জনগণের
পুষ্টি চাহিদা
ও আয়বর্ধনের
সম্ভাবনা বাড়তে
পারে।
ডলারের মূল্যবৃদ্ধির
কারণে গ্যাস,
বিদ্যুৎ-জ্বালানি,
সার কিংবা
পানির দাম
বাড়ালে মানুষের
জীবন অতিষ্ঠ
হয়ে উঠবে,
কৃষি উন্নয়নে
বড় ধরনের
নেতিবাচক প্রভাব
পড়তে পারে।
পরিশেষে জানানো
যায়, যারা
বাজেটে কৃষির
অংশ নিয়ে
ভাবেন, তাদের
অনেকের মতে,
বাজেটে কৃষি
খাতের অংশ
ক্রমেই সংকুচিত
হচ্ছে। সার্বিক
কৃষি খাতে
মোট বাজেটের
বরাদ্দ আগের
এক-তৃতীয়াংশের
চেয়ে বর্তমানে
কমে তা
এক অংকের
ঘরে নেমে
এসেছে। জিডিপি
বৃদ্ধির অনুপাতে
বাড়েনি কৃষিতে
ভর্তুকির হার।
এতে কৃষকের
আর্থিক অবস্থার
পরিবর্তন হয়েছে
সামান্যই। টেকসই
কৃষির উন্নয়নে
বরাদ্দ প্রদানে
আরো বিচক্ষণ
ও দূরদর্শী
হতে হবে,
যার অভাবে
কোনো কোনো
দেশের সার্বিক
খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির
মুখে পড়েছে।
সেসব বিবেচনায়
একটি শক্তিশালী
কৃষি কমিশন
গঠন অতিজরুরি।
আবু হেনা
ইকবাল আহমেদ: কৃষিবিদ
ও সাবেক
পরিচালক
বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি, কৃষি মন্ত্রণালয়










