করোনার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ থেকে আকাশপথে বিদেশগামী সব যাত্রীর জন্য কভিড পরীক্ষার সনদ এখন বাধ্যতামূলক। এজন্য সরকারি-বেসরকারি শতাধিক হাসপাতাল ও ল্যাব নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। সরকারি নির্দেশনা অনুসারে কেবল অনুমোদিত হাসপাতাল ও ল্যাবের সনদই বিদেশে যাওয়ার জন্য ব্যবহার করা যায়। কিন্তু নির্ধারিত এসব ল্যাব-হাসপাতালে পরীক্ষার জন্য দেয়া যাত্রীদের তথ্য পাচার হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব তথ্য ব্যবহার করে ভয়ভীতি দেখিয়ে একটি চক্র বড় অংকের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। সম্প্রতি চট্টগ্রামে এ ধরনের কয়েকটি ঘটনার খবর মিলেছে। এতে বিদেশগামী যাত্রীসহ সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল ও ল্যাবগুলো উদ্বিগ্ন। এর প্রতিকার জরুরি। কাজেই দায়ীদের চিহ্নিতপূর্বক দ্রুত আইনের আওতায় আনতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সক্রিয়তা কাম্য।
চলমান মহামারীর শুরু থেকেই আমাদের স্বাস্থ্য খাত নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে জর্জরিত। এন-৯৫ মাস্ক ও পিপিই কেলেঙ্কারি, করোনার নমুনা পরীক্ষায় জালিয়াতি, বেসরকারি হাসপাতালে উচ্চ বিল আদায় প্রভৃতি অনিয়ম দেশে-বিদেশে আলোচিত হয়। মাঝে অর্থের বিনিময়ে বিদেশগামী যাত্রীদের ভুয়া করোনা নেগেটিভ সনদ দেয়া শুরু করে কিছু স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান। তাতে সৌদি আরব, দক্ষিণ কোরিয়া, দুবাই, ইতালি, যুক্তরাজ্যসহ গোটা বিশ্বে ‘অবিশ্বস্ত’ হয়ে পড়েছিল বাংলাদেশ। এর জের ধরে কিছু দেশ বাংলাদেশের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছিল। পরে প্রতিষ্ঠানগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সেখান থেকে করোনা পরীক্ষার সুযোগ প্রত্যাহার করা হয়। একই সঙ্গে বিদেশগামী যাত্রীদের কভিড পরীক্ষার জন্য নিবেদিত হাসপাতাল ও ল্যাব নির্ধারণ করে দেয়। বর্তমানে এভাবেই চলছে বিদেশযাত্রা। কিন্তু সম্প্রতি নির্ধারিত হাসপাতাল-ল্যাবে দেয়া বিদেশযাত্রীদের তথ্য ব্যবহার করে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে একটি চক্রের বিরুদ্ধে। কভিড নেগেটিভ সনদ দেয়ার নামে তারা যাত্রীদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। মূলত এ ধরনের প্রতারণা সম্ভব হচ্ছে ডিজি হেলথের ওয়েবসাইটের নিরাপত্তাজনিত দুর্বলতায়। সাধারণত সুনির্দিষ্ট ইউজারনেম ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে হাসপাতাল-ল্যাবগুলো ওই ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে। তবে প্রবেশের পর নিজেদের তথ্য আপলোডের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলার বিদেশগামী যাত্রীদের কভিড পরীক্ষার সব তথ্য দেখার সুযোগ পায় তারা। এমনকি কোথায় কোন ল্যাবে কোন যাত্রী নমুনা পরীক্ষা করতে দিয়েছেন, তা দেশের যেকোনো প্রান্তে বসে দেখা যায়। কারিগরি দিক থেকে এটা বড় দুর্বলতা। ফলে প্রতারণার সুযোগ থেকে যাচ্ছে বৈকি।
কভিড-১৯ মহামারী একটি বৈশ্বিক বাস্তবতা। সবখানেই নিয়মিতভাবে কভিড পরীক্ষা থেকে শুরু করে টিকাদানের হালনাগাদ তথ্য সুসমন্বিতভাবে কেন্দ্রীয় সার্ভারে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, চীন, জাপান, ভারতসহ প্রতিটি দেশের ক্ষেত্রেই এটা প্রযোজ্য। ওই সব দেশে শুধু সংশ্লিষ্ট অনুমোদিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের তথ্য আপলোডের সুযোগ আছে। কিন্তু আপলোডের ক্ষমতা থাকলেও তাদের অন্য ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা অঞ্চলভিত্তিক তথ্য দেখার সুযোগ অবশ্য নেই। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও তথ্য সুরক্ষার জন্যই মূলত এটা নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে এখনো অন্য দেশগুলোয় কভিড-সংক্রান্ত তথ্য বেহাত ও অপব্যবহারের খবর তেমন একটা মেলেনি। সুতরাং বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।
বিদেশযাত্রীদের তথ্য যেভাবে বেহাত এবং অপব্যবহার হচ্ছে তা উদ্বেগজনক। একই সঙ্গে এটি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের শামিল। সুতরাং বিষয়টিকে গভীরভাবে আমলে নিতে হবে। এর জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। সম্প্রতি চট্টগ্রামের শেভরন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের করা একটি সাধারণ ডায়েরির সূত্রে জানা যাচ্ছে, প্রতারণায় ব্যবহূত মোবাইল নম্বরগুলো পাবনা, সিলেট, নোয়াখালীতে ব্যবহূত হচ্ছে। তার মানে সার্ভারের তথ্য সব প্রান্তে দৃশ্যমান হওয়ায় প্রতারক চক্র এর সুযোগ নিচ্ছে। কাজেই এ ধরনের প্রতারণা রোধে অন্য ল্যাবের তথ্য প্রদর্শনের সুযোগটি বন্ধ করে দেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এটা আমলে নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিদ্যমান অবস্থায় বিদেশগামী যাত্রীদের নমুনা পরীক্ষার দায়িত্ব পাওয়া শতাধিক সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ল্যাব ছাড়া অন্যদের সার্ভারে প্রবেশ এবং তথ্য দেখার সুযোগ নেই। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল-ল্যাবের সঙ্গে জড়িত কেউ এসব তথ্য অসাধু উপায়ে ব্যবহার করছে কিনা, এর সঙ্গে তাদের কোনো যোগসাজশ আছে কিনা, সেটি খতিয়ে দেখতে হবে। সেজন্য হাসপাতালগুলোয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নজরদারি বাড়াতে হবে। সেখানে কোনো ধরনের অনিয়ম হচ্ছে কিনা, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে কর্তৃপক্ষকেও নিজস্ব নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। না হলে প্রতারণা ঠেকানো কঠিন।
বিশ্বে কভিড পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। ধীরে ধীরে বৈদেশিক শ্রমবাজারগুলো খুলছে। করোনায় দেশে ফেরত আসা কর্মীরা বাইরে যাচ্ছে। নতুনভাবেও অনেকেই যাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে গন্তব্য দেশে যেতে তারা কভিড পরীক্ষা করছেন এবং তা করছেন নির্ধারিত ল্যাব-হাসপাতালেই। সেখান থেকে তথ্য পাচারপূর্বক কভিড নেগেটিভ সনদ দেয়ার নামে তাদের যেভাবে প্রতারণা করা হচ্ছে, তা দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। এতে তারা আর্থিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছেন। এভাবে আর চলতে পারে না। সুতরাং এ ধরনের প্রতারণা সর্বতোভাবে প্রতিহত করতে স্বাস্থ্য বিভাগ কঠোর ব্যবস্থা নেবে, এটিই প্রত্যাশা।










