ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাব দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে পড়তে শুরু করেছে। এরই মধ্যে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পোশাক রফতানি কমে গেছে, অনেক দেশের সঙ্গে ব্যাংক লেনদেনও বন্ধ রয়েছে, বেড়ে গেছে জাহাজ ভাড়া। ফলে ব্যবসায় সৃষ্ট ক্ষতি দেখিয়ে অন্তত ৯৩টি গার্মেন্টস ফেব্রুয়ারির বেতন-ভাতা মার্চেও পরিশোধ করতে পারবে না বলে বাংলাদেশ পুলিশের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সদস্য। রফতানি কমে যাওয়া, ক্রয়াদেশ বাতিল, কাজের অর্ডার কমে যাওয়া, মূলধনস্বল্পতা, ঋণ ও প্রণোদনা না পাওয়াসহ বিভিন্ন অজুহাতে প্রতি মাসে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করে না কিছু কারখানা। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এক মাস পরই ঈদ। স্বাভাবিক সময়েই ঈদে তৈরি পোশাক শিল্পে বেতন-ভাতা পরিশোধ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। শ্রমিক অসন্তোষও এ সময় বেড়ে ওঠে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে গার্মেন্টস খাতের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সংকট আরো বাড়বে। এক্ষেত্রে তৈরি পোশাক শিল্প যেন সঠিক সময়ে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা প্রদান করতে পারে সে বিষয়ে সরকারের দ্রুত উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। বিজিএমইএ বিষয়টি তদারক ও সঠিক তথ্য পেতে সহায়তা জোগাতে পারে।

বাংলাদেশে মোট রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে পোশাক খাত থেকে। সে সুবাদে দ্বিতীয় প্রধান রফতানিকারক দেশের মর্যাদা বাংলাদেশের। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দুই কোটি মানুষ এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। গুরুত্বপূর্ণ এ অবদান সত্ত্বেও পোশাক শিল্পকে সুরক্ষা দেয়া সম্ভব হয়নি। এ খাতের ওপর বারবার আঘাত এসেছে। এর পরও অনেক চড়াই-উতরাই অতিক্রম করে কয়েক দশকের পথপরিক্রমায় দেশের তৈরি পোশাক শিল্প আজকের এ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের তৈরি পোশাক রফতানি করে বাংলাদেশ প্রচুর বৈদেশিক অর্থ আয় করছে। যেকোনো দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা নিঃসন্দেহে সে দেশের শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। তাই নিশ্চিত করতে হবে শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা, বেতনের নিশ্চয়তা। দেশের বর্তমান দুর্যোগময় করোনা পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের সামাজিক অসন্তোষ দেখতে চাই না। পোশাক শ্রমিকদের গত মাসের বেতন-ভাতা দেয়ার বিষয়টি যত দ্রুত সম্ভব নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারকে বিশেষভাবে উদ্যোগী হতে হবে এবং এক্ষেত্রে যেসব সমস্যা আছে, তা দূর করতে হবে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার দিক থেকেও তারা শীর্ষস্থানে। অন্যদিকে একে সবচেয়ে সমস্যাগ্রস্ত খাতও বলা চলে। শ্রমিক অসন্তোষ, বিশেষ করে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও বোনাস পরিশোধসংক্রান্ত জটিলতা লেগেই আছে। আগের তুলনায় সমস্যা কিছুটা কমলেও এখনো বিশেষ করে দুই ঈদের আগে শ্রমিকদের রাস্তায় নেমে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করতে দেখা যায়। এমনিতেই নানা অব্যবস্থার কারণে আমাদের পোশাক শিল্প এখনো বড় ধরনের ইমেজ সংকটে রয়েছে। দেশের ও শিল্পের স্বার্থেই এ সংকট কাটিয়ে ওঠা জরুরি।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বড় বাজার ইইউ, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও যুক্তরাজ্য। সে তুলনায় ইউক্রেনে পোশাক রফতানির পরিমাণ খুবই কম। তবে রাশিয়ার বাজার মাঝারি আকারের। যুদ্ধের কারণে দুই বাজারেই রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টার ব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন (সুইফট) থেকে রাশিয়াকে বাদ দিলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশের পোশাক খাতের রফতানিকারকরা। এতে লেটার অব ক্রেডিট-এলসিতে পেমেন্ট করতে অসুবিধা হবে। বাংলাদেশে উৎপাদিত তৈরি পোশাকের ৩ শতাংশের ক্রেতা পোল্যান্ডের বিভিন্ন কোম্পানি। এছাড়া শীর্ষ বায়ারদের মধ্যে ইঅ্যান্ডএইচ গ্রুপ; যাদের প্রধান ক্রেতা রাশিয়া। যুদ্ধের ডামাডোলে অন্তত ৫ শতাংশ অর্ডার স্থগিত করেছে এসব বায়ার। এছাড়া ইউরোপ, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যে বেড়েছে মুদ্রাস্ফীতি। এতে আরো অন্তত ৩৭ শতাংশ বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা। শিল্পটি মূলত নগদপ্রবাহ বা ‘ক্যাশ-ফ্লো’ নির্ভর। নিশ্চিত কার্যাদেশের বিপরীতে বিভিন্ন ঋণ নিয়ে ব্যবসায়িক কাজ পরিচালনা করে উদ্যোক্তারা। তাই অর্থ পরিশোধে দেরি, অযাচিত ডিসকাউন্ট বা ক্রয়াদেশ বাতিল হলে কারখানার নগদপ্রবাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। আর এটি দীর্ঘায়িত হলে অনেক কারখানা বন্ধ বা রুগ্ণ হয়ে যেতে পারে। এ পরিস্থিতিতে গার্মেন্ট পণ্য রফতানি স্বাভাবিক রাখতে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

সরকার, মালিক ও শ্রমিকদের নিয়ে ত্রিপক্ষীয় সভা জরুরি ভিত্তিতে ডাকা দরকার। সংশ্লিষ্টরা আন্তরিক হলে সব পক্ষের বৈধ স্বার্থ নিশ্চিত করেই উদ্ভূত সমস্যার একটা বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে পাওয়া সম্ভব। বিদ্যমান আইন তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের উৎসব ভাতা পাওয়ার ক্ষেত্রে খুব সুরক্ষা দেয়নি। তাদের হুটহাট চাকরি চলে গেলেও ২০১৫ সালে চালু করা বিধান বলেছে, উৎসব ভাতার অধিকারীদের চাকরি হতে হবে কমপক্ষে ‘নিরবচ্ছিন্ন এক বছর’। পরবর্তী মাসের সাত কার্যদিবসের মধ্যে বেতন দিতে হবে। গত বছর কিছু কারখানার মালিক শেষ মুহূর্তে কারখানা বন্ধ করে নিরুদ্দেশ হন। ঈদের পর তারা বেতন-ভাতা শোধ করে কারখানা চালু করেন। এর পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিবেদনটিতে বেশকিছু সুপারিশও রয়েছে। এর মধ্যে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়ম অনুযায়ী পরিশোধ, বিদেশী ক্রয়াদেশ পাওয়ার ক্ষেত্রে অসুস্থ প্রতিযোগিতা পরিহার, শ্রমিক ছাঁটাই ও কারখানা বন্ধ রোধে রুগ্ণ কারখানা চিহ্নিতপূর্বক তাদের সমস্যা সমাধানে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান উল্লেখযোগ্য। শ্রম মন্ত্রণালয়, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ সুপারিশগুলো আমলে নিয়ে আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করবে বলে প্রত্যাশা। এক্ষেত্রে শ্রমিকরা যেন তাদের বেতন-বোনাস ও অন্যান্য ভাতা সঠিকভাবে ও সময়মতো পান, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে নজরদারিও বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কারখানাগুলোকে কীভাবে সহায়তা করা যায়, তার একটি পরিকল্পনাও থাকা আবশ্যক। শ্রমিক অসন্তোষের আগাম তথ্য পাওয়া গেলে দ্রুতই তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পদক্ষেপ নিতে হবে।

শ্রমিকদের সুরক্ষার বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে যখন শিল্প সংকটে পড়ে, তখন শিল্পের সঙ্গে জড়িত লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকা সুরক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর ৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ তহবিলের ফলে করোনার সময়ে শ্রমিকরা যথাসময়ে ঝুঁকিপূর্ণ মাসগুলোতে বেতন পেয়েছেন, শিল্প সুরক্ষিত হয়েছে। আগামী দিনে শ্রমিক ও শিল্প উভয়ের স্বার্থ বিবেচনা করে সংকটের সময়ে শ্রমিকের জন্য বিশেষ আর্থিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা এবং তাদের স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এ অবস্থায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কারখানা পুনর্বাসন, ক্রেতা দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার প্রভাব থেকে কারখানাকে আইনি সুরক্ষা প্রদান এবং শিল্পের জন্য একটি নিরাপদ প্রস্থান নীতিমালা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ঈদের সময়ে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়ে কোনো জটিলতা যেন তৈরি না হয়, সে বিষয়ে এখন থেকেই সতর্ক থাকতে হবে। যেসব তৈরি পোশাক কারখানা বেতন-ভাতা দিতে অপারগ হয়ে পড়েছে তাদের সহায়তার জন্য আলাদা ফান্ড গঠন করে সহায়তা জোগানো যেতে পারে। প্রত্যাশা থাকবে পুলিশের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করে সরকার-মালিকপক্ষ ও মালিকদের সংগঠনগুলো দ্রুতই পদক্ষেপ নেবে, যাতে উদ্ভূত সমস্যার দ্রুতই একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান মেলে।