সোমবার অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী হাওরসহ সব নিচু এলাকায় আর সড়ক নয়, প্রয়োজনে উড়াল সেতু নির্মাণের নির্দেশনা দিয়েছেন। নিচু এলাকায় নির্মিত সড়ক পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। এতে বন্যা থেকে শুরু করে নানা বিপত্তি দেখা দেয় এবং হাওরের প্রাকৃতিক পরিবেশও বিনষ্ট করে বলে একাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে। এমন প্রেক্ষাপটে হাওরে সড়ক নির্মাণ বন্ধের নির্দেশনাকে স্বাগত জানাতে হবে। একই সঙ্গে উড়াল সড়কের মাধ্যমে হাওরের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করার প্রক্রিয়া নিয়েও সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। অবকাঠামো নির্মাণে যেন হাওরের স্বাভাবিক প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও দৃষ্টি রাখতে হবে।
হাওর বাংলাদেশের একটি অনন্য ভূ-প্রাকৃতিক জলাভূমি। নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ভূমি নিয়ে হাওর জলাভূমি গঠিত। ওই এলাকায় বসবাসকারী মানুষের যোগাযোগের মাধ্যম হলো বর্ষায় নৌকা এবং শুকনো মৌসুমে পায়ে হাঁটা পথ। এক্ষেত্রে হাওরে অবকাঠামো নির্মাণপূর্বক এর সৌন্দর্য বা প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনষ্ট না করে নদীকেন্দ্রিক শক্তিশালী যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। উন্নয়নের অন্যতম উদ্দেশ্য হওয়া উচিত প্রকৃতিতে যতটা সম্ভব হস্তক্ষেপ না করা। যখন প্রতিটি জনপদ সড়ক দিয়ে সংযুক্ত করা হয় তখন হাওর খণ্ড-বিখণ্ড আবদ্ধ জলাশয়ে পরিণত হয়, যার পানি সহজে নেমে যায় না; বরং ফি বছর বেড়ে গিয়ে মারাত্মক বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। সৃষ্টি হয় মানবিক বিপর্যয়। বিপুল ক্ষতি হয় মত্স্য সম্পদের। সড়ক নির্মাণ হলে প্রথমে ছোট মাছ ও প্রাণী আক্রান্ত হবে এবং পর্যায়ক্রমে বিলুপ্ত হবে। পরে বড় মাছ ও প্রাণী বিলুপ্ত হবে। উড়াল সড়কে এ ক্ষতি কিছুটা কম হলেও পরিপূর্ণ ক্ষতি এড়ানো যাবে না। পিলার নির্মাণের ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে। এতে মাছের চলাচলও বিঘ্নিত হবে। উদাহরণস্বরূপ হাওরের চিংড়ি মাছের কথা বলা যেতে পারে। এই মাছ কম স্রোতের পানিতে চলাচল করে, প্রতি বছর একটি অঞ্চলে ডিম দিয়ে বংশবৃদ্ধি করে। চিংড়ির বংশবৃদ্ধি করা রাস্তায় বা জায়গায় সড়ক হলে বা পিলার অথবা সড়ক বাঁধের মতো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে তাদের বংশবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অভিযোজন করতে না পারলে পর্যায়ক্রমে বিলুপ্ত হবে। জলজ প্রাণীরা বংশবৃদ্ধি না করতে পারলে বিলুপ্ত হতে শুরু করবে; নষ্ট হবে বায়োডাইভারসিটি। পর্যায়ক্রমে একটির পর একটি প্রজাতি বিলুপ্ত হতে শুরু করবে। এ প্রক্রিয়ায় হাওর মত্স্যশূন্য জলাভূমিতে পরিণত হবে। উড়াল সড়ক নির্মাণ হলে দুই পাশের পর্যটন এলাকাকে ঘিরে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে থাকার জন্য নির্মিত হবে অনেক হোটেল-মোটেল। হাওরের বুকে ঘুরে বেড়ানোর জন্য তৈরি হবে নানা আকৃতি ও প্রকৃতির রঙ-বেরঙের নৌকা, স্পিডবোটসহ নানা ধরনের আকর্ষণীয় জলযান। এতে বায়ু ও শব্দদূষণের কবলে পড়বে হাওরের প্রকৃতি।
পৃথিবীর আর কোথাও এমন স্বাদু পানির জলাভূমি ও হাওর পাওয়া যায় না। ভারতের মেঘালয় পাহাড়পুঞ্জের ওপর সংঘটিত প্রায় সব বৃষ্টিপাতের ড্রেনেজ পথ হলো এই হাওর। বিভিন্ন ছোট-বড় ছড়া ও নদী দিয়ে পাহাড়ি অঞ্চলের সব পানি হাওরের ভূমিতে নেমে আসে। তারপর মাস ছয়েক হাওরে অবস্থান করে বিভিন্ন নদী দিয়ে (প্রধানত মেঘনা নদী) বঙ্গোপসাগরে চলে যায়। হাওরের মূলত দুটি অংশ। একটি মূল জলাশয়, যার পানি বছরের সবসময় থাকে। টাঙ্গুয়ার হাওরে বা হাকালুকি হাওরে শুষ্ক মৌসুমে (শীতকালে) এ জলাশয় দেখা যায়। দ্বিতীয় অংশটি হলো ছয় মাস পানির নিচে থাকে, অর্থাৎ বছরের ছয় মাস শুকনো থাকে। মূলত এ জমিগুলো কৃষিজমি। বছরের ছয় মাস এখানে ধান, পাটসহ বিভিন্ন কৃষি ফসল উৎপাদন করেন কৃষকরা। বৃষ্টিপাতের মৌসুমের তারতম্য হলেই এ কৃষি বিপর্যস্ত বা নষ্ট হয়ে যায়। বর্ষা মৌসুমে গভীর হাওরে অবস্থিত বিভিন্ন গ্রাম ভাসমান জনপদে পরিণত হয়। নৌযান ছাড়া চলাচলের কোনো উপায় থাকে না। এক্ষেত্রে পানিভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন করা যায় কিনা, তা খতিয়ে দেখা যেতে পারে। দেশের কৃষি ও মত্স্য অর্থনীতি, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষা, নৌ-যোগাযোগসহ বিভিন্ন দিক থেকে আগের মতো হাওরের জেলাগুলো অবদান রাখতে পারছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপরিকল্পিত উন্নয়ন হাওরের প্রকৃত চরিত্র নষ্ট করছে। হাওর ধ্বংসে প্রকৃতি আর মানুষে মিলে দুই ধরনের প্রতিযোগিতা চলে বছরজুড়ে। অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টির ফলে তাপমাত্রার পরিবর্তন, পলির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় বিরূপ প্রভাব পড়ছে পুরো এলাকায়। এছাড়া মানুষের দখল-দূষণ, অবাধে পশু-পাখি-মত্স্য শিকার, গাছ কাটা, জীববৈচিত্র্য নষ্ট করা, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, ইচ্ছেমতো উন্নয়ন, হাওর ও নদীর খনন না করা, ইজারা প্রথা, মাছের অভয়ারণ্য নির্ধারণ করে তদারক না করাসহ নানা কারণে বদলে যাচ্ছে হাওরগুলোর পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য। অনেকেই বলেন, এখন হাওরে আর আগের মতো উত্তাল ঢেউ ওঠে না। পানির গভীরতা কমছে দিন দিন। সমুদ্রের মতো বিশাল নীল জলরাশি দেখা এখন অনেকটাই ভাগ্যের ব্যাপার। অর্থাৎ এরই মধ্যে বিরূপ প্রভাব স্পষ্ট। অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে এসব বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে।
সরকার এরই মধ্যে হাওর এলাকায় পাঁচটি উড়াল সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এতে ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হবে বলে জানা গেছে। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, এতে হাওরের ইকোলজি ঠিক থাকবে, পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে না। ফলে কৃষিকাজ বন্ধ হবে না। জলজ প্রাণী ও মাছের প্রজনন এলাকা বিনষ্ট হবে না এবং প্রজাতি বিলুপ্ত হবে না। হাওরে স্বাস্থ্যকর বায়োডাইভারসিটি বজায় থাকবে। প্রাকৃতিক মত্স্য সম্পদের বৃহত্তর উৎস এ হাওর টিকে থাকবে এবং ধান ও মাছ সরবরাহ করে দেশের খাদ্য সমস্যা দূরীকরণে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে। আভুরা সড়কের চেয়ে রক্ষণাবেক্ষণের খরচ অনেক কম হবে ফ্লাইওভারে। নৌ-চলাচলে বাধা সৃষ্টি করবে না। হাওর টিকে থাকবে কিন্তু জনগণের যোগাযোগ উন্নত হবে। একথা অস্বীকার করা যাবে না সত্য। তবে প্রকৃতিতে কৃত্রিম কোনো অবকাঠামো নির্মাণ করা হলে তার প্রভাব পড়বেই। এমনিতেই হাওরের জলজ ও প্রাণী হুমকির সম্মুখীন। অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে সেটি যেন আরো ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপন্ন না হয়ে পড়ে, সেজন্য বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন এবং প্রকল্প গ্রহণের আগে আরো যাচাই-বাছাই করে দেখা প্রয়োজন। ভুললে চলবে না, বিশ্বের অন্য কোনো দেশে বাংলাদেশের মতো হাওর নেই। ফলে তাদের অভিজ্ঞতা এক্ষেত্রে কাজ করবে না। সবচেয়ে ভালো হয়, হাওর এলাকার মানুষের মতামত এবং বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা ও পর্যবেক্ষণপূর্বক প্রকল্প গ্রহণ করলে। শুধু আকর্ষণের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা হলে হাওরের ক্ষতিই বাড়বে।
সাম্প্রতিক সময়ে এসে নদীতে বাঁধ ও কর্ডন নির্মাণ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো কর্ডন ভেঙে ফেলে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিতে পদক্ষেপ নিচ্ছে। বলা হচ্ছে, প্রকৃতিতে হস্তক্ষেপ করা যাবে না। হাওরে উড়াল সড়ক নির্মাণেও এর প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনষ্ট হবে। হাওরের উন্নয়ন সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য স্থানীয় জনসাধারণের সঙ্গে মতবিনিময়, সভা, সেমিনার করে, জরিপ চালিয়ে এলাকাভিত্তিক জনশক্তি ও কর্মসংস্থান, প্রকৃতির ধরন, অবকাঠামোর বৈশিষ্ট্য নিরূপণ সাপেক্ষে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিতে হবে। হাওর উন্নয়ন বোর্ডকে প্রশাসনিক, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে হবে। হাওরাঞ্চল বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র আশ্রয়স্থল। সেজন্য হাওরের পরিবেশ যাতে কোনো কারণে হুমকির মুখে না পড়ে, সেদিকে নজর দেয়া অত্যন্ত জরুরি। মূলত হাওরের বেঁচে থাকার ওপর লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভর করছে। এজন্য হাওরের প্রকৃতি-পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় মানুষকে সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহলকেও হাওরের পরিবেশ রক্ষায় মনোযোগী হতে হবে।










