গত কয়েক দশকে দেশে ব্যাপক মাত্রায় শহরমুখী অভিগমন বেড়েছে। নানা প্রয়োজনে মানুষ স্থানান্তর হচ্ছে নগরে। তথ্য বলছে, দেশের মোট জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার যেখানে ১ দশমিক ৪ শতাংশ, সেখানে শহরের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ২ দশমিক ৫ শতাংশ। জনসংখ্যার চাপে শহরগুলো ক্রমেই বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে, বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে জনস্বাস্থ্য। বাড়ছে অসংক্রামক রোগসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি। নগরে এটিই অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি মোকাবেলায় বিশেষজ্ঞরা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার উন্নয়ন, মানসম্মত আবাসন ও জনপরিসর বাড়ানোর কথা বলছেন। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে নগরমুখী জনস্রোত থামানোর পরামর্শ দিচ্ছেন। নগর স্বাস্থ্য নিয়ে আয়োজিত সাম্প্রতিক এক কর্মশালায় বক্তাদের ভাষ্যেও এর অনুরণন ঘটেছে। কাজেই বিষয়টি আমলে নিয়ে নগর কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।

আগে দেশের বেশির ভাগ মানুষ গ্রামে বাস করত। দ্রুতই এ দৃশ্যপট পাল্টে যাচ্ছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে শহরে ৪০ শতাংশ বাস করে। ক্রমেই বাড়বে এ হার। শহরে জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ার পেছনে বেশ কয়েকটি ফ্যাক্টর কাজ করছে। শিল্পায়নের সুবাদে গ্রামে কাজের সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত। শহর ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের রড় অংশ। এখানেই গড়ে উঠেছে বড় বড় শিল্প-কারখানা। গড়ে উঠছে প্রতিনিয়ত। ব্যক্তি খাতের অন্য সব প্রতিষ্ঠানও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নগরকেন্দ্রিক। ফলে শহরগুলো হয়ে উঠেছে আয় ও  কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস। সংগত কারণে মানুষ ভিড় করছে শহরে, থাকছে স্থায়ী-অস্থায়ীভাবে। দুঃখজনকভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সমান্তরালে বাড়ানো যাচ্ছে না নাগরিক সুযোগ-সুবিধা। বরং বিপরীতক্রমে আধুনিক নগর পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য অবকাঠামো হিসেবে বিবেচিত খেলার মাঠ-পার্ক-উদ্যান-জলাশয় ক্রমাগত কমছে। অল্পবিস্তর যেসব খেলার মাঠ কিংবা জলাশয় আছে, সেগুলো বেশির ভাগ দখল-দূষণের শিকার এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেখানে সাধারণের প্রবেশাধিকার সীমিত হচ্ছে। ছেলেমেয়েরা খেলার জায়গা পাচ্ছে না, তরুণ-বয়োবৃদ্ধরা হাঁটার জায়গা পাচ্ছে না। বস্তিতে, ছোট-ছোট ঘরে গাদাগাদি করে থাকছে মানুষ। পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা নেই। সব মিলিয়ে নগরবাসীর স্বাস্থ্য হুমকিতে রয়েছে।

শিল্পায়ন ও জোরালো নগরায়ণের ফলে বিশ্বের বহু দেশেই শহরে মানুষ বাড়ছে। ক্রমেই জনবহুল হয়ে উঠছে অনেক শহর। এ ধরনের শহরের মধ্যে রয়েছে চীনের গুয়াংজু, তিয়ানজিন, চংকিং, জাপানের ওসাকা, টোকিও, আর্জেন্টিনার বুয়েন্স আয়ার্স, ভারতের দিল্লি, মুম্বাই, কলকাতা, ফিলিপাইনের ম্যানিলা, তুরস্কের ইস্তানবুল, মিসরের কায়রো প্রভৃতি। প্রতিনিয়ত মানুষ বাড়লেও ওইসব শহরের নগর কর্তৃপক্ষ চাহিদা অনুপাতে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে চলেছে। পানি, স্যানিটেশন, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা ও মানসম্মত আবাসনের ব্যবস্থা করেছে। প্রবর্তন করেছে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। নগর বিন্যাসটা এমনভাবে ঢেলে সাজিয়েছে, যাতে স্বল্প জায়গায় বেশি মানুষের আবাসন নিশ্চিত করা যায়। পার্ক-মাঠ-জলাশয়, সবুজ পরিসর সযত্নে বাঁচিয়ে রেখেছে। নতুন করে জনপরিসর আরো কীভাবে বাড়ানো যায়, সেই চেষ্টা করছে নিয়ত। কাঙ্ক্ষিত জনসংখ্যা ও জনঘনত্ব নির্ধারণপূর্বক পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করেছে ওইসব শহরের কর্তৃপক্ষ। উল্লিখিত শহরগুলোর নগর পরিকল্পনা ও নীতি-নির্দেশনা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।

দেশে নগরগুলো এখনো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালক হিসেবে রয়ে গেছে। তাই সামনে নগরমুখী জনস্রোত আরো বাড়বে। ফলে নগরায়ণ আরো ত্বরান্বিত হবে। এটা মাথায় রাখতে হবে। সর্বাগ্রে নিশ্চিত করতে হবে নগরায়ণটা যেন পরিকল্পিতভাবে হয়। একটা নির্দিষ্ট সময়ে কত জনসংখ্যা ও জনঘনত্ব কত হতে পারে, কতখানি জনপরিসর ও সবুজ পরিসর রাখতে হবে, নগরের ভবন বিন্যাস কেমন হবে—প্রতিটি বিষয়ই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। সব দিক বিবেচনায় রেখে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আর বিদ্যমান শহরগুলোয় উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা ও মানসম্মত আবাসন নিশ্চিত করতে হবে। নগরে অনেক টারশিয়ারি স্বাস্থ্য থাকলেও প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই বললেই চলে। অথচ ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। এ ঘাটতি পূরণ করতে হবে। টারশিয়ারি চিকিৎসা কেন্দ্রে চাপ কমাতে পর্যাপ্ত ও মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে নগর কর্তৃপক্ষকে। সর্বোপরি বিদ্যমান জনপরিসরগুলো সংরক্ষণ করতে হবে।

প্রধানত আয়-উপার্জন ও উন্নত জীবনের আশায় মানুষ শহরমুখী হচ্ছে। সেজন্য বিচার, শিক্ষাসহ অন্য সুযোগ-সুবিধা বিকেন্দ্রীকরণ ঘটাতে হবে। সেগুলো শহরকেন্দ্রিক না রেখে অন্যত্র ছড়িয়ে দিতে হবে। সারা দেশে শিল্পায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। এলাকাভিত্তিক ছোট ছোট অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে, যাতে নিজের এলাকার মধ্যে মানুষের কর্মসংস্থান হয়। এরই মধ্যে অবশ্য সরকার দেশের বিভিন্ন জায়গায় ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল করার উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। এটি একটি সঠিক নির্দেশনার পদক্ষেপ। বিভিন্ন জায়গায় অর্থনৈতিক অঞ্চল করার গৃহীত উদ্যোগটি বাস্তবায়ন হলে বড় শহরগুলোর জনসংখ্যা একটা ব্যবস্থাপনাযোগ্য পর্যায়ে আসতে পারে। এতে ইতিবাচক সুফল মিলবে। বলতে গেলে, অভিগমনের অনুঘটকগুলোর সুষ্ঠু সমাধান করা হলে শহরের জনসংখ্যা একটা কাম্য পরিস্থিতিতে চলে আসবে। দীর্ঘমেয়াদে এটিই আমাদের পথ।

গুণগত মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা হাতের নাগালে পাওয়া মানুষের মৌলিক অধিকার। জনসংখ্যার প্রবল চাপে শহরে এ অধিকারপ্রাপ্তি অনেকাংশে ব্যাহত হচ্ছে। নগর পরিকল্পনায় ফ্লাইওভার, বড় বড় অবকাঠামো যতটা প্রাধান্য পাচ্ছে, তার তুলনায় উপেক্ষিত থাকছে নগর স্বাস্থ্য। নগর স্বাস্থ্যের উন্নতি না হলে মানুষের উৎপাদনশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। দিন দিন শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য নানা ঝুঁকি তৈরি হবে। হচ্ছেও বটে। কাজেই পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত ও সেবা ব্যবস্থার উন্নয়নে নগর কর্তৃপক্ষ আরো সক্রিয় হবে, এটিই প্রত্যাশা।