প্রাকৃতিক গ্যাসের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন হ্রাস ও আমদানি ব্যয় বেড়ে ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে সব ধরনের শিল্পে ৪ ঘণ্টা গ্যাস ব্যবহার বন্ধ রাখার অনুরোধ জানিয়ে বিজ্ঞপ্তিও দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য এখন ‘গোল্ডেন টাইম’। তারা সেই সুযোগ কতটুকু কাজে লাগাতে পারবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। চীন-ভিয়েতনামে লকডাউন এবং শ্রীলংকা-পাকিস্তানে রাজনৈতিক অসন্তোষ বিদেশী ক্রেতাদের বাংলাদেশমুখী করেছে। পোশাক সোর্সিংয়ের জন্য তারা বাংলাদেশকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন। এর সুফলও পাওয়া যাচ্ছে। অনেক অর্ডার আসছে। এ সুযোগে রফতানি আরো বাড়ানোর সুযোগ আছে। কিন্তু দিনে ৪ ঘণ্টা গ্যাস বন্ধ রাখা হলে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হবে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে এ সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এক্ষেত্রে গ্যাস সরবরাহ সংকুচিত করার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।

গ্যাস সংকটে দেশের শিল্প উৎপাদন কমে গেছে। গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতাও নেমে গেছে। ফলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাচ্ছে না শিল্প, বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানসহ শহর-গ্রামের নাগরিকরা। অপর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহের কারণে অনেক মালিক কারখানা বন্ধের বিবেচনা করছেন বলে খবর মিলছে। বিভিন্ন শিল্প-কারখানার মালিক ও কর্মকর্তাদের দাবি, প্রতি বর্গফুটে যেখানে ১৫ পিএসআই গ্যাসের চাপ থাকার কথা, সেখানে অনেক কারখানায় তা কমে মাত্র ২-৩ পিএসআইতে নেমে এসেছে। আবার কোনো কোনো কারখানায় পিএসআই শূন্যতে নেমে গেছে। গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এতে আর্থিকভাবে লোকসানে পড়ার আশঙ্কা জোরালো হয়ে উঠছে। এ অবস্থায় বিশেষ করে বিদেশী ক্রেতাদের চাহিদামতো দেশের প্রধান রফতানি পণ্য তৈরি পোশাক সরবরাহ করতে না পারলে তারা ক্রয়াদেশ বাতিল করে দেবেন এবং বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে অন্য দেশের দিকে ঝুঁকে পড়ার মতো শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই যদি ৪ ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখা হয় তাহলে উৎপাদন আরো ব্যাহত হবে। উৎসবের এ সময়ে পণ্য সরবরাহের বাড়তি চাপও থাকে। সেটি পূরণের জন্য হলেও শিল্পে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা প্রয়োজন। গ্যাস সংকটের সমাধান চেয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দীর্ঘদিন ধরে দেনদরবার করলেও এখনো কোনো সমাধান পাননি উদ্যোক্তারা। উৎপাদনের চাকা ধীর ও বাধাগ্রস্ত হওয়ায় অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিবহন খাতে রেশনিং করে সিএনজি সরবরাহ করায় বেড়ে গেছে যাতায়াত খরচ। হ্রাস পেয়েছে কৃষির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সার উৎপাদনও। সংকটের কারণে সরকার ২০১৮ সাল থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি শুরু করে। বেশি দামে গ্যাস কিনে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। আর লোকসান কমাতে গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এলএনজি আমদানি করে কত দিন চলবে বা সরকার কত লোকসান গুনবে? জনগণইবা আর কত এর দায় বহন করবে?

দেশের অনেক প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে ২৪ ঘণ্টা জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রয়োজন। এগুলোয় ৪ ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ কারিগরি কারণেই অবাস্তব। যেসব শিল্প বয়লার চালুর জন্য গ্যাস ব্যবহার করে, সেগুলো ৪ ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হলে বয়লার চালু এবং বন্ধ করার সংকটে পড়বে। অনেক শিল্প-কারখানা যেসব পণ্য বিদেশে রফতানি করতে চুক্তিবদ্ধ, সেগুলো সময়মতো রফতানি করতে পারবে না। গ্যাস সরবরাহ ঢালাওভাবে সংকুচিত করার সিদ্ধান্ত আদৌ বাস্তবসম্মত হয়নি। গ্যাস ছাড়া উন্নয়নের কথা চিন্তাই করা যায় না। শিল্প, বিদ্যুৎ, গৃহস্থালিসহ অনেক খাতেই গ্যাস ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশের প্রধান জ্বালানি হলো গ্যাস। এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছেই। আবার এর মধ্যেই দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গ্যাস সংকট সৃষ্টি হয়েছে। তাই এ সংকটময় পরিস্থিতি এবং অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের স্থিরতার কথা বিবেচনা করে প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া উচিত। এলএনজি ব্যয়বহুল বিধায় এর প্রভাব দেশের প্রতিটি খাতে পড়বে। যেমনটি পড়েছে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়। তাই সরকারের উচিত হবে যেসব জায়গায় এরই মধ্যে গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হয়েছে, গ্যাসের মজুদের সন্ধান পাওয়া গেছে, তা উত্তোলনে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া এবং উত্তোলিত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে কীভাবে যুক্ত করা যায় সে ব্যবস্থা করা। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।

অস্বীকারের উপায় নেই, গ্যাস সেক্টর ভুল পথে পরিচালিত হয়েছে, এখনো হচ্ছে। আমদানিতে বেশি মনোযোগ দেয়া হচ্ছে। এখনই পথ পরিবর্তন করা জরুরি, তা না হলে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। অনেক বিকল্প ছিল, সেদিকে না গিয়ে চার দশক ধরে বিপজ্জনক পথে হাঁটছে পেট্রোবাংলা। দেশীয় গ্যাস ফিল্ডগুলোর ওপর একটি সমীক্ষা পরিচালনা করে আন্তর্জাতিক কোম্পানি স্লামবার্জার। ২০১১ সালে দাখিলকৃত রিপোর্টে বলা হয়, বিদ্যমান গ্যাস ফিল্ডগুলোর সংস্কার করে ৪০০ থেকে ৮০০ এমএমসিএফডি গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এতে খরচ হতে পারে সর্বোচ্চ ১২৫ মিলিয়ন ডলার। ১১ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই রিপোর্ট রয়ে গেছে অন্ধকারে। এখন আর স্বাভাবিক কর্মসূচি দিয়ে কাজ হবে না। বিশেষ ঝটিকা কর্মসূচি পরিচালনা করা দরকার। কিছু ওয়ার্কওভার করতে পারলে অল্প সময়ে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। তাতে স্পট মার্কেট থেকে আনা ১০০ এমএমসিএফডি গ্যাস আমদানি না করলেও চালিয়ে নেয়া সম্ভব হবে। দেশের শিল্প ও অর্থনীতির গতি ধরে রাখতে হলে এ মুহূর্তে আমদানির বিকল্প নেই। দ্রুত পণ্যটির বাজার স্থিতিশীল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই; বরং ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও সরবরাহ সংকটে স্পট ও ফিউচার মার্কেটে এর দাম আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে সাময়িক নয়, দীর্ঘমেয়াদের কথা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা উচিত। গ্যাস অনুসন্ধানে বাংলাদেশের সফলতার হার উচ্চ হলেও এখন তিমিরেই রয়ে গেছে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান। ১৯৯৫ সালের জ্বালানি নীতিমালায় বছরে চারটি অনুসন্ধান কূপ খননের কথা বলা হলেও কোনো সরকারই তা মেনে চলেনি। বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে বিশাল সমুদ্রসীমা অর্জন করলেও অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা হয়নি, যা দুঃখজনক। বলাবাহুল্য, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমছে বলে সামনে এলএনজির ওপর নির্ভরতা আরো বাড়বে। তাই এলএনজি কেনার ক্ষেত্রেও সরকারের কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া জরুরি। সম্প্রতি সাগরের গভীরে বিপুল পরিমাণ মিথেন গ্যাস হাইড্রেট পাওয়ার খবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। কিন্তু প্রযুক্তিজনিত কারণে ওই গ্যাস আমাদের এখনই উপকারে আসবে না বলে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন। তবে অনুসন্ধান অব্যাহত রাখতে হবে। জরুরি ভিত্তিতে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান না করলে অদূরভবিষ্যতে দেশ গ্যাস সংকটে পড়তে পারে।

চলমান গ্যাস সংকটের দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন। এলএনজি আমদানি, টার্মিনাল সংস্কারসহ স্বল্পমেয়াদির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপও নিতে হবে। একই সঙ্গে গ্যাস ব্যবহারে গ্রাহক পর্যায়ে সচেতনতাও প্রয়োজন। বাসাবাড়িতে গ্যাস ব্যবহারে অপচয়ের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। মনে রাখতে হবে গ্যাস প্রাকৃতিক সম্পদ এবং এটা অসীম নয়। প্রত্যেকে গ্যাস ব্যবহারে দায়িত্বশীল হলে সংকট কিছুটা হলেও কাটবে। একই সঙ্গে গ্যাস ব্যবস্থাপনায় যে অনিয়ম রয়েছে, সেখানেও দৃষ্টি দেয়া চাই। গ্যাস-সংশ্লিষ্টদেরও অব্যবস্থাপনা দূর করে এর সর্বোচ্চ ব্যবহারে দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। আমদানিকে যেভাবে সামনে আনা হয়েছে, বাস্তবতা মোটেই অনুকূলে নয়। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ফ্লোটিং স্টোরেজ রি-গ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) ১ হাজার এমএমসিএফডি এলএনজি আমদানি করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। সাগর উত্তাল হলেই আবার সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। ঘাটতি বেড়ে গেলেও বাড়তি এলএনজি আমদানির জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামোও গড়ে ওঠেনি। এর সঙ্গে রয়েছে অস্থিতিশীল আন্তর্জাতিক বাজারদরের ইস্যু। ভবিষ্যতে আমদানির পরিমাণ বেড়ে গেলে বাজারদর কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা বলাবাহুল্য।

বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হয়েছে, লক্ষ্য এখন উন্নত দেশের। এমন অবস্থায় শিল্পের বিকল্প নেই—একথা উপলব্ধি করতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মেগা প্রকল্পগুলো শেষ করতেও শিল্প খাত থেকে আয় প্রয়োজন। দেশের মানুষের আর্থিক অবস্থা শক্ত থাকা প্রয়োজন। সে বিষয়টিও ভাবতে হবে। এ কারণে দেশের শিল্প খাতে গ্যাস সংকটের এই অশনিসংকেত কাটিয়ে উঠতে সময় থাকতেই পদক্ষেপ নিন। বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাস সংকটের সমাধান রাতারাতি সম্ভব নয়। এজন্য সুষ্ঠু পরিকল্পনা করতে হবে। গ্যাস উত্তোলন বাড়াতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। গড়িমসি করার সুযোগ নেই। দেশ যতটা এগিয়েছে, এ অবস্থায় কলকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হলে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। ফলে সরকারের সর্বোচ্চ মহলকে বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমাধানে পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত নিতে হবে।