আগে হরহামেশাই প্রশ্ন শুনতাম ‘দেশের বাড়ি’ কোথায়? তখন বুঝতাম না বাংলাদেশের মধ্যের বাড়িকেই কেন আবার ‘দেশের বাড়ি’ বলতে হবে। বাংলাদেশের যেকোনো অঞ্চলের বাড়িই তো দেশের বাড়ি। আসলে এ দেশের মানুষ দেশের বাড়ি বলতে বোঝায় বাড়ি কোন অঞ্চলে বা কোন জেলায় অবস্থিত। নিজের অঞ্চলকেই এ দেশের মানুষ ‘দেশ’ ভাবতে অভ্যস্ত। কিন্তু আজ এ দেশের মানুষের সত্যিই দুই ধরনের বাড়ি আছে, যার একটা ‘দেশের বাড়ি’, আরেকটা ‘বিদেশের বাড়ি’। বিদেশের বাড়িকে আদর করে ডাকা হয় সেকেন্ড হোম। যেখানে এক টুকরো জমি বা ভিটেমাটি না থাকার কারণে কত মানুষ আজ ভূমিহীন, রাত কাটায় ফুটপাতে, জোটে না একটা সরকারি চাকরি; সেখানে দেশে শত রকমের সম্পত্তি থাকার পরেও বিদেশে এক বা একাধিক সম্পত্তি থাকা আর বিদেশী ব্যাংকে ব্যালান্স থাকা এখন অবৈধ বিত্তশালীদের জন্য মামুলি ব্যাপার।

এমন মুরাদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। এদের অনেকেই আছেন, যাদের কেউ ব্যাংকের টাকা মেরে বা দুর্নীতির দায়ে অথবা দলীয় পদ হারিয়ে কিংবা অপরাধের বিচার এড়াতে হরহামেশাই পাড়ি জমাচ্ছেন ইউরোপ, আমেরিকার দেশগুলোয়। আবার কেউ কেউ যাচ্ছেন দুবাই, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর বা পাশের দেশ ভারতে। গন্তব্য যা-ই হোক না কেন দেশ ছাড়ছেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এদের জন্য কানাডার টরন্টোর ‘বেগম পাড়া’ খুবই নাম করেছে সম্প্রতি। যেটাকে সাম্প্রতিককালে সবচেয়ে আলোচিত দুর্নীতিবাজদের অভয়ারণ্য বলা হচ্ছে। এখানে বাড়ি না থাকাটা অনেক রাজনৈতিক নেতা আর আমলাদের জন্য যেন প্রেস্টিজের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অপরাধী আর দুর্নীতিবাজদের সেখানে চলে যাওয়ার স্টাইলটাও দেখার মতো। যখন যায় তখন তেমন কোনো হইচই না হলেও কিছুদিন পরে যখন ক্ষমতার হেরফেরে তাদের অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে, তখন মিডিয়ার কল্যাণে মানুষ জানতে পারে তাদের চলে যাওয়ার খবর আর ভিন দেশে তাদের বিশাল বৈষয়িক অবস্থান। এদের বেশির ভাগই দুর্নীতিবাজ আর অপরাধী, কোনো সন্দেহ নেই। যাদের মধ্যে রয়েছে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ, সাবেক এমপি-মন্ত্রী, সাবেক সরকারি আমলা, আর একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী। বিদেশে এড়া পাড়ি জমায় সেফ এক্সিটের জন্য। রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা বা আইনি বাধা-নিষেধ থাকা সত্ত্বেও এরা কীভাবে যেন পালাতে সক্ষম হয়। এদের এমন পলায়নের খবর শুনে হাইকোর্ট বিভাগকেও বিস্ময় আর বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখা গেছে।

চাকরিতে ঘুষ বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য, ভূমিদস্যুতা, ঋণের মাধ্যমে ব্যাংক লুট, অর্থের বিনিময়ে কাজ পাইয়ে দেয়ার দালালি, শেয়ার মার্কেট থেকে টাকা সরানো, দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে কয়েক মাসের ব্যবধানে কয়েক হাজার কোটি টাকা কামিয়ে নেয়া, অনলাইন ব্যবসার ফাঁদে ফেলে মানুষের মূলধন লোপাট করাসহ হরেক ফন্দিফিকির নিয়ে চলছে টাকা বানানোর ‘শিল্পকর্ম’। বিচারের দীর্ঘসূত্রতা, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির ঘাটতি, শাস্তির রকমফের, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এ দেশকে এ ধরনের আর্থিক অপরাধের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে।

আর্থিক দুর্নীতি বা অপরাধের এসব দেশীয় সুযোগের পাশাপাশি রয়েছে বিদেশে বিনিয়োগ আর কোনো না কোনো বেগম পাড়ার বাসিন্দা হওয়ার হাতছানি। পাশ্চাত্যের যেসব দেশ সারা বিশ্বকে গণতন্ত্র, সুশাসন আর মানবাধিকারের ছবক দেয়, অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর কালো টাকার প্রতি তাদের যে দুর্দমনীয় লোভ, তাতে বুঝতে বাকি থাকে না যে তাদের ঔপনিবেশিক প্রজেক্ট এখনো চালু আছে দ্বিচারিতার আড়ালে। আগে এরা সাত সাগর পাড়ি দিয়ে অন্য দেশে উপনিবেশ স্থাপন করে সে দেশের সম্পদ লুট করত। সময়ের আবর্তে এরা শুধু সিস্টেম পাল্টিয়ে নিজেদের জন্য বিষয়টা সহজ করে দিয়েছে। এখন আর বহির্বিশ্বে গিয়ে যুদ্ধও করতে হয় না, শাসন-শোষণের ঝামেলাও নেই। শুধু বিদেশী বিনিয়োগের পথটা খুলে দিয়ে টাকা ঢোকানোর সিস্টেম বাতলে দেয়া হচ্ছে। এতেই খেল খতম!

অভিবাসনের নিয়ম সহজ করে বিদেশীদের জন্য যে বিনিয়োগের স্কিম খুলেছে, তার মাধ্যমে কোটি খানেক বাংলা টাকা বিদেশে শুধু নিতে পারলেই হয়, পুরো পরিবারের আবাসন ভিসা নিশ্চিত। আর ব্যবসায়িক কোটায় কিছু কাল পরই পাওয়া সম্ভব হবে বড় কাঙ্ক্ষিত সেই বিদেশী নাগরিকত্ব। এমন পন্থায় টাকা পাচারের মাধ্যমে মিলবে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, বাড়ি, ব্যবসা, নাগরিকত্ব, স্ত্রী আর সন্তানদের চির আকাঙ্ক্ষিত বিদেশী জীবন আর নিরাপত্তা। সঙ্গে আরো জুটবে অপরাধের বিচার থেকে আজীবনের মুক্তি।

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর অনেক ঘাটতি থাকে। এদের সুশাসনের অভাব থাকে, আইনের শাসন দুর্বল থাকে, রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকে, মানবাধিকারের কমতি থাকে ইত্যাদি। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে যেখানে রাষ্ট্রের আইনের শাসনের উন্নতির জন্য দরকার জাতীয় উদ্যোগ ও আন্তর্জাতিক সহায়তা, সেখানে উন্নত রাষ্ট্রগুলোর এমন অদ্ভুত অভিবাসন নীতি ও কোনো জবাবদিহিতা ছাড়া বিনিয়োগ ব্যবস্থা গণতান্ত্রিকভাবে দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে আরো দুর্বল করে তুলছে।

এজন্য রাষ্ট্রগুলোকে ও আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোকে যুগপত্ভাবে কাজ করতে হবে। প্রথমে দরকার ফৌজদারি কার্যবিধির এখতিয়ারকে আন্তর্জাতিকীকরণ। এর মাধ্যমে অপরাধী যে রাষ্ট্রেরই হোক না কেন, সে যেন কোনো দেশ থেকেই পালিয়ে বাঁচতে না পারে। এর মাধ্যমে নিশ্চিত করা যাবে অপরাধীর কোনো দেশ থাকে না। যেকোনো দেশ তার বিচারের ব্যবস্থা করতে পারবে বা বিচারিক ব্যবস্থায় সহযোগিতা করতে পারবে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক অর্থ পাচারের আইনের শক্ত প্রয়োগ ঘটাতে হবে। যেন অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ কোনো ব্যক্তি কোথাও নিরাপদে সরাতে সক্ষম না হন। তৃতীয়ত, বিদেশে বিনিয়োগ করতে হলে অর্থের বৈধ উপার্জনের যাবতীয় তথ্য দেশে ও বিদেশে সরবরাহ করতে হবে। কঠিন বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়া যেন বিদেশী অর্থের বিনিয়োগ করা সম্ভব না হয়। সর্বোপরি, বিনিয়োগের সঙ্গে অভিবাসন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণভাবে বিযুক্ত করতে হবে।

আন্তঃরাষ্ট্রীয় আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া এ যুগে অপরাধ দমন করা সম্ভব না। কারণ অপরাধ হচ্ছে ভাইরাসের মতো, যা রাষ্ট্রীয় বর্ডার ক্রস করে কোনো পাসপোর্ট ছাড়াই। আজ করোনা প্রতিরোধে যদি সারা বিশ্ব একযোগে এক জোট হয়ে কাজ করতে পারে, তবে এ ধরনের জাতীয় আর্থিক অপরাধ, যা সময়ের ফেরে আন্তঃরাষ্ট্রীয় হয়ে যায়, সেগুলো কেন সম্মিলিত রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ায় মোকাবেলা করা হবে না?

 

মো. রবিউল ইসলাম: সহযোগী অধ্যাপক, আইন ও বিচার বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ডক্টরাল ফেলো (হংকং)