প্রতি বছরের মতো এবারো বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি আসন্ন বাজেট সামনে রেখে বিকল্প বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করে শনিবার। বৈষম্য-অসমতা-দারিদ্র্য হ্রাসকে গুরুত্ব দিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সর্বাধিক বরাদ্দের প্রস্তাব করেছে সমিতি। শুধু আসন্ন বাজেটই নয়, আগামী অন্তত পাঁচ বছরের বাজেট এবং অন্যান্য পরিকল্পনা ও উন্নয়ন নীতি-কৌশল দলিল প্রণয়নে যে বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের প্রধানতম ভিত্তি নীতি হিসেবে গ্রহণ করতে প্রস্তাব দিয়েছে তা হলো, সমাজ থেকে চার ধরনের বৈষম্য—আয়বৈষম্য, সম্পদবৈষম্য, স্বাস্থ্যবৈষম্য ও শিক্ষাবৈষম্য নির্মূল করা। এ লক্ষ্যে বাজেটের আয় ও ব্যয় খাতে মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তনের তাগিদ দিয়েছে সমিতি। অর্থায়নের উৎস নির্ধারণে দরিদ্র, নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্য মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ওপর কোনো ধরনের করারোপ না করা এবং সম্পদ পুনর্বণ্টন করে তা শ্রেণী মইয়ের নিচের দিকে প্রবাহিত করার সুপারিশ জানানো হয়েছে বিকল্প বাজেট প্রস্তাবে। করোনার সময়ে সৃষ্ট নতুন দারিদ্র্য মোকাবেলায় সামাজিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তাবেষ্টনী আরো সম্প্রসারণ ও বরাদ্দ বাড়ানোর সুপারিশও করা হয়েছে। অবস্থা একই রকম থাকলে সামাজিক সুরক্ষা প্রাপ্তিযোগ্য মানুষের সংখ্যা বাড়বে। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির বিকল্প বাজেট প্রস্তাবে বেশকিছু ইতিবাচক বিষয় রয়েছে, যা অর্থ মন্ত্রণালয় তথা সরকার গ্রহণ করতে পারে। আশা করি, আগামী বাজেটে এর প্রতিফলন ঘটবে।  

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির বাজেট প্রস্তাবনায় ৩৩৮টি সুপারিশ করা হয়েছে। সমিতির সভাপতি ড. আবুল বারকাত বলেছেন, বৈষম্য-অসমতা-দারিদ্র্য দূর করতে শুধু আসন্ন বাজেটে নয়, আগামী অন্তত পাঁচ বছর সমাজ থেকে আয়, সম্পদ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাবৈষম্য ক্রমে হ্রাস করে একসময় নির্মূল করার লক্ষ্যে যেতে হবে। বাজেটে আয় ও ব্যয়ের মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তন হতে হবে। বাজেটটিতে আদর্শিক নানা সংস্কারের প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন বিভিন্ন খাত, যেমন কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কার, কৃষক উন্নয়ন, নারী ও আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দ দেয়ার কথা বলা হয়েছে। বিকল্প বাজেট প্রস্তাবে বলা হয়েছে, করোনা মহামারীর আগে সামাজিক সুরক্ষাবেষ্টনীর আওতায় আসার যোগ্য ছিল দুই কোটি। যাদের ৭৫ শতাংশ এ সুবিধা পেত না। এ সংখ্যা কভিডকালে বেড়ে কমপক্ষে সাড়ে তিন কোটিতে দাঁড়িয়েছে। বেকার হয়েছে কয়েক কোটি মানুষ। অবস্থা একই রকম থাকলে সামাজিক সুরক্ষা প্রাপ্তিযোগ্য মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণ বাড়বে এবং বেড়েছে। এসব বিবেচনায় অর্থনীতি সমিতির প্রস্তাবিত জনগণতান্ত্রিক বাজেটে সর্বোচ্চ বরাদ্দ প্রাপ্তিযোগ্য খাত সামাজিক নিরাপত্তা। বার্ষিক প্রাক্কলিত মূল্যস্ফীতি ৫ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে রাখার কথা বলা হয়েছে, যা সবার কাঙ্ক্ষিতও বটে। সরকার যে মূল্যস্ফীতির কথা বলে তা প্রকৃত মূল্যস্ফীতির তুলনায় অনেক কম। শর্ত হলো, কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে এবং ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে হবে। মূল্যস্ফীতি এমন কোনো পর্যায়ে নেয়া যাবে না, যা অর্থনীতিকে মূল্যস্ফীতির ঘূর্ণনচক্রের মধ্যে ফেলবে।

সরকারে যে-ই থাকুক না কেন স্বীকার করতে হবে যে শুধু বৈষম্যহীন অর্থনীতি ও আলোকিত মানুষসমৃদ্ধ ‘শোভন সমাজ ব্যবস্থা—শোভন জীবন ব্যবস্থা’ বিনির্মাণের লক্ষ্যেই নয়, মানবকল্যাণকামী উন্নততর ব্যবস্থায় উত্তরণে শুধু সম্পদের (সব প্রাকৃতিক সম্পদসহ জমি-জলা-জঙ্গল) ন্যায্য পুনর্বণ্টনই নয়, সম্পদের মালিকানারও বণ্টন করতে হবে। ‘শিক্ষা’ খাতের বাজেট বরাদ্দ কোনোভাবেই ‘ব্যয়’ হিসেবে দেখা যাবে না। শিক্ষাকে দেখতে হবে শোভন মানুষ সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ সামাজিক বিনিয়োগ হিসেবে। সুপেয় পানি (খাওয়ার—আর্সেনিকমুক্ত ও লবণাক্ততামুক্ত) ও স্যানিটেশন (স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিনসহ) জনস্বাস্থ্যের অন্যতম প্রধান নির্দেশক। অথচ এ দুই উপখাতে বরাদ্দ চলতি অর্থবছরে আগের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে। তা অনেক বাড়ানো প্রয়োজন। মানুষের সুস্বাস্থ্য শোভন জীবন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রধান শর্ত। আমাদের স্বাস্থ্য খাতের অবস্থা একেবারেই বেহাল। স্বাস্থ্য খাত এখন বৈষম্য সৃষ্টি ও দারিদ্র্য সৃষ্টির অন্যতম মাধ্যম। দেশে আসলেই তেমন কোনো শক্তিশালী স্বাস্থ্য খাত নেই। নেই জনস্বাস্থ্য বা পাবলিক হেলথ বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব। প্রাথমিক পর্যায়ের শিল্পায়ন হতে হবে দেশের অভ্যন্তরীণ মোট চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে। আর সে চাহিদা হবে মূলত মানুষের বিকাশমান যৌক্তিক মৌলিক চাহিদা। শিল্পায়ন হতে হবে দেশজ। আর দেশজ শিল্প সুরক্ষার জন্য যত ধরনের সংরক্ষণবাদী-সুরক্ষাবাদী নীতি আছে তা গ্রহণ করতে হবে। স্থানীয় শিল্প উদ্যোক্তাদের শিল্প স্থাপনে সহায়তায় রাজধানী ও শহরাঞ্চলের ওপর জনসংখ্যার চাপ কমানোর লক্ষ্যে সরকার প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া এলাকাগুলোয় ‘অর্থনৈতিক অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। এ পদক্ষেপ দেশে সামাজিক, ভৌগোলিক ও আঞ্চলিক বৈষম্য নিরসনে সহায়ক হতে পারে, যদি শিল্পায়ন নীতি জনগণের কল্যাণে প্রণয়ন করা হয়। এছাড়া রাষ্ট্রকে স্বীকার করতে হবে যে নারীর বহুমুখী ক্ষমতায়ন বিষয়টি সর্বজনীন। তবে দরিদ্র-বিত্তহীন-নিম্নবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত নারী যেহেতু সবচেয়ে ভঙ্গুর ও অরক্ষিত, সেহেতু এ গ্রুপে নারীর ক্ষমতায়ন সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকারযোগ্য ক্ষেত্র।

শোভন সমাজ-অর্থনীতি ব্যবস্থা বিনির্মাণের লক্ষ্যে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণে সরকারকে কিছু পরামর্শও দিয়েছে অর্থনীতি সমিতি। অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণে সম্পদ কর, অতিরিক্ত মুনাফার ওপর কর, অর্থ পাচার উদ্ধার থেকে প্রাপ্তি, কালো টাকা উদ্ধার থেকে প্রাপ্তি, বিদেশী নাগরিকদের ওপর কর, বিভিন্ন কমিশন ও বোর্ড কর্তৃক আহরণ বৃদ্ধি এবং সরকারের সম্পদ আহরণের প্রচলিত বিভিন্ন উৎসে কর আদায়ের সুপারিশ করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের মধ্যে এখন পরোক্ষ করের ওপর তুলনামূলক বেশি জোর দেয়া হয়, যা মানুষে মানুষে বৈষম্য বাড়ায়। এখন থেকে পরোক্ষ করের তুলনায় প্রত্যক্ষ করের ওপর বেশি জোর দিতে হবে। দরিদ্র, নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্য মধ্যবিত্ত মানুষকে সামনের কয়েক বছর আয়করবেষ্টনীর বাইরে রাখতে হবে। দেশে যেভাবে সবকিছু এককেন্দ্রিক বা ঢাকামুখী হচ্ছে, তা উন্নয়ন সহায়ক নয়। অর্থনীতির অনেক মৌলিক কর্মকাণ্ড (শিল্পায়ন, নগরায়ণ) থেকে শুরু করে অনেক প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড (দপ্তর, অধিদপ্তর, এমনকি মন্ত্রণালয়) রাজধানী ঢাকার বাইরে স্থানান্তর করা যুক্তিসংগত।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির বাজেট নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। বাজেটের আকার নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে, তবে বিকল্প বাজেট প্রস্তাবে বেশকিছু ইতিবাচক সুপারিশ ও পরামর্শ উঠে এসেছে। আসন্ন বাজেটে সেগুলো বিবেচনায় নিতে পারে অর্থ মন্ত্রণালয়। অস্বীকারের উপায় নেই, বর্তমান সময়ে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করেছে। এছাড়া দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ঘাটতি বেড়ে ওঠায়ও কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে আগামী বাজেট অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছর বিভিন্ন কারণে বিগত সময়ের তুলনায় ভিন্ন। এ বছর একদিকে আন্তর্জাতিক পরিবেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা, অস্বাভাবিকতা যেমন প্রকট, তেমনি অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিও মুদ্রাস্ফীতিসহ বহুমুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। কাজেই এ অর্থবছরের বাজেটে শুল্ক ও করসংক্রান্ত প্রস্তাব প্রণয়নে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের বিভিন্ন বিষয়, যেমন আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানিসহ বিভিন্ন পণ্য ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, এ বৃদ্ধির সঙ্গে স্থানীয় বাজারের মুদ্রাস্ফীতির ফলস্বরূপ নিম্ন আয়ের মানুষসহ নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্তের আয় সংকোচন, আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের অসামঞ্জস্য বৃদ্ধি ইত্যাদি বিবেচনায় রাখতে হবে। তাছাড়া নিম্ন আয়ের মানুষের টিকে থাকার স্বার্থে পরোক্ষ করের ওপর দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা নির্ভরতা কমাতে হবে। অন্যদিকে বাজেটের মোট প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় রাজস্ব আয় অনেক কম। ফলে বাজেট ঘাটতি হচ্ছে। এ অবস্থায় রাজস্ব আয় বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। অধিকন্তু, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ করবে। সে কারণে দেশের আমদানি শুল্ক, কর, স্থানীয় ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক ও আয়কর এবং করপোরেট করে আন্তর্জাতিক মানের দিক থেকে যেসব অসংগতি আছে তা যথাসম্ভব যৌক্তিকীকরণ করতে হবে।