পোলট্রি মুরগি এখন দেশের খাদ্য ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। বেড়ে চলা আমিষের চাহিদার একটা উল্লেখযোগ্য অংশ মেটাচ্ছে বাণিজ্যিক খামারে চাষ হওয়া মুরগির মাংস। কিন্তু দেশের মানুষের গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির এ উৎসমূলে নিরাপদ খাদ্যের সংশয় কাটছে না। নানা গবেষণায় বারবারই মুরগিতে বিভিন্ন বিষাক্ত উপাদান থাকার বিষয়টি উঠে আসছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায়ও মুরগির মাংসে ক্ষতিকর পাঁচ ধাতুর উপস্থিতি মিলেছে। গবেষণায় নিরীক্ষিত নমুনার মধ্যে উচ্চমাত্রার আর্সেনিক, নিকেল, ক্রোমিয়াম, পারদ ও সিসার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এটা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। দীর্ঘমেয়াদে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর এটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, যা উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাবে। কাজেই উৎপাদন থেকে বিপণন—সব পর্যায়ে উত্তম চর্চা নিশ্চিতে সরকারের নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
সময়ান্তরে দেশে ছোট-বড় মুরগির খামার বেড়েছে। স্বল্প সময়ে বাণিজ্যিক লাভ বিবেচনায় অনেকেই আসছেন এ খাতে। অপরিকল্পিতভাবে যেখানে-সেখানে গড়ে তোলা হচ্ছে পোলট্রি খামার। কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে বেশির ভাগ খামার। সেখানে মুরগির বাসস্থান স্বাস্থ্যকর নয়। রোগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ। নেই সঠিক জীব নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ফলে এসব খামারে মানসম্মত ব্রয়লার মুরগি যেমন খুব একটা উৎপাদন হচ্ছে না, তেমনি মুরগিগুলো সহজেই আক্রান্ত হচ্ছে বিভিন্ন রোগেও। এটা এ খাতের একটা কাঠামোগত দুর্বলতা। তদুপরি পালন ব্যবস্থায়ও রয়ে গেছে নানা ত্রুটি। মুরগিকে খাওয়ানো হচ্ছে নিম্নমানের ও অনিরাপদ ফিড, সেখানে থাকছে ক্রোমিয়ামসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর ধাতু। আবার যে পানি পান করানো হচ্ছে, তাতে থাকছে আর্সেনিকসহ উচ্চমাত্রার বিষাক্ত রাসায়নিকের উপস্থিতি। অতি মুনাফার লোভে মুরগির ওজন বাড়াতে অনিয়ন্ত্রিত মাত্রায় প্রয়োগ করা হচ্ছে হরমোন ও অ্যান্টিবায়োটিক। বিক্রির সময় সতেজ দেখাতেও প্রয়োগ করা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ। সর্বোপরি, অনিরাপদ ও দূষিত পরিবেশে লালন-পালন করা হচ্ছে পোলট্রি মুরগি। সব মিলিয়ে এর মাংস মানবদেহের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ হয়ে উঠছে।
বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই খামার ব্যবস্থাপনায় জনস্বাস্থ্যের দিকটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখা হয়। এজন্য তারা প্রতিটি পর্যায়ে উত্তম চর্চাগুলো অনুসরণ করে। কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, ভারত প্রভৃতি দেশে পেরিমিটার ফেন্সিংয়ের মাধ্যমে মুরগির খামারকে পৃথক্করণ করা হয়। যাতে অবাঞ্ছিত পশুপাখি খামারের আশপাশে না আসতে পারে এবং রোগ ছড়াতে না পারে। খামারে কোনো যানবাহন প্রবেশের আগে চাকা পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করা, খামারে প্রবেশের নির্ধারিত মাস্ক, গ্লাভসসহ পিপিই ব্যবহার, প্রবেশমুখে ফুটবাথ রাখা ও এর ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়। প্রবেশমুখে টাঙিয়ে দেয়া হয় প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত সাইনবোর্ড। নির্ভরযোগ্য ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত ডিলার থেকে ফিড, ওষুধ, ভিটামিন সংগ্রহ নিশ্চিত করা হয়। নিয়মিত পরীক্ষা করা হয় ফিড। অনুসরণ করা হয় অলইন-অলআউট পদ্ধতি। অর্থাৎ ধারণক্ষমতার বেশি মুরগির বাচ্চা ওঠানো যাবে না। অসুস্থ মুরগি আলাদা রাখা হয়, পুঁতে ফেলা হয় মৃত মুরগি। নিয়মিত বর্জ্য পরিষ্কার করা হয়। মুরগির জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিতে সর্বোচ্চ জোর দেয়া হয়। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার পাশাপাশি অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার করা হয় নিয়ন্ত্রিত মাত্রায়। ফলে ওই সব দেশে মুরগির নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত মাংস জোগানো অনেকটাই সম্ভব হয়েছে। উল্লিখিত দেশের ব্যবস্থাপনা চর্চা ও অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মানবস্বাস্থ্যের জন্য বিভিন্ন ধাতুর সহনীয় মাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু গবেষণার ফলাফলে মুরগির মাংসে এর চেয়ে বেশি মাত্রার ধাতুর উপস্থিতি মিলেছে। বলা হচ্ছে, মানবদেহে সহনীয় মাত্রার চেয়ে ১০৪ গুণ আর্সেনিক, ৫ দশমিক ৫৮ গুণ নিকেল, ৩ গুণ ক্রোমিয়াম, ২ দশমিক ৮ গুণ পারদ ও ৪ দশমিক ৬ গুণ সিসা পাওয়া গেছে নমুনা হিসেবে নেয়া মুরগির মাংসে। বিষয়টি দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য সাংঘাতিক উদ্বেগজনক। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিকর ধাতুগুলো শরীরে প্রবেশ করলে ক্যান্সারসহ অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগ-ব্যাধির ঝুঁকি তৈরি হয়। হচ্ছেও। এরই মধ্যে দেশের মানুষের মধ্যে এ ধরনের রোগের ব্যাপকতা দেখা দিয়েছে—যার একটা কারণ নিঃসন্দেহে অনিরাপদ মুরগির মাংস পরিভোগ। সুতরাং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এদিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বিভিন্ন পোলট্রি খামারের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদিত মুরগির গুণগত মান কেমন তা মূল্যায়নের সময় এসেছে। নিরাপদ ব্রয়লার উৎপাদনে আমূল পরিবর্তন ঘটাতে হবে। কয়েকটি দিকে নজর দেয়া এখন সময়ের দাবি। অনুমোদিত ডিলার থেকে মুরগির খাদ্য, ভিটামিন, মিনারেল সংগ্রহ নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষতিকর রাসায়নিক খাদ্যে আছে কিনা তা নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। বিভিন্ন ভিটামিন, মিনারেল, বিভিন্ন ওষুধ ব্যবহার করতে হবে প্রাণী চিকিৎসকের পরামর্শে। পানিতে আর্সেনিক, আয়রন ধাতুর উপস্থিতি কতটুকু তা যাচাইয়ে, পানি পরীক্ষা করা দরকার। প্রতি মাসে ব্লিচিং পাউডার দিয়ে পানির ট্যাংক পরিষ্কার করতে হবে। মুরগির পেয় পানি যাতে কীটনাশক দূষণমুক্ত হয়, তাও নিশ্চিত করা চাই। প্রাণী চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। কেননা তার অবশিষ্টাংশ থেকে যায় এবং মানব শরীরে নানা ঝুঁকি তৈরি করে। খামারে উত্তম ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন নিশ্চিত করতে হবে। খামারের বাইরে আলাদা জায়গায় খাদ্য ও ওষুধ মজুদের ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে বিরূপ আবহাওয়া, রাসায়নিক (যেমন লুব্রিক্যান্ট বা কীটনাশক) এবং পরিবেশগত দূষণ থেকে সুরক্ষা করা যায়। ফিডার ও পানির পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করতে হবে। সন্দেহ নেই, উত্তম চর্চাগুলো অনুসরণ করলে খামারিদের খরচ বাড়বে। ফলে অনেকেই সেগুলো মেনে চলায় আগ্রহী হবে না। তবে বিষয়গুলো নিশ্চিতের দায়িত্ব নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্টদের। খামারগুলোকে একটা সময়সীমা বেঁধে দেয়া যেতে পারে। এর মধ্যে উত্তম চর্চাগুলো প্রবর্তন না করলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তি নাগরিকের অন্যতম মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃত বাংলাদেশের সংবিধানে। এ অধিকার নিশ্চিতের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। দুঃখজনকভাবে সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এখনো সম্ভব হয়ে ওঠেনি। যে পরিবেশ ও যেভাবে পোলট্রি মুরগি পালন করা হচ্ছে তা জনস্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সুতরাং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নজরদারি বাড়াতে হবে। সর্বোপরি পোলট্রি ব্যবসায়ীদের নৈতিকতার চর্চা বাড়তে হবে। সম্মিলিত প্রয়াসে দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হবে—এটিই প্রত্যাশা।










