আজ ১৬ ডিসেম্বর, বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীর দিন। ৫০ বছর আগের এই দিনে দখলদার পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে এ ভূখণ্ড থেকে বিতাড়িত হয়। বিশ্বমানচিত্রে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে অভ্যুদয় ঘটে বাংলাদেশের। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী জনযুদ্ধ ও লাখো প্রাণের বিনিময়ে সূচিত হয় চূড়ান্ত বিজয়। মুক্তির লড়াইয়ে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশ নিয়েছিলেন, জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, বিনম্রচিত্তে আজ তাদের স্মরণ করছি। শ্রদ্ধা জানাচ্ছি বীর নারীদের, যারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম নিষ্পেষণের শিকার হয়েছিলেন। গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, যার আহ্বানে সর্বস্তরের মানুষ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে দেশকে স্বাধীন করেছেন। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি জাতীয় চার নেতাকে, যারা নিবেদিতভাবে আজীবন কাজ করে গেছেন স্বাধীনতার জন্য। সর্বোপরি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় নানাভাবে সহযোগিতা ও সমর্থন দেয়া বিভিন্ন রাষ্ট্র ও ব্যক্তিদের প্রতি।

স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূলে ছিল আপেক্ষিক অর্থনৈতিক বঞ্চনার অনুভূতি, অন্যায়-অবিচার ও স্বাধিকার চেতনা। পাকিস্তান রাষ্ট্রে প্রতিটি ক্ষেত্রেই বঞ্চনার শিকার হয়েছিল বাঙালিরা। পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনীতির অধিকতর দ্রুত উন্নতি ও বহুমুখীকরণ অনিবার্যভাবেই তত্কালীন পূর্ব বাংলার জীবনমানে প্রতিফলিত হয়েছিল। গুটিকয়েক পরিবারের হাতে কুক্ষিগত ছিল অধিকাংশ সম্পদ। সম্পদের বৈষম্যের সঙ্গে বজায় ছিল রাষ্ট্রীয় সেবা-সুযোগ-সুবিধা ভোগের বঞ্চনাও। পূর্ব বাংলার বেসরকারি খাতে অবাঙালিদের প্রাধান্য, অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে পক্ষপাতিত্ব আর ক্রমে কোণঠাসা অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিল বাঙালি জাতি। চেয়েছিল এক স্বাধীন-সার্বভৌম গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে। পাকিস্তানের অমানবিক ও অন্যায্য রাষ্ট্রের বিপরীতে আমরা এমন এক স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলাম, যার শাসন ব্যবস্থার মূলনীতি হবে গণতান্ত্রিক; যে রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে নিশ্চিত হবে সবার সমান অধিকার। অবসান ঘটবে অন্যায়, অবিচার, শোষণ, নিপীড়ন, সাম্প্রদায়িক বিভেদ, বৈষম্যের। আমরা এমন এক ন্যায্য সমাজ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলাম, যেখানে সবার অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটবে, অশিক্ষা দূর হবে, নিরসন হবে সব ধরনের বঞ্চনা।

১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের মধ্য দিয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে জায়গা করে নিয়েছে। তারপর গত পাঁচ দশকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে আমাদের অনেক অগ্রগতি হয়েছে। দারিদ্র্য কমেছে উল্লেখযোগ্য মাত্রায়; কমেছে শিশুমৃত্যু ও মাতৃমৃত্যুর হার। গড় আয়ু বেড়েছে, পুষ্টি পরিস্থিতির তুলনামূলক উন্নতি হয়েছে, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে, শিক্ষার ব্যাপকতর বিস্তার ঘটেছে। অর্থনৈতিক সক্ষমতা বেড়েছে। পদ্মা সেতুর মতো বৃহৎ প্রকল্প হচ্ছে নিজস্ব অর্থায়নে। মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের মেগা প্রকল্পসহ ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মতো কর্মযজ্ঞ চলছে। প্রবৃদ্ধির সঙ্গে মাথাপিছু আয় বাড়ছে। খাদ্য উৎপাদনে সাফল্য, যাতায়াত ও পরিবহন খাতে উন্নয়নের পাশাপাশি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের অগ্রগতি হয়েছে। দেশের প্রায় সব জায়গা ইন্টারনেটের আওতায় এসেছে। তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার মানুষের কাজকর্মে যোগ করেছে নতুন গতি। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার পথে আজ ধাবমান বাংলাদেশ।

তবে এসব অর্জনের বিপরীত দিকের চিত্র খুব একটা সুখকর নয়। ১ শতাংশ ধনীর হাতে জাতীয় আয়ের ১৬ শতাংশ কেন্দ্রীভূত। অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে মানুষে মানুষে সম্পদ ও আয়বৈষম্য, যা উন্নয়নের সুফল বণ্টন প্রশ্নবিদ্ধ করে। আজও মুষ্টিমেয় লোকের হাতে পুঞ্জীভূত সম্পদ ও আয়ের বিপুলাংশ। কভিডের কারণে নতুন করে প্রায় ছয় কোটি লোক দরিদ্র হয়েছে। পুষ্টিহীনতায় ভুগছে অনেকে। কর্মহীন অবস্থায় রয়েছেন অনেকে। কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। শিক্ষিত তরুণদের অনেকেই বেকার। ব্যাংক খাত খেলাপি ঋণের ভারে ন্যুব্জ। প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, রফতানি বহুমুখীকরণ, কর্মপরিবেশের উন্নয়ন, পরিবেশগত সূচকে অগ্রগতি এখনো যৎসামান্য। পুঁজিবাজার ভুগছে অস্থিতিশীলতা ও আস্থাহীনতার সংকটে।

শুধু তা-ই নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবনতি ঘটেছে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হওয়ার পরিবর্তে দুর্বল হয়েছে। স্বাধীন মতপ্রকাশ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বহুলাংশে খর্ব হয়েছে। জনপ্রশাসনের সর্বস্তরে অনিয়ম, জবাবদিহির অভাব ক্রমেই প্রকটতর হয়েছে। অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে খুন, ধর্ষণসহ নানা ধরনের গুরুতর অপরাধের শিকার হওয়া মানুষগুলো বিচারপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এক ধরনের বিচারহীনতার পরিবেশ অপরাধবৃত্তি বৃদ্ধিতে সহায়ক হচ্ছে। বিশেষত নারীর প্রতি সহিংসতা ক্রমে বাড়ছে। এসব বিষয় স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আমরা আজ বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীতে পদার্পণ করেছি। একটি জাতির জীবনে অর্ধশত বছর কম সময় নয়। তাই ৫০তম বিজয় দিবসে আমাদের পেছন ফিরে তাকাতে হবে। যেসব স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেছিল, ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগের পেছনে যেসব স্বপ্ন ছিল, তার কতটা আমরা পূরণ করতে পেরেছি, কতটা পারিনি; যা পারিনি তা কেন পারিনি—এ আত্মজিজ্ঞাসা ও আত্মবীক্ষণ আজ অতি প্রয়োজন। সেই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের শপথ ও প্রতিশ্রুতির কথা আবারো স্মরণ করা দরকার। একটি  প্রকৃত গণতান্ত্রিক, ন্যায়নিষ্ঠ, সমতামূলক ও মানবিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ এখনো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীতে সবার ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসে কাজটি শেষ করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।