সরকারি হাসপাতালগুলো ধারণক্ষমতার তিন গুণ বেশি রোগীর সেবা দিলেও স্বাস্থ্যসেবায় বরাদ্দ দেশের জিডিপির ১ শতাংশেরও কম। স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের বরাত দিয়ে বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের বিশেষায়িত সব সরকারি হাসপাতালে শয্যার চেয়ে ৫৩ শতাংশ রোগী বেশি ভর্তি হয়। জেলা ও মেডিকেল কলেজে রোগী ভর্তির হার যথাক্রমে ১৩৭ ও ১৫২ শতাংশ। দেশের অধিকাংশ মানুষ জেলা শহরে বাস করলেও জেলা পর্যায়ে সব রোগের চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়নি। গুরুত্বপূর্ণ অনেক পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। ফলে বিশেষায়িত হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়ছে। এতে স্বাভাবিক চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। অবস্থা উন্নয়নে জেলা হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা ও দক্ষতা আরো বাড়াতে হবে। কার্যকর রেফারেল সিস্টেমও গড়ে তোলা জরুরি।

দেশে প্রতি হাজার মানুষের জন্য হাসপাতালে গড়ে একটিরও কম শয্যা রয়েছে। সরকারি হাসপাতালে প্রতি ১ হাজার মানুষের জন্য শয্যা সংখ্যা প্রায় শূন্য দশমিক ৩২টি। বেসরকারি হাসপাতালে প্রতি ১ হাজার মানুষের জন্য শয্যা সংখ্যা প্রায় শূন্য দশমিক ৬৪টি। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে প্রতি ১ হাজার মানুষের জন্য হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা রয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৯৬টি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সুপারিশ অনুযায়ী, প্রতি ১ হাজার মানুষের বিপরীতে সাড়ে ৩টি শয্যা থাকতে হবে। অবকাঠামো ও জনশক্তির মধ্যে ভারসাম্যহীনতা একটা বড় সমস্যা। জেলায় ২৫০ শয্যার হাসপাতাল করা হলো কিন্তু জনশক্তি ৫০ শয্যার। অর্থাৎ অবকাঠামো বাড়ানো হলেও জনশক্তি বাড়ানো হয়নি। এতে হাসপাতাল হয়েছে কিন্তু সেখানে সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। আবার এমনও দেখা যাচ্ছে, হয়তো কোনো হাসপাতালে অনেক বিশেষজ্ঞ আছেন কিন্তু নার্স নেই। সাপোর্ট ফোর্স নেই। এটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম দুর্বলতা। এ ধরনের অসামঞ্জস্য রেখে শক্তিশালী স্বাস্থ্যসেবা খাত গড়ে তোলা সম্ভব নয়। সবার জন্য স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে হলে রাজধানীকেন্দ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থারও বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে হবে চিকিৎসাসেবা। সরকার উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স করেছে; তৃণমূলে কমিউনিটি ক্লিনিক করেছে। এসব নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। এজন্য সরকারকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু বিশেষায়িত হাসপাতাল ঢাকাতেই; অন্য কোথাও নেই। যৌক্তিক প্রয়োজনেই প্রাথমিকভাবে বিভাগীয় শহরে এবং পর্যায়ক্রমে বৃহত্তর জেলায় বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপন করতে হবে। এক্ষেত্রে কার্যকর রেফারেল সিস্টেমও গড়ে তুলতে হবে। ভুললে চলবে না, সবার জন্য স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা সাংবিধানিক নির্দেশ। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে অন্যান্য মৌলিক অধিকারের সঙ্গে চিকিৎসাসেবায় রাষ্ট্রের অঙ্গীকার রয়েছে। অনুচ্ছেদ ১৮-তে বলা হয়েছে, ‘জনগণের পুষ্টির স্তর উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনকে রাষ্ট্র অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য বলিয়া গণ্য করিবেন।’ আর জনস্বাস্থ্যের অন্যতম অনুষঙ্গ চিকিৎসাসেবা। রাষ্ট্র এ দায়ভার বহনে অস্বীকার করতে পারে না।

বাংলাদেশের সব বিশেষায়িত হাসপাতাল রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে একেক অঞ্চলের বৈশিষ্ট্যকে কেন্দ্র করে বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে উঠেছে। যেমন দিল্লিতে বিশেষায়িত ক্যান্সার হাসপাতাল, চেন্নাইয়ে চোখের বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রভৃতি গড়ে তোলা হয়েছে। বাংলাদেশেও বিশেষায়িত হাসপাতালের বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। অব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার অভাবে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। অবকাঠামো থাকলেও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোয় চিকিৎসকের সংকট যেমন রয়েছে, তেমনি অনুপস্থিত থাকছেন নিয়োগপ্রাপ্তদের অনেকেই। বিশেষ করে দুর্গম এলাকাগুলোয় চিকিৎসকের অনুপস্থিতি রোগীর বড় ধরনের দুর্ভোগের কারণ। আবার চিকিৎসক থাকলেও সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোয় নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসা উপকরণ ও যন্ত্রাংশ। ফলে অবকাঠামো থাকলেও সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতার কার্যকারিতা নেই রোগীর চিকিৎসায়। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ২০২০ সালে প্রকাশিত জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের সর্বশেষ বাংলাদেশ হেলথ ফ্যাসিলিটি সার্ভে বলছে, বাংলাদেশ মোট জিডিপির ৩ শতাংশ স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় অর্থায়ন করে; যা সমকক্ষ উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে কম। এর মধ্যে মাত্র ১ শতাংশ অর্থায়ন সরকারি খাত থেকে আসে। বাকি অর্থায়ন আসে বেসরকারি ও উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে। সরকারি খাতে আমাদের অবকাঠামো দুর্বলতা কম। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ সবচেয়ে কম। বাংলাদেশে কয়েক বছর ধরে স্বাস্থ্য খাতে বার্ষিক বরাদ্দ জিডিপির ১ থেকে ২ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। যেখানে ভারতে জিডিপির ৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ (২০১৮) এবং নেপালে ৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ (২০১৮)। ভবন আছে কিন্তু যন্ত্র নেই। আবার যন্ত্র থাকলেও তার ব্যবহার নেই। অর্থাৎ সক্ষমতা যা আছে, তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার হচ্ছে না। সমস্যাটা হচ্ছে পরিকল্পনা। যুগোপযোগী পরিকল্পনা করতে পারলে এত সমস্যা হতো না। উপজেলা পর্যায়ে অবকাঠামো পড়ে আছে, চিকিৎসক, নার্সের মতো জনবলও হয়তো দেয়া আছে কিন্তু কোনো কিছুরই কার্যকারিতা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে উন্নতি করতে হলে একটা সমন্বিত প্রয়াস ও তদারকি দরকার।

শহরগুলোয় স্বাস্থ্য অবকাঠামো তুলনামূলকভাবে অনুপস্থিত। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল একটি রেফারেল হাসপাতাল। সেখানে শুধু গুরুতর রোগীদের আসার কথা। কিন্তু সেখানে গেলে দেখা যাবে আউটডোরে রোগীদের বিশাল ভিড়। এসব রোগীর তো যাওয়ার কথা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। আউটডোরের বেশির ভাগ রোগীই হচ্ছে নগর দরিদ্র। এ নগর দরিদ্রদের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র ঢাকায় একেবারেই কম। এ কারণে নগর স্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে ভাবা খুবই প্রয়োজন। বাংলাদেশে রেফারেল সিস্টেমটা কাজ করছে না। রেফারেল বলতে যা বোঝায়, সেটি হচ্ছে রোগী প্রথমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাবে। সেখানে যদি চিকিৎসক মনে করেন তার পক্ষে এ রোগীর চিকিৎসা দেয়া সম্ভব নয়, তখন তিনি রোগীকে রেফার করবেন। কিন্তু এখন সেটা হচ্ছে না। কারণ আগের দিনের মতো এই এসডিজি যুগে একটি বড়ি খেয়েই প্রাথমিক চিকিৎসা এখন আর হবে না। ফলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মানোন্নয়ন ঘটাতে হবে। তাহলে রোগী রেফারেল হাসপাতালে আসবে না। এক্ষেত্রে কার্যকর রেফারেল সিস্টেম গড়ে তুলতে হবে।

জেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে হলে কিছু পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। জেলা পর্যায়ে সিভিল সার্জনের পদমর্যাদা উন্নীত করতে হবে, সেই সঙ্গে কমপক্ষে তিনটি অতিরিক্ত সিভিল সার্জনের পদ সৃষ্টি করা যেতে পারে। জেলা সদর হাসপাতালগুলোকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে জেলার স্বাস্থ্যসেবার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত এবং নতুন পদ সৃষ্টি করে জনবল বৃদ্ধি করা যেতে পারে। জেলা সদর হাসপাতালগুলোয় ইমারজেন্সি মেডিকেল অফিসার (ইএমও), মেডিকেল অফিসার, ডেন্টাল সার্জনসহ জনসাধারণের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সব বিভাগে স্পেশালিস্ট পদ তৈরি করতে হবে। জেলা সদর হাসপাতালগুলোয় স্বয়ংসম্পূর্ণ আইসিইউ, সিসিইউ, অপারেশন থিয়েটারের সঙ্গে সিটি-এমআরআইসহ সব ধরনের প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। টারশিয়ারি ও স্পেশালাইজড হাসপাতালগুলোয় স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে এবং বাংলাদেশের মতো জনবহুল একটি দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে সেবা প্রদানের লক্ষ্যে নতুন পদ তৈরি এখন সময়ের দাবি। 

বাংলাদেশের একটি বিস্তৃত ও শক্তিশালী স্বাস্থ্য অবকাঠামো আছে। প্রত্যন্ত গ্রামের প্রতিটি বাড়ি ঘুরে স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকাদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ব্যবস্থা রেখে কয়েক স্তরে স্বাস্থ্য অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। এ স্বাস্থ্য অবকাঠামো পরিচালনা করতে সরকার অর্থ ব্যয় করছে। কিন্তু জনগণ এ ব্যয়ের সুফল খুব অল্পই পাচ্ছে। এ অবকাঠামোর ভেতরেই আরো উন্নত সেবা দেয়া সম্ভব ছিল কিন্তু পারছে না। এর প্রধান কারণ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর অপ্রতুল সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি। তবে কাঙ্ক্ষিত উচ্চমানে স্বাস্থ্যসেবাকে নিতে হলে সরকারকে অবশ্যই বাড়তি বাজেটের সংস্থান করতে হবে এবং স্বাস্থ্য খাতে জনশক্তি বৃদ্ধি ও তাদের দক্ষতা বাড়াতে হবে।