অন্তহীন শোক নিয়ে আবারো হাজির হয়েছে রক্তস্নাত আগস্ট। এ মাসের ১৫ তারিখে শুধু স্বাধীন বাংলাদেশের নয়, বাঙালির ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল। এটি মানবেতিহাসেরও অন্যতম নৃশংস হত্যাকাণ্ড। মধ্য আগস্টের কালরাতে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবার হত্যা করে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে উত্খাত করেছিল কিছু ব্যক্তি, যাদের মধ্যে রাজনীতিবিদ আর সেনাবাহিনীর এক দলছুট ঘাতকদলও ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করেছিল। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সেদিন আরো প্রাণ হারান বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব, ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল, রোজী জামাল, ভাই শেখ নাসের ও কর্নেল জামিল। খুনিদের বুলেটে সেদিন প্রাণ হারান বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে মুক্তিযোদ্ধা শেখ ফজলুল হক মণি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি, ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, শিশু বাবু, আরিফ রিন্টু খানসহ অনেকে। জাতিকে উজ্জীবিত ও প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর অবদান বলতে গেলে একক। তিনি ভাষাভিত্তিক ও জাতিভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে আমাদের অশেষ ঋণে আবদ্ধ করে গেছেন। আজ গভীর শ্রদ্ধায় ও কৃতজ্ঞতায় আমরা তাকে স্মরণ করছি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ ২৩ বছর সংগ্রাম আন্দোলনের পর, ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ৩০ লাখ শহিদের জীবনের বিনিময়ে অর্জিত হয় বাঙালির হাজার বছরের লালিত স্বপ্ন স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের। স্বাধীনতার পর দেশের অর্থনীতি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, খাদ্যগুদাম, শিল্প-কারখানা, স্কুল, কলেজ পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী। ভারতে আশ্রয় নেয়া এক কোটি শরণার্থী ফিরিয়ে আনা, শহিদ পরিবার ও মুক্তিযুদ্ধে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন, সে সঙ্গে ১৯৭২ সালের ভয়াবহ খরা, ১৯৭৩ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়, স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিগুলোর নানা ষড়যন্ত্র দক্ষতার সঙ্গে সামলে স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণের কাজে সম্পূর্ণরূপে আত্মনিয়োগ করেন বঙ্গবন্ধু। দেশী-বিদেশী নানা বাধা-বিপত্তি, ষড়যন্ত্র ও সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে মাত্র ৩ বছরে (১৯৭২-৭৫), যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, তা এককথায় বিস্ময়কর। নির্যাতিত-নিপীড়িত পরাধীন বাঙালি জাতি নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। মাত্র তিন বছরের শাসনামলে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের সার্বিক, টেকসই উন্নয়ন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনানির্ভর একটি আধুনিক উন্নত রাষ্ট্র গঠনে অনেক পরিকল্পনা ও কর্মসূচি গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করেছিলেন। একটি সুখী-সমৃদ্ধ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের যে স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু দেখেছিলেন, তার শক্ত ভিত তিনি নিজেই স্থাপন করেন।

বঙ্গবন্ধু প্রথমে রাষ্ট্রের মৌল আদর্শ তুলে ধরেন। বলেন, অভিজ্ঞতার আলোকে এদের গড়ে তোলো। আমাদের স্বাধীনতা বাস্তব রূপ পেয়েছে এ উপলব্ধির পূর্ণতার অনুশীলনে স্বার্থকতা অর্জনেই। এসব মূল আদর্শ হলো জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। জাতীয়তাবাদকে তিনি নির্দিষ্ট করে চেনান ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ বলে। তিনি বলেন, ‘বাংলার কৃষ্টি, বাংলার ঐতিহ্য, বাংলার আকাশ-বাতাস, বাঙালির রক্ত দিয়ে বাংলার জাতীয়তাবাদ।’ কোনো কূপমণ্ডূকতা বা পরিচয়-সংকট একে স্পর্শ করে না। এটা অনুভূতির ব্যাপার। সে সঙ্গে তাতে গৌরববোধ। কোনোভাবেই সংকুচিত নয়। আগ্রাসীও নয়। তবে বহন করি তর্কাতীতভাবে আমাদের সত্তায়। গণতন্ত্র বলতে তিনি বোঝান, ‘যা সাধারণ মানুষের কল্যাণ সাধন করে থাকে’। পদ্ধতিগতভাবে সংসদীয়, যেখানে ১৮ বছরের বেশি বয়সের সব নাগরিকের ভোট দেয়ার অধিকার সুনিশ্চিত। একই সঙ্গে এ ‘শোষিতের গণতন্ত্র’। তার প্রকাশ বিভিন্ন বিধিনিষেধ ও সুরক্ষা ব্যবস্থায়। উৎপাদনে ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব ফলানোর সুযোগ যাতে না থাকে, তাই তেমন মৌলিক খাতগুলো গণ-কর্তৃত্বে অর্থাৎ সরকারি খাতে পরিচালনার বিধিব্যবস্থা গণতন্ত্রের অনুষঙ্গী হিসেবে নিশ্চিত করার অধিকারী এ সংবিধানে থাকছে। সমাজতন্ত্র বলতে তিনি বোঝান, এক ‘শোষণহীন সমাজ’।

বঙ্গবন্ধু নেই। কিন্তু তার আদর্শ আছে, তার স্বপ্ন-প্রত্যাশা আছে, আছে তার প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। তার আদর্শ, তার জীবন-কর্মের মধ্যেই বিধৃত হয়ে আছে। তার স্বপ্নের কথা, প্রত্যাশার কথাও কারো অজানা নেই। কী ধরনের দেশ ও সমাজ তিনি কামনা করতেন, তার আত্মজীবনী পড়লে তা উপলব্ধি করা যায়। তিনি স্বাধীন দেশ ও শান্তি এবং সহাবস্থানমূলক সমাজের প্রত্যাশা করতেন। এ প্রত্যাশা পূরণে তিনি জীবনব্যাপী রাজনৈতিক লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। তিনি দেশকে সোনার বাংলায় পরিণত করার কাজ শুরু করেছিলেন, যা শেষ করে যেতে পারেননি। ঘাতকচক্র সে সুযোগ তাকে দেয়নি। সোনার বাংলা গড়তে সর্বাগ্রে প্রয়োজন ছিল জাতীয় ঐক্য ও সংহতি। জাতীয় ঐক্য ও সংহতি নির্মাণে বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। বলা বাহুল্য, তার নেতৃত্বে ও মাধ্যমে আমরা স্বাধীন স্বদেশের অধিকারী হয়েছি বটে, তবে এখনো তার স্বপ্নের সোনার বাংলা, শান্তিপূর্ণ ও সহাবস্থানমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। সুদৃঢ় জাতীয় ঐক্য-সংহতিও নিশ্চিত করতে পারিনি, বরং সাম্প্রতিক বছরগুলোয় জাতির মধ্যে নানা রকম বিভক্তি মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে, যা স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ গঠনে ইতিবাচক নয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, তার দল এবং যে দলটির নেতৃত্বে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে সে আওয়ামী লীগ তার আদর্শ ও স্বপ্ন প্রত্যাশার বাস্তবায়ন থেকে দূরে সরে গেছে। বঙ্গবন্ধুকে নিছক ছবির মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে তার আদর্শ ও স্বপ্নের কথা বলা হচ্ছে। যারা তার নামে রাজনীতি করছেন, তারা তার আদর্শ ও স্বপ্ন বাস্তবায়নের কথা মুখে বললেও কার্যক্ষেত্রে তার প্রতিফলন ঘটাতে পারছেন না। বঙ্গবন্ধু সারা জীবন বঞ্চিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত, অধিকারহারা ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য রাজনীতি করে গেছেন।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সুদৃঢ় জাতীয়তাবাদ আর সামাজিক সমতা—এ চার মূলনীতিকে প্রাধান্য দিয়েছেন, যা বাস্তবায়িত হলে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সুদৃঢ় সামাজিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত হতো। ফলে বাংলাদেশ অনেক আগেই উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশে পরিণত হতো। বঙ্গবন্ধু যখন রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গিয়ে দেখেন গুদামে খাদ্য নেই, মাঠে ফসল নেই, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রিজার্ভ শূন্য। বস্তুত কোনো ব্যাংকের কার্যকারিতা নেই। সড়ক ও রেলপথ বিচ্ছিন্ন, নৌ ও সমুদ্রবন্দরগুলো বিধ্বস্ত। স্কুল-কলেজগুলো ছিল পরিত্যক্ত সেনাছাউনি। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পরাজয় নিশ্চিত জেনে সম্ভাব্য সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছিল। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের কিছু কুচক্রিমহল তখনো চাইছে দেশটি স্বাধীন হিসেবে না থাকুক অথবা তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত হোক। এত কিছুর পরও এত অল্প সময়ের মধ্যে তিনি ৭৮৬ কোটি টাকার বাজেট থেকে ১০৮৪ দশমিক ৩৭ কোটি টাকার বাজেট প্রদান করেছেন। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন দুর্নীতিমুক্ত সমাজ, কৃষি এবং শিল্পের উৎপাদন বৃদ্ধি, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, জাতীয় ঐক্য এবং জনগণকে একটি জনমুখী প্রশাসন ব্যবস্থা উপহার দেয়া।

বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও স্বপ্ন-প্রত্যাশা বাস্তবায়ন করতে হলে একনিষ্ঠভাবে তার সে দর্শন ও আদর্শ অনুসরণ করতে হবে। দৃঢ়তার সঙ্গে সে স্বপ্ন-প্রত্যাশা হূদয়ে লালন এবং কর্মের মাধ্যমে তা বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে। দেশের সামগ্রিক চিত্রে, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতিফলন নেই বললেই চলে। এক দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় আছে বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এবং তার আদর্শের অনুসারিদের নিয়ে দেশ পরিচালিত হচ্ছে। তার পরও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও স্বপ্ন-প্রত্যাশার বাস্তবায়ন নিয়ে নেতিবাচক কথা বলতে শোনা যায়। সন্দেহ নেই, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও স্বপ্ন-প্রত্যাশা বাস্তবায়ন করতে হলে পারস্পরিক শ্রদ্ধাপূর্ণ, সহনশীল, সুশাসন এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। এ সঙ্গে জরুরি সুদৃঢ় জাতীয় ঐক্য ও সংহতি। আরো প্রয়োজন, সোনার বাংলা গড়তে ব্যাপক অর্থনৈতিক বিকাশ ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড এগিয়ে নেয়া। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে দেশবাসীর প্রত্যাশা অনেক। দেশের মানুষ বিশ্বাস করে, তিনিই পারবেন গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক মুক্তির পথ বিনির্মাণ করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।