মূল্যস্ফীতির ভূত আবারো বিশ্বকে তাড়া করছে এক দীর্ঘ সুপ্তাবস্থার পর—যখন নীতিনির্ধারকরা অনেক বেশি মূল্যসংকোচনের বিষয়ে আচ্ছন্ন ছিলেন। সর্বোত্তম উপায়ে কীভাবে মূল্য স্থিতিশীলতা ফেরানো যায়, সে সম্পর্কিত পুরনো বিতর্কগুলো এখন আবার সামনে এসেছে।

ব্যয় হ্রাস ও সুদহার বাড়ানোর মাধ্যমে আর্থিক ও রাজস্বগত নিয়ন্ত্রণে নীতিনির্ধারকদের কি মূল্যস্ফীতি মোকাবেলার সনাতনী কৌশল অবলম্বন করা উচিত? নাকি তার পরিবর্তে সুদহার কমিয়ে বিপরীত নির্দেশনায় যাওয়া উচিত, যে পথটি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের নির্দেশনায় তুরস্কের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনুসরণ করেছে? কিংবা মূল্য নিয়ন্ত্রণ বা বড় প্রতিষ্ঠানের দাম নির্ধারণ ক্ষমতা হ্রাসের মাধ্যমে নীতিনির্ধারকদের আরো সরাসরিভাবে হস্তক্ষেপ করা উচিত, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অর্থনীতিবিদ ও ইতিহাসবিদ যেমনটা বলেছেন? নীতি সম্পর্কিত এসব প্রশ্ন আলোচিত হচ্ছে সর্বত্র। তবে আমি বলব, আপনার যদি এসব নীতিতে ভাবনাহীন ও স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়া থাকে এবং তাত্ক্ষণিকভাবে এসব নীতির একটা বাদ দিয়ে আরেকটি ব্যবহার করেন তাহলে আরেকবার ভাবুন। অর্থনীতি স্বতঃসিদ্ধ নিয়মনীতির কোনো বিজ্ঞান নয়। ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি ভিন্ন ভিন্ন ধরনের নীতির প্রয়োজনীয়তা দাবি করে। অর্থনীতিতে নীতিবিষয়ক প্রশ্নগুলোর একমাত্র ন্যায়সংগত উত্তর হলো, ‘এটি নির্ভর করে।’

সাধারণভাবে বলা যায়, মূল্যস্ফীতির সনাতনী প্রতিকারগুলোর দেউলিয়াত্ব ও বেকারত্ব বৃদ্ধির মতো ব্যয়বহুল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে এবং সেগুলো যথেষ্ট কাঙ্ক্ষিত প্রভাবও তৈরি করেনি সবসময়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ মাঝেমধ্যে (যেমন যুদ্ধের সময়ে) কাজ করেছে। আবার অনেক সময় কাজ করেনি। 

সবচেয়ে বড় ব্যাপার, যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি ‘ফান্ডামেন্টালসের’ চেয়ে প্রত্যাশা দ্বারা ব্যাপকভাবে চালিত হয়, তখন একটি নিম্ন মূল্যস্ফীতির ভারসাম্য অবস্থায় যেতে সাময়িক মজুরি-মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দাম সমন্বয় করতে সাহায্য করতে পারে। এ ধরনের ‘অগতানুগতিক’ পদক্ষেপগুলো ১৯৮০-এর দশকে ইসরায়েল ও কয়েকটি লাতিন আমেরিকার দেশে সফল হয়েছিল।

এমনকি নিম্ন সুদহার মূল্যস্ফীতি কমায়—এ ধারণাটিও একদম অপরিচিত নয়। অর্থনীতির মধ্যে এমন এক চিন্তাধারা রয়েছে, আজকের মূলধারার অর্থনীতিবিদরা সেটি বাতিল করেছেন; যা উচ্চ সুদহারের (যা চলতি মূলধনের ব্যয় বাড়ায়) মতো ব্যয়তাড়িত বিষয়ের সঙ্গে মূল্যস্ফীতিকে যুক্ত করে।

উচ্চ সুদহারের মূল্যস্ফীতি সৃষ্টিকারী প্রভাবকে বলা হয় ‘কাভালো ইফেক্ট’। এটি আর্জেন্টিনার সাবেক অর্থমন্ত্রী ডোমিংগো কাভালোর নামে করা হয়েছে, যিনি ১৯৭৭ সালে নিজের হার্ভার্ড ডক্টরাল থিসিসে এটি আলোচনা করেছিলেন। দুর্ভাগ্যক্রমে, স্থির বিনিময় হার ও পুরোপুরি মুদ্রা বিনিময়যোগ্যতার ভিত্তিতে কাভালোকে খুব অদ্ভুত ধরনের মূল্যস্ফীতি মোকাবেলার কৌশল নিতে হয়েছিল যখন ১৯৯০-এর দশকে আর্জেন্টিনায় উচ্চ মূল্যস্ফীতির একটা সময়ে তিনি অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। ফলে তার তত্ত্বটি কিছু ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতালব্ধ সমর্থনও পেয়েছিল। 

এ কারণে বর্তমানে অপ্রচলিত মূল্যস্ফীতি-বিষয়ক ধারণাগুলোকে ‘বিজ্ঞান অস্বীকৃতি’ হিসেবে ব্যঙ্গবিদ্রূপ করাটা (যেমনটা করেছেন কিছু অর্থনীতিবিদ) কভিড-১৯ টিকা গ্রহণ অস্বীকৃতির সমতুল্য বৈকি। প্রকৃত প্রস্তাবে যখন বাস্তব জগৎ সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট কোনো প্রশ্ন বিদ্যমান তত্ত্বগুলোর সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ মনে হয় তখন তা বরং তরুণ কোনো চৌকস অর্থনীতিবিদকে সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ওই প্রশ্নকে যৌক্তিক বা ন্যায়সংগত করা যায় কিনা, তার আহ্বান জানায়। মনে রাখতে হবে অর্থনীতির প্রকৃত বিজ্ঞান ক্ষেত্রভিত্তিক; সর্বজনীন নয়।

প্রশ্ন আসতে পারে, বর্তমানে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে প্রাসঙ্গিক অ্যাপ্রোচ কী হতে পারে?

যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য অনেক উন্নত অর্থনীতিতে বর্তমানে বিরাজমান মূল্যস্ফীতি ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকের মূল্যস্ফীতি থেকে তাত্পর্যজনকভাবে ভিন্নতর। এটি যেমন দীর্ঘস্থায়ী নয়, তেমনি এটি মজুরি-দাম ও ব্যাকওয়ার্ড ইনডেক্সেশন তাড়িতও নয়।

মনে হচ্ছে মূল্যস্ফীতিজনিত চাপ সেবা থেকে পণ্যে মহামারীসংশ্লিষ্ট ব্যয়ের পুনর্বণ্টন, সরবরাহ ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মতো একগুচ্ছ সাময়িক ফ্যাক্টর থেকে উদ্ভূত। সম্প্রসারণমূলক আর্থিক ও রাজস্ব নীতি আয় বাড়াতে সহায়ক হলেও সেগুলো সাময়িক। এর বিকল্প কোনো নীতি-পদক্ষেপ কর্মসংস্থান ও মানুষের জীবনমানে নাটকীয় পতন ঘটাতে পারে।

কাজেই বিদ্যমান পরিস্থিতিতে উন্নত দেশের নীতিনির্ধারকদের মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিতে বেশি প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত নয়। ইতিহাসবিদ অ্যাডাম টুজ যেমনটা বলেছেন, সাময়িক মূল্যস্ফীতি একটি সংযত সাড়া দাবি করে, সেটি হোক নিয়ন্ত্রণ কিংবা মুদ্রানীতির মাধ্যমে।  

মূল্যনিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে সর্বোত্তম যুক্তি এই নয় যে সেগুলো ‘বিজ্ঞানের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন নয়’, বরং এখনকার সময়ে বিবেচনা করার মতো এর চেয়ে মৌলিক কোনো অ্যাপ্রোচ নেই। একই সতর্কতা সনাতনী নীতির (সুদহার বাড়ানো) ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। কাজেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর উচিত সুদহার বাড়ানোর আগে বারবার চিন্তা করা কিংবা আরো ধৈর্যশীল হওয়া।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি উচ্চ সুদহারের কারণ নয়, পরিণাম—এরদোগানের এ যুক্তি তাহলে কী হবে? তুরস্কের সামষ্টিক অর্থনীতির বিপুল ভারসাম্যহীনতার প্রেক্ষাপটে তার যুক্তির বৈধতা এরই মধ্যে সংশয়ের মুখে পড়েছে।

এমনকি যখন কোনো যুুক্তি আগে থেকে নিষ্পত্তি না-ও হয়, তবু প্রকৃত তথ্য আমাদের এটা পার্থক্য করতে সুযোগ দেয় যে সুনির্দিষ্ট একটা জায়গায় কোন তত্ত্বগুলো প্রযোজ্য হবে আর কোনটা প্রযোজ্য হবে না। তুরস্কের ক্ষেত্রে আমাদের যথেষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ সঞ্চিত হয়েছে, নীতিনির্ধারকরা খুব জোরালো ও সুস্পষ্টভাবে এরদোগানের নিরীক্ষা সম্পর্কে বলতে শুরু করেছেন। 

সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে তুরস্কের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিম্ন নীতি সুদহার (যে সুদহার আর্থিক কর্তৃপক্ষগুলো সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে) সত্ত্বেও বাজার সুদহার বেড়ে চলেছে। সঞ্চয়কারীরা উচ্চতর সুদ হার দাবি করেছেন। ফলে ঋণগ্রহীতার ঋণগ্রহণের খরচ বাড়ছে।

বিদ্যমান পরিস্থিতি এ যুক্তিকে হালকা করে দেয় যে নিম্ন নীতিহার কার্যকরভাবে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন খরচ কমাবে। বরং সুদহারে উল্লম্ফন অর্থনীতির কিছু মৌলিক সমস্যা, অর্থনৈতিক নীতি পরিচালনা সম্পর্কিত অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যতের উচ্চতর মূল্যস্ফীতি প্রত্যশার মতো বিষয়গুলো আরো বেশি মাত্রায় ঘটার ইঙ্গিত দেয়। 

মাঝেমধ্যে তুরস্কের ক্ষেত্রে যেমনটা, গোঁড়া অর্থনৈতিক যুক্তিই বরং সঠিক। গতানুগতিক নীতি থেকে বিচ্যুত নিরীক্ষাগুলো অনেক সময় খুব ব্যয়বহুল হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, অর্থনীতিতে সর্বজনীন নিয়মনীতি আছে কিংবা মূলধারার অর্থনীতিবিদদের মধ্যকার বিরাজমান দৃষ্টিভঙ্গিই নীতি নির্ধারণ করবে। তেমনটি হলে ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নীতি উদ্ভাবন—যুক্তরাষ্ট্র নিউ ডিল বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পূর্ব এশিয়ার শিল্প নীতি—কখনো সংঘটিত হতো না।

প্রকৃতপক্ষে, আজকের প্রভাববিস্তারী মুদ্রানীতির ফ্রেমওয়ার্ক, মূল্যস্ফীতি টার্গেটিং নিজেই ১৯৮০-এর দশকে নিউজিল্যান্ডে বিরাজমান অদ্ভূত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ফল। ওই সময়কার মুদ্রানীতি-বিষয়ক তত্ত্বের ভিত্তিতে সেটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

বিভিন্ন মূল্যস্ফীতি টার্গেটিংয়ের কৌশল যখন সুপারিশ বা বাতিল হবে তখন অর্থনীতিবিদদের বিনয়ী থাকা উচিত। একইভাবে অর্থনৈতিক প্রমাণ ও যুক্তিগুলোয় গভীর মনোযোগ দেয়ার পাশাপাশি নীতিনির্ধারকদের কিছুটা সন্দিগ্ধ থাকা উচিত—যখন অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী অর্থনীতিবিদরা তাদের পরামর্শ দেন। 

[স্বত্ব:
প্রজেক্টসিন্ডিকেট
]

 

ড্যানি রডরিক: হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জন এফ কেনেডি স্কুল অব গভর্নমেন্টের আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অর্থনীতির অধ্যাপক

ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির