বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র
সচিব মাসুদ
বিন মোমেন
ও ভারতের
পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন
শ্রিংলার সঙ্গে
এক দ্বিপক্ষীয়
বৈঠক অনুষ্ঠিত
হয়। উভয়ই দুই দেশের
মধ্যে বিদ্যমান
চমত্কার সম্পর্কের
প্রতি সন্তোষ
প্রকাশ ও একে আরো গভীর করতে একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার
ব্যক্ত করেন।
আলোচনায় অর্থনৈতিক
ও বাণিজ্যিক
বিষয়ের পাশাপাশি
সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানি ভাগাভাগি, রোহিঙ্গা
ইস্যু প্রাধান্য
পায়। গত কয়েক মাসে উচ্চপর্যায়ের এমন বৈঠক নিয়মিত
বিরতিতে চলছে, যা ইতিবাচক।
তবে হতাশার
বিষয় হলো, এ বৈঠক ক্রমে রুটিন
কার্যক্রমে রূপ নিয়েছে, কোনো সমাধান বা নতুন কোনো পথের সন্ধান
এখান থেকে মিলছে না। প্রত্যাশা থাকবে
উভয় দেশই অমীমাংসিত বিষয়গুলো
দ্রুত সমাধানে
পদক্ষেপ নেবে।
বাংলাদেশের
পক্ষ থেকে অপ্রাপ্তি, অসন্তোষের
তালিকা বেশ দীর্ঘ। গঙ্গার
পানি চুক্তি
যে প্রত্যাশার
পরিবেশ তৈরি করেছিল, গত কয়েক বছরে তা দিগন্তরেখায় প্রায় অদৃশ্য। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পানির
গুরুত্বপূর্ণ উৎস তিস্তা নদীর পানি বণ্টন
চুক্তি সহসা হওয়ার সম্ভাবনা
দেখা যাচ্ছে
না। শুকনো
মৌসুমে তিস্তার
পুরো পানিই
ব্যবহার করছে ভারত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ ভারতের
নীতিনির্ধারকরা যদিও বারবার তিস্তা
ইস্যু সুরাহার
প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন
কিন্তু এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে আশাবাদী
হতে পারার
মতো কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি
হয়নি। বাংলাদেশের
ভেতর দিয়ে উত্তর-পূর্বের
রাষ্ট্রগুলোয় ট্রানজিট
সুবিধা পেয়েছে
ভারত, কিন্তু
বাংলাদেশ থেকে নেপালে পণ্য পরিবহনে শিলিগুড়ি
করিডোরের ১৪ মাইল দূরত্ব
আর কমছে না কিছুতেই।
অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর
সঙ্গে সাম্প্রতিক
বছরগুলোয় যোগ হয়েছে নাগরিক
পুঞ্জি নিবন্ধন
ইস্যু ও সংশোধিত নাগরিকত্ব
আইন। পশ্চিমবঙ্গ,
আসামসহ ভারতের
বিভিন্ন রাজ্যে
বসবাসকারী বাংলাভাষী
জনগোষ্ঠীকে ‘বাংলাদেশী’
আখ্যা দিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বিভিন্ন
সময়ে তাদের
বাংলাদেশে পাঠানোর
হুমকি দিয়ে আসছেন, যা কাম্য নয়। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল যাতে স্থিতিশীল, নিরাপদ
ও উন্নয়নমুখী
হয়, সেজন্য
বাংলাদেশ বরাবরই
দুই প্রতিবেশীর
বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে
সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার
দিয়ে এসেছে
কিন্তু বারবার
আশ্বাস দেয়া সত্ত্বেও সীমান্ত
হত্যা বন্ধ হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত
হয়েছে বাংলাদেশের
সঙ্গে ভারতের
বাণিজ্য ঘাটতির
মতো সমস্যা।
ভারতীয় শুল্কনীতি
ও অশুল্ক
বাধার কারণেই
বাংলাদেশী পণ্য ভারতে প্রবেশ
করতে পারছে
না। বলা বাহুল্য, দীর্ঘদিন
ধরে ঝুলে থাকা অমীমাংসিত
ইস্যুগুলোর সুরাহা
না হলে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্রগুলো কাঙ্ক্ষিত
সাড়া ফেলতে
পারবে না। দুই দেশের
প্রধানমন্ত্রীর মধ্যকার
বৈঠকেও ভারতের
প্রধানমন্ত্রী স্বীকার
করেছিলেন, তার নেইবারহুড ফাস্ট
পলিসির অন্যতম
স্তম্ভ হচ্ছে
বাংলাদেশ। তিনি নিশ্চয়ই এটা উপলব্ধি করবেন
যে দুই দেশের সম্পর্কের
ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা রয়েছে
তার সমাধান
জরুরি। বারবার
যদি কেবল আশ্বাস দেয়া হয় এবং সমস্যার কোনো সমাধান না হয়, তাহলে
দুই দেশের
বন্ধুত্বের জন্য এটি কোনো ভালো খবর নয়।
বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক এমন পর্যায়ে উন্নীত হওয়া দরকার, যাতে দুই দেশের সরকার বদল হলেও বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কে কোনো প্রভাব না পড়ে। অর্থাৎ সরকার বদলের পরিপ্রেক্ষিতে দুই দেশের জনগণের আস্থায় কোনো চিড় ধরবে না, এটা নিশ্চিত করা জরুরি। দুই দেশের অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নিলে দেশের সার্বিক উন্নয়নের গতিতেও তা নতুন মাত্রা যোগ করবে। প্রতিবেশী দেশগুলোর অর্থনীতিতে মন্দা শুরু হলে ভারতের অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। কাজেই ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সব ধরনের ঝুঁকির ঊর্ধ্বে রাখতে প্রতিবেশী দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়ন যাতে ঝুঁকিমুক্ত থাকে, সে ব্যাপারেও ভারতের নেতাদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। এ অঞ্চলের দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত না থাকলে নানা রকম ঝুঁকি থেকেই যাবে। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দর কুমার গুজরাল প্রতিবেশী দেশগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার কথা বলতেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে (১৯৯৬-২০০১) বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৩০ বছরের যে গঙ্গা পানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তাতেও তার আন্তরিকতার পরিচয় মিলেছে। আই কে গুজরালের দর্শনের মূল কথা ছিল, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনের জন্য প্রয়োজনে বিনিময়ে কিছু পাওয়ার আশা না করে হলেও বাড়তি উদ্যোগ নেয়া উচিত। এমন পরিস্থিতিতে ২০১১ সালে মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের আগে তিস্তা চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনার সূত্রপাত হয়। কিন্তু এক পর্যায়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির অসহযোগিতার কারণে তিস্তা চুক্তি সম্পন্ন করা যায়নি। বাংলাদেশে এসে ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী যে বিব্রতকর অবস্থার মুখোমুখি হয়েছিলেন, এ অবস্থার পুনরাবৃত্তি যাতে না হয়, সে ব্যাপারে বাংলাদেশ ও ভারতকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। দেশের জনসংখ্যা যে হারে বাড়ছে, তাতে আগামীতে বাংলাদেশ ও ভারতের অভিন্ন নদীগুলোয় শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে গেলে তা বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তাই বাংলাদেশ যাতে অভিন্ন নদীগুলোর ন্যায্য পানি পায়, তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় আলোচনা অব্যাহত রাখতে হবে।
ভারতের চাওয়া ছিল বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে ট্রানজিট। এসব রাজ্যের অর্থনৈতিক উন্নয়নে যা ছিল অপরিহার্য। জল, স্থল ও সমুদ্রপথে এ সুবিধা ভারতকে দিয়েছে বাংলাদেশ। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণও ক্রমবর্ধমান। বাণিজ্যের ভারসাম্য বিপুলভাবে ভারতের অনুকূলে, তবে তা যে বাংলাদেশের বাজারের প্রয়োজন মেটায়, সেটাও বাস্তব সত্য। বিদ্যুৎ আমদানি ও উৎপাদনে পারস্পরিক স্বার্থে দুই দেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সহযোগিতা চলমান রয়েছে। সুন্দরবনের কাছে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে অবশ্য পরিবেশবাদীদের মধ্যে প্রবল অসন্তোষ বিদ্যমান। ভারতীয় পণ্য আমদানির জন্য বেশকিছু ক্রেডিট লাইন বাংলাদেশকে দিয়েছে ভারত। ঋণের শর্ত খুব একটা সহজ তা অবশ্য বলা যাবে না। কঠিন শর্তের কারণে কোনো কোনো প্রকল্পে অর্থ ছাড়ে মাত্রাতিরিক্ত সময় লেগেছে। তবে ভারত থেকে কিছু অনুদানও পেয়েছে বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পর সবচেয়ে গুরুতর যে সমস্যায় জর্জরিত বাংলাদেশ, সেই রোহিঙ্গা ইস্যুতে অপরাধী মিয়ানমারের প্রতি ভারতের পরোক্ষ সমর্থন বাংলাদেশের মানুষকে বেদনাহত করেছে।
ভারত বাংলাদেশের বন্ধুরাষ্ট্র। তবে সম্পর্ক যত গভীর, যত বন্ধুত্বপূর্ণই হোক না কেন, প্রতিবেশীদের মধ্যে কিছু টানাপড়েন, স্বার্থের সংঘাত থাকবেই। এসব বিষয় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা, দরকষাকষি চলবে, প্রকাশ্যে তার নেতিবাচক ছাপ থাকবে না, এটাই স্বাভাবিক। সরকারি বক্তব্যে সম্পর্কের উজ্জ্বল দিকগুলো প্রাধান্য পাবে, সমস্যা সমাধানে আশাবাদ ব্যক্ত হবে, সেটাও প্রত্যাশিত। তবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সুস্থ বিকাশের স্বার্থে সমস্যাগুলো প্রকাশ করা বেশি জরুরি। প্রশংসাবাক্য আর আত্মতুষ্টিতে সমস্যার সমাধান হবে না। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বলেছেন, অমীমাংসিত ইস্যুগুলোয় উভয় দেশের বড় ধরনের মতপার্থক্য নেই। এ কথা সত্য হয়ে থাকলে সমস্যা সমাধানে দীর্ঘ সময় ব্যয় হচ্ছে কেন, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
প্রতিবেশী দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি হচ্ছে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস। এ আস্থা হঠাৎ একদিনে গড়ে ওঠে না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মতো একটি যুগান্তকারী ঘটনার মধ্য দিয়ে এ আস্থা ও বিশ্বাসের ভিত্তি রচিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে তা ধাক্কা খেয়েছিল। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের ক্ষমতা লাভ এবং তার পর পরই গঙ্গার পানি চুক্তি, এ ধাক্কা কাটিয়ে উঠে নতুনভাবে আস্থা ও প্রত্যাশার আবহ তৈরি করেছিল। দুঃখজনকভাবে গত কয়েক বছরে ভারতের যাবতীয় উদ্বেগ নিরসনে বাংলাদেশের সার্বিক সহযোগিতার বিনিময়ে ভারতের বড় প্রতিদান দৃশ্যমান হয়নি। দুই দেশের সরকারি ভাষ্যে যতই ইতিবাচক শব্দ ব্যবহার করা হোক না কেন, এ প্রতিদানের অভাব বাংলাদেশের মানুষের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। আস্থা ও বিশ্বাসের এ বাস্তব ঘাটতি টেকসই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের জন্য সহায়ক নয়। এ ঘাটতি পূরণে দুই দেশকেই যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে।










