দেশে ভোজ্যতেলের দাম দফায় দফায় বেড়েছে। সাধারণের কাছে ক্রমেই দুর্মূল্য হয়ে উঠছে রান্নার অপরিহার্য এ উপকরণ। বিরাজমান অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। সম্প্রতি একনেক সভার আলোচনায়ও বিষয়টি উঠে এসেছে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী ভোজ্যতেলে আমদানিনির্ভরতা কমানোর কথা বলেছেন। এজন্য তিনি সরিষা, সয়াবিন, সূর্যমুখীসহ বিভিন্ন তেলবীজের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশনা দিয়েছেন। স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো গেলে একদিকে ভোজ্যতেলের সংকট অনেকটা দূর হবে, আবার বিপুল বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে। কাজেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপ জরুরি।
বেশ অনেক দিন ধরেই দেশে ভোজ্যতেলের বাজার অস্থিতিশীল। পর্যাপ্ত সরবরাহ সত্ত্বেও সহনীয় পর্যায়ে আসছে না এর দাম। সরকার দাম বেঁধে দিলেও অনেক ক্ষেত্রে সেই দামে মিলছে না তেল। উচ্চ আমদানি মূল্যের অজুহাতে ব্যবসায়ীরা দাম বেশি রাখছেন। দীর্ঘমেয়াদে এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণে দেশে তেল ফসলের উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশের মোট আবাদি জমির মাত্র ৪ শতাংশে তেল ফসলের আবাদ হয়, যেখানে সরিষা চাষই প্রধান। সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও তেলবীজের উৎপাদন বাড়ছে না। এর পেছনে ফসলওয়ারি সুনির্দিষ্ট কিছু চ্যালেঞ্জ দায়ী। সরিষার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এটি শীতকালীন ফসল। সাধারণত আখের সহযোগী ফসল হিসেবে এটি উৎপাদন হয়। আখ উৎপাদন কমে আসায় স্বাভাবিকভাবে সরিষায়ও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এছাড়া শীতকালে বাণিজ্যিক নানা সবজির আবাদ বাড়ায় কৃষক সরিষা চাষে খুব একটা আগ্রহী নন। একইভাবে সয়াবিন ফসলের ক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার ও ভালো মানের বীজ সংকটই প্রধান। কয়েক বছর আগে ব্র্যাকের উদ্যোগে সাতক্ষীরায় সূর্যমুখীর আবাদ করা হয়েছিল। কিন্তু উচ্চফলনশীল জাত এবং উন্নত সিড ক্রাশিং মেশিনের অভাবে কৃষকরা দ্রুত আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। নারিকেলের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ ডাবের চাহিদা বৃদ্ধি। স্বাভাবিকভাবে এর দামও চাঙ্গা। এজন্য পরিপক্ব হওয়ার আগেই ডাব হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হয়। ফলে নারকেল থেকে তেল তৈরির সম্ভাবনা ক্ষীণ। বলতে গেলে নানা কারণে দেশে তেল ফসলের উৎপাদন মন্থর।
বিশ্ববাজারের উদ্বায়িতায় বহু দেশই ভোজ্যতেলে আমদানিনির্ভরতা কমানোর নীতি নিয়েছে। তেল ফসলের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর দিকে নজর দিয়েছে। প্রতিবেশী ভারত তেলবীজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। দেশটি বর্তমানে বিশ্বের সর্বোচ্চ তেল ফসল উৎপাদক দেশ। নিজস্ব তেলবীজ দিয়েই তারা অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাচ্ছে। একটা উল্লেখযোগ্য অংশ রফতানিও করছে। আগে কিছুটা আমদানিনির্ভর হলেও ইন্দোনেশিয়া বর্তমানে সয়াবিন উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। মালয়েশিয়া তো অনেক আগেই স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। বিশ্বের পাম তেলের উল্লেখযোগ্য চাহিদা মেটাত দেশটি। ভিয়েতনামও আমদানিনির্ভরতা কমাতে সয়াবিন উৎপাদন বাড়াচ্ছে। একইভাবে চীনও ক্যানোলা, সয়াবিন উৎপাদন বাড়াতে বড় ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। দেশগুলো নিজস্ব মাটি ও উপযোগী উন্নত জাতের উদ্ভাবন, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং কৃষকদের উৎসাহিতকরণে নানা সুযোগ-সুবিধা দেয়ার পাশাপাশি অব্যাহত গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম (আরঅ্যান্ডডি) পরিচালনা করছে, যা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তেলবীজের আবাদ বাড়াতে কৃষি মন্ত্রণালয় সচেষ্ট। এজন্য ২০২৫ সাল পর্যন্ত একটি প্রকল্প চলমানও রয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় সরিষা, তিল, সূর্যমুখী, চীনাবাদাম, সয়াবিনসহ তেল ফসলের আবাদ এলাকা ২০ শতাংশ বাড়ানো এবং তেলজাতীয় ফসলের হেক্টরপ্রতি ফলন ১৫-২০ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা সরকারের। কিন্তু এক্ষেত্রে আশানুরূপ অগ্রগ্রতি হচ্ছে না। কৃষকের অনাগ্রহই এক্ষেত্রে প্রধান কারণ। সন্দেহ নেই, তেল ফসলের আবাদ বাড়াতে কৃষকদের আগ্রহী করে তুলতে পর্যাপ্ত প্রণোদনা ও সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। ভালো মানের বীজসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ জোগাতে হবে। প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। ফসলওয়ারি চ্যালেঞ্জগুলো যথাযথভাবে চিহ্নিত করে সেগুলো উত্তরণে নিতে হবে কার্যকর উদ্যোগ। কোন এলাকায় কোন ফসল বেশি হতে পারে, সেটি খতিয়ে দেখে নিতে হবে জুতসই কৌশল। সূর্যমুখী তুলনামূলক লবণসহিষ্ণু। দক্ষিণাঞ্চলে এর চাষ বাড়ানো যেতে পারে। সাতক্ষীরায় যে এর চাষ শুরু হয়েছিল তা আবার চাঙ্গা করতে হবে। এজন্য অত্যাধুনিক রিফাইনারি সিড ক্রাশিং মেশিনের সংখ্যা বাড়াতে হবে। বেশি বিনিয়োগ ব্যক্তিগতভাবে সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরে সয়াবিন চাষ হচ্ছে। এটা আরো বাড়াতে উন্নত বীজ সরবরাহ করতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চল ও চর এলাকা নারকেল চাষের উপযুক্ত হতে পারে। সেখানে ডুয়ার্ফ জাতের স্বল্পমেয়াদে ফলন দেয়, এমন নারকেলবীজ সরবরাহ করা যেতে পারে। সর্বোপরি নতুন নতুন উচ্চফলনশীল জাত উন্মোচনে গবেষণা বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে আন্তঃদেশীয় গবেষণা সহযোগিতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।
জনসংখ্যা বৃদ্ধি, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, নগরায়ণ, বেকারি ও কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের কারণে ভোজ্যতেলের চাহিদা বাড়ছে। সামনে আরো বাড়বে। কিন্তু আমদানির মাধ্যমে চাহিদা মেটানো হলে এর অর্থনৈতিক ক্ষতি অনেক বেশি হবে। বড় কথা, উচ্চমূল্যের অভিঘাত নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর অসমানুপাতিক হারে পড়বে, এখন যেমনটা পড়ছে। রাইস ব্র্যান অয়েল দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর একটা ভালো ও সাশ্রয়ী সমাধান হতে পারত। কিন্তু এ তেল খুব বেশি জনপ্রিয় করা যায়নি। এ তেলের পরিশোধন ও প্রক্রিয়াকরণে কয়েকটি কোম্পানি কাজ করলেও এক্ষেত্রে বড় বাণিজ্যিক বিনিয়োগ নিয়ে কেউ এগিয়ে আসেনি। সরকারি পর্যায় থেকেও নেয়া হয়নি জোরালো পদক্ষেপ। সুতরাং এক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারিভাবে আমাদের আরো কাজ করতে হবে। পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা বহুলাংশে কাটাতে হবে। বদ্ধ জলাশয়ে মাছ চাষ এবং পোলট্রি খামার বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ফিডের চাহিদা বেড়েছে। তেলবীজের উচ্ছিষ্ট এসব ফিডের চমত্কার আধার। শুধু তা-ই নয়, এর অভ্যন্তরীণ বাজারও ক্রমবর্ধমান। কাজেই তেলবীজের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণ, সর্বসাধারণের জন্য দাম অভিঘাত প্রশমন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধিসহ সার্বিক অর্থনীতির জন্য সুফলপ্রদায়ী। সুতরাং এদিকে মনোযোগ দেয়া একান্ত জরুরি।
চলমান সংকটের প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী যে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে তেলবীজের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর কথা বলেছেন, সেটি সময়োপযোগী। তিনি এ বিষয়ে গবেষণা বাড়ানো, তার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ বৃদ্ধিসহ সব ধরনের সহায়তা দেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। তার নির্দেশনা মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের দায়িত্ব এখন কৃষি মন্ত্রণালয়ের। সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগী প্রয়াসে দেশে তেলবীজের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়বে বলে প্রত্যাশা।










