দেশে বিদ্যুতের চাহিদার চেয়ে উৎপাদন ক্ষমতা বেশি থাকলেও লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ বিভ্রাট থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাগজপত্রে বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকা এবং এর ফলে গ্রাহক ভোগান্তি ও ক্ষতির কোনো তথ্য নেই। গ্রাহকের কাছে যা লোডশেডিং, বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিগুলোর কাছে তা লোড ম্যানেজমেন্ট। গ্রাহক যাকে বলছেন বিদ্যুতের ‘আসা-যাওয়া’, তাকে এ সরকারি সংস্থাগুলো বলছে কারিগরি ত্রুটি বা বিদ্যুৎ বিভ্রাট। এমন প্রেক্ষাপটে শতভাগ বিদ্যুতায়নের বাংলাদেশের মফস্বল ও গ্রামের অনেক মানুষ এর প্রকৃত উৎপাদন-বিতরণ ক্ষমতা নিয়ে সন্দিহান হয়ে উঠছে। রোববার রেকর্ড উৎপাদনের দিনেও দেশের তিন বিভাগে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা গেছে। গত এক যুগে সরকারের অন্যতম বড় ও সেরা অর্জনের প্রতি আস্থা হারাচ্ছে জনগণের একটি বড় অংশ। এমনকি স্থিতিশীল ও মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের নিশ্চয়তা না পেয়ে নিজস্ব ক্যাপটিভ বিদ্যুতের ওপরই ভরসা রাখছেন শিল্প মালিক ও উদ্যোক্তারা। কৃষিতে সেচকাজও বিঘ্নিত হচ্ছে। শতভাগ বিদ্যুতায়নের পরও উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে লোডশেড করা কাম্য নয়।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে মূল সংকট জ্বালানি। এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনে মোট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে ২ হাজার ২৫২ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু সরবরাহ করা হচ্ছে এর অর্ধেক ১ হাজার ১১৪ মিলিয়ন ঘনফুট। এর চেয়ে বেশি গ্যাস সরবরাহ করা বেশ কঠিন বলে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা। অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের বিকল্প হিসেবে জ্বালানি তেল ব্যবহার করা হয়। গ্রীষ্মে চাহিদা বেড়ে গেলে বেশি মাত্রায় জ্বালানি তেল ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এখন আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। ফলে গ্রীষ্মে অতিরিক্ত চাহিদা সৃষ্টি হলে তা মোকাবেলা করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। এ দুই কারণ ছাড়াও বিতরণ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে গ্রীষ্মে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। শহরাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ করা হলেও গ্রামীণ জনপদে এ সময় লোড ম্যানেজমেন্ট করা হয় বেশি। এবারো সেই উদ্যোগ আগেভাগেই নিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ বিভাগ গ্রীষ্ম ও সেচকে সামনে রেখে যে পুস্তিকা প্রকাশ করেছে, তাতে বলা হয়, চলতি মৌসুমে অনুরূপ লোড ম্যানেজমেন্ট হাতে নেয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের বর্তমান পরিস্থিতিতে লোডশেডিং হবে না বলে আশা করা যায়। হলেও তা সহনীয় পর্যায়ে রাখার ব্যবস্থা নেয়া হবে। অর্থাৎ এবারো লোডশেডিং হবে না—এ কথা জোর দিয়ে বলতে পারছে না বিদ্যুৎ বিভাগ। বিভাগের পুস্তিকা বলছে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হবে। কিন্তু তা থাকবে সহনীয় মাত্রায়। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, দেশে এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ক্ষমতা ঢের বেশি। তারপরও লোডশেডিং আর লো ভোল্টেজে ভুগতে হচ্ছে মানুষকে, যা দুঃখজনক।

নীতিনির্ধারকরা বিদ্যুতের এ সংকটকে লোডশেডিং বলতে নারাজ। তারা একে বলেন বিদ্যুৎ বিভ্রাট। বিদ্যুৎ বিতরণের সরবরাহ লাইনে সমস্যা থাকলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দেয়। দেশে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় রয়েছে নানা সমস্যা। এ কারণেও বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হয়। চাহিদার তুলনায় কম ট্রান্সফরমার থাকার কারণেও বিপত্তি ঘটে। সক্ষমতার অতিরিক্ত লোড নিতে গিয়ে প্রায়ই ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষ বিদ্যুৎ বিভ্রাটের শিকার হয়। নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিতরণ ব্যবস্থা উন্নত করার বিকল্প নেই। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীই বলেছেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। চ্যালেঞ্জ রয়েছে নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে। সেজন্য অনেক পরিকল্পনা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। সেগুলো সম্পন্ন হলে পরিস্থিতির আরো উন্নতি হবে।’ উৎপাদন সক্ষমতা রেকর্ড সর্বোচ্চে পৌঁছলেও সঞ্চালন ব্যবস্থার দুর্বলতায় দেশে এখনো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। যদিও সঞ্চালন লাইনের দুর্বলতা কাটাতে গত এক দশকে ৫৪টি প্রকল্প গ্রহণ করেছে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)। এর মধ্যে বাস্তবায়ন হয়েছে ২৫টি। চলমান রয়েছে ২১টি প্রকল্পের কাজ। আরো আটটি প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে সংস্থাটি, যেগুলোর মেয়াদ শেষ হবে ২০২৮ সাল নাগাদ। ফলে ২০২৮ সালের আগে মানসম্পন্ন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে না বলে ধরে নেয়া যায়। প্রচণ্ড গরমের সময় উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণের সমস্যা নিয়ে যত যুক্তিসংগত ব্যাখ্যাই দেয়া হোক না কেন, দুর্ভোগের শিকারদের তাতে সন্তুষ্ট থাকার কথা নয়।

চাহিদার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা বিদ্যুৎ খাত উন্নয়নের মাপকাঠি হতে পারে না। কারিগরি বিবেচনায় এটি অপরিকল্পিত ও অযৌক্তিক উন্নয়ন, যার ফল অনেকটা বাড়তি দাম দিয়ে জনগণ এখন ভোগ করছে; ভবিষ্যতেও করার আশঙ্কা রয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের অধিকাংশ সক্ষমতাই কয়লা, গ্যাস ও তরল জ্বালানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতায় চাহিদা অনুসারে জ্বালানি সরবরাহ করতে না পারার কারণে উৎপাদন সক্ষমতার সিংহভাগই উৎপাদনহীন থেকে যাচ্ছে। এ অবস্থা অর্থনীতির জন্য বোঝায় পরিণত হচ্ছে, যা কাম্য নয়। নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে তাই কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ালেই হবে না, সাশ্রয়ী মূল্যে তা জনগণকে প্রদানেরও ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে সাশ্রয়ী মূল্যে প্রাথমিক জ্বালানির জোগান ও সরবরাহ লাইনের উন্নয়ন জরুরি।

জ্বালানি সম্পদের অভ্যন্তরীণ জোগান বাড়ছে না। চাহিদা মেটাতে বছর বছর বাড়ছে আমদানিনির্ভরতা। মোটা দাগে বলতে গেলে, ২০২২ সালে জ্বালানি একটা বড় চিন্তার জায়গা হতে চলেছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস ও কয়লা সংকট নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণেও মনোযোগী হতে হবে সরকারকে। জ্বালানির ওপর ভিত্তি করেই দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু এখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হলেও জ্বালানির পরিকল্পনায় ঘাটতি রয়ে গেছে। সংকটটি নতুন নয়। গত বছরের শেষ ভাগে আরেক বড় ধাক্কা ছিল স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়া। সরকার দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি আমদানির জন্য যে চুক্তি করেছে, তাতে দেশের মোট চাহিদার অর্ধেক এলএনজি আসে। বাকিটা স্পট মার্কেট থেকে কিনে আনতে গিয়ে ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। কয়লার ক্ষেত্রেও বড় সমস্যা আমদানিনির্ভরতা। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার দামও বেড়েছে। ফলে বিদ্যুতের ক্ষেত্রে সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতার চেয়ে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখাই হবে এ বছরের বড় চ্যালেঞ্জ। পিডিবি বলছে, যেখানে ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ছিল ৫ টাকা ৯১ পয়সা, সেখানে ২০২১-২২ বছরে বেড়ে হয়েছে ৬ টাকা ৬১ পয়সা। ফলে সামনের অর্থবছরে জ্বালানির দাম টালমাটাল হলে বিদ্যুতের গ্রাহকদেরও বাড়তি অর্থ গুনতে হবে। পাশাপাশি সরকারকেও বাড়তি ভর্তুকি দিতে হতে পারে—এসবই উদ্বেগজনক খবর।

বিদ্যুৎ বিভ্রাট হোক আর লোডশেডিং, ‘বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার’ ভোগান্তি থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে হবে। গরমের সময় বা অন্তত রোজার মাসে ইফতার, তারাবি, সাহিরর সময় মানুষ যেন স্বস্তি পায়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য বিদ্যুৎ বিভাগ নির্দেশনা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করছেন, সেটাই সবাই দেখতে চায়। সক্ষমতার অর্ধেক বিদ্যুৎও অনেক সময় উৎপাদন করা যাচ্ছে না। টাকা দিয়ে লো ভোল্টেজের মানহীন বিদ্যুৎ পাচ্ছে জনগণ। লোডশেডিং বা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের যে কারণ বলছে বিতরণ কোম্পানি ও সংস্থাগুলো, তা সহজেই নিরাময়যোগ্য। সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষতা, আন্তরিকতা ও সততার সঙ্গে কাজ করলে নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।